নতুন বছরের সূচনা—নতুন নিয়ত, নতুন পথচলা

 

নতুন বছরের সূচনা—নতুন নিয়ত, নতুন পথচলা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 

দেখতে দেখতে আরও একটি বছর আমাদের জীবন থেকে বিদায় নিল। ২০২৫ শেষ হয়ে ২০২৬ এসে দাঁড়িয়েছে দরজায়। আশ্চর্য লাগে—এই তো সেদিন ২০২৪ শেষ করে আমরা ২০২৫-এ পা রেখেছিলাম, কত স্বপ্ন, কত আশা নিয়ে। অথচ আজ মনে হচ্ছে, ২০২৫ যেন চোখের পলকেই শেষ হয়ে গেল। দিনগুলো কোথায় গেল, সময়গুলো কিভাবে ঝরে পড়ল—এর কোনো হিসাব আমরা রাখতে পারিনি।

আসলে সময় এমনই। সে নিঃশব্দে আসে, নিঃশব্দেই চলে যায়। মানুষ ব্যস্ত থাকে নিজের কাজে, নিজের চাওয়া-পাওয়ায়, নিজের হাসি-কান্নায়। আর এর মাঝেই একটি বছর আরেকটি বছরের সাথে মিশে যায়।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে সময়ের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন—

وَالْعَصْرِ ۝ إِنَّ الْإِنسَانَ لَفِي خُسْرٍ

“শপথ সময়ের! নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে।” (সূরা আল-আসর)

নতুন বছর আসা মানেই শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা বদলানো নয়। নতুন বছর মানে নিজের দিকে ফিরে তাকানো, নিজেকে প্রশ্ন করা—আমি গত বছর কী করলাম? আল্লাহর জন্য কী করলাম? নিজের নফসের বিরুদ্ধে কতটা দাঁড়াতে পেরেছি?

২০২৬-এর প্রথম দিন থেকেই আমাদের নিয়তকে নতুন করতে হবে। কারণ নিয়তই হলো সব কাজের প্রাণ। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

إِنَّمَا الأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ

“নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” (বুখারি, মুসলিম)

নিয়ত যদি স্বচ্ছ হয়, পথও স্বচ্ছ হয়। নিয়ত যদি আল্লাহর জন্য হয়, তাহলে ছোট কাজও বড় হয়ে যায়। আর নিয়ত যদি দুনিয়ার জন্য হয়, তাহলে বড় কাজও মূল্যহীন হয়ে পড়ে।

নতুন বছরে আমরা যেন ভালো একটি জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখি—কিন্তু সে জীবন শুধু দুনিয়ার সাফল্যে ভরা নয়, বরং আখিরাতের আলোয় উজ্জ্বল। এমন জীবন, যেখানে নামাজ আমাদের অভ্যাস, কুরআন আমাদের সঙ্গী, আর তাকওয়া আমাদের পোশাক।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ

“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, আর প্রত্যেকেই দেখুক সে আগামী দিনের জন্য কী পাঠিয়েছে।” (সূরা আল-হাশর: ১৮)

নতুন বছর মানে আগামী দিনের প্রস্তুতি। আজ আমরা যা করছি, সেটাই আমাদের আগামীকালের পরিচয় হয়ে দাঁড়াবে।

দুঃখের বিষয় হলো—নতুন বছর এলেই অনেক মানুষ আনন্দের নামে অনৈতিকতায় জড়িয়ে পড়ে। বোমা ফাটানো, ফটকা ফোটানো, গান-বাজনা, অশ্লীলতা—এসবকে তারা উদযাপন বলে মনে করে। অথচ তারা ভুলে যায়, এগুলো আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ।

একজন মুমিনের কাছে রাত মানে আল্লাহর দরবারে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। বিশেষ করে বছরের শেষ রাত—এটা আত্মসমালোচনার রাত, তাওবার রাত, কান্নার রাত।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

كُلُّ بَنِي آدَمَ خَطَّاءٌ وَخَيْرُ الْخَطَّائِينَ التَّوَّابُونَ

“আদম সন্তানের সবাই ভুলকারী, আর সর্বোত্তম ভুলকারী তারাই যারা বেশি বেশি তাওবা করে।” (তিরমিজি)

নতুন বছরের প্রথম প্রহর যেন শুরু হয় সিজদায়। চোখের পানি দিয়ে, দোয়ার শব্দ দিয়ে, আল্লাহর দরজায় মাথা রেখে।

আজকের রাতে আমরা যদি গান-বাজনা নয়, বরং কুরআনের তিলাওয়াত করি—তাহলে এই রাত আমাদের জন্য সাক্ষী হয়ে থাকবে। আজ যদি আমরা আতশবাজি নয়, বরং দু’হাত তুলে দোয়া করি—তাহলে আকাশের ফেরেশতারা আমিন বলবে।

নতুন বছরে আমাদের সংকল্প হোক—

নামাজ কখনো ছুটবে না। হারাম থেকে চোখ নামিয়ে রাখবো। মিথ্যা কথা ছেড়ে দেবো। কারো হক নষ্ট করবো না। যতটা পারি দ্বীনের পথে চলবো।

আল্লাহ তাআলা বলেন—

إِنَّ اللَّهَ لَا يُغَيِّرُ مَا بِقَوْمٍ حَتَّىٰ يُغَيِّرُوا مَا بِأَنفُسِهِمْ

“নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।” (সূরা আর-রা‘দ: ১১)

২০২৬ তখনই সুন্দর হবে, যখন আমরা নিজেকে সুন্দর করবো। সমাজ তখনই বদলাবে, যখন ব্যক্তি বদলাবে।

নতুন বছরের নতুন কথা মানে শুধু নতুন পরিকল্পনা নয়—পুরোনো গুনাহ থেকে বিদায় নেওয়া। নতুন বছরের নতুন সকাল মানে পুরোনো ভুলের ওপর পর্দা টেনে দেওয়া।

এই বছর যেন হয়—

ইবাদতে ভরা একটি বছর। তাকওয়ায় ভেজা একটি বছর। মানুষের উপকারে কাটানো একটি বছর। আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি বছর।

আমরা জানি না—২০২৬ আমাদের জীবনের শেষ বছর কিনা। তাই এটাকে শেষ সুযোগ ভেবে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নতুন বছরের সূচনায় এই দোয়াই থাকুক—

اللَّهُمَّ اجْعَلْ هَذَا الْعَامَ عَامَ خَيْرٍ وَبَرَكَةٍ وَتُوبَةٍ

“হে আল্লাহ! এই বছরটিকে আমাদের জন্য কল্যাণ, বরকত ও তাওবার বছর বানিয়ে দিন।”

নতুন বছর হোক আল্লাহর দিকে ফিরে আসার বছর। নতুন দিন হোক নিজেকে বদলে ফেলার দিন। আর নতুন জীবন হোক—আখিরাতমুখী একটি জীবন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দিন— নতুন বছরকে সত্যিকারের নতুন করে তোলার।

আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি