সময় থাকতে সময়ের মূল্য যারা বুঝে না

 

সময় থাকতে সময়ের মূল্য যারা বুঝে না

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 

সময়—একটি নীরব স্রোত। সে শব্দ করে না, ডাক দেয় না, থামে না কারো জন্য। তবুও মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ এই সময়ই। আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষ সবকিছু হারালে আফসোস করে, কিন্তু সময় হারিয়েও খুব কম মানুষই কাঁদে। অথচ যে সময় চলে যায়, সে আর কখনো ফিরে আসে না।

সময় থাকতে সময়ের মূল্য যারা বুঝে না, তারা আসলে নিজেদেরই মূল্য বোঝে না। কারণ মানুষের জীবন মানেই কিছু নির্দিষ্ট সময়। শৈশবের সময়, যৌবনের সময়, শক্তির সময়, সুযোগের সময়—সবকিছুরই আলাদা একটি দরজা আছে। দরজাটা খোলা থাকে কিছুক্ষণ, কেউ ঢুকে পড়ে, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই দরজা বন্ধ হতে দেখে।

আমরা অনেকেই বলি—“একদিন করবো”, “সময় পেলে করবো”, “এখন না, পরে”। এই ‘পরে’ শব্দটাই সবচেয়ে বড় ধোঁকা। কারণ পরে বলে আসলে কিছু নেই। আছে শুধু এই মুহূর্ত, এই নিঃশ্বাস, এই সময়।

একজন ছাত্র ভাবে—এখন না পড়লেও চলবে, সামনে সময় আছে। একজন যুবক ভাবে—এখন দীন মানা কঠিন, পরে ঠিক হয়ে যাবে। একজন বৃদ্ধ ভাবে—আর একটু সময় পেলে তাওবা করবো।

কিন্তু সময় কাউকেই এতটা সুযোগ দেয় না যতটা আমরা ভাবি।

সময় ঠিক নদীর মতো। তুমি যদি আজ পানি তুলে না রাখো, কাল নদীর তীরে দাঁড়িয়ে শুধু শুকনো বালু পাবে। যারা সময়কে অবহেলা করে, তারা একদিন স্মৃতির কবরস্থানে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা সময়ের কদর করেছে, তারাই ইতিহাস হয়েছে। আর যারা সময় নষ্ট করেছে, তারা ইতিহাসের পাতায় শুধু আফসোস হয়ে থেকেছে। পৃথিবীর বড় বড় আলেম, বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ—তারা কেউ অলস ছিল না। তারা সময়কে বন্ধু বানিয়েছিল, শত্রু নয়।

সময় নষ্ট করা শুধু ঘুমানো বা খেলাধুলা নয়। সময় নষ্ট হয় তখনও, যখন আমরা উদ্দেশ্যহীন জীবন যাপন করি। সকাল আসে, সন্ধ্যা নামে—কিন্তু জীবনে কোনো দিকনির্দেশনা থাকে না। এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর অপচয়।

অনেকেই বলে—“আমার তো কিছু করার নেই।” আসলে এটা সবচেয়ে বড় মিথ্যা।

যার হাতে কলম আছে, সে লিখতে পারে। যার চোখ আছে, সে পড়তে পারে। যার কণ্ঠ আছে, সে সত্য বলতে পারে। যার নিঃশ্বাস আছে, সে আল্লাহকে ডাকতে পারে।

সময় থাকতে সময়ের মূল্য বোঝা মানে শুধু দুনিয়ার কাজে ব্যস্ত থাকা নয়। বরং দুনিয়া ও আখিরাত—দুটোকেই একসাথে গুছিয়ে নেওয়া। আজকের সময়ে করা একটি ছোট নেক আমল, আগামীকালের পাহাড়সম সওয়াব হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কিন্তু আমরা কী করি? ঘন্টার পর ঘন্টা ফোন স্ক্রল করি। দিনের পর দিন অর্থহীন গল্পে ডুবে থাকি। রাতের পর রাত কাটাই অনুশোচনাহীনভাবে।

তারপর একদিন যখন শরীর দুর্বল হয়ে যায়, চোখ ঝাপসা হয়, তখন বলি—“ইশ! যদি আগে বুঝতাম!”

এই ‘যদি’ শব্দটাই সবচেয়ে কষ্টের।

সময় বোঝে না কে ধনী, কে গরিব। সে সবার কাছ থেকেই সমানভাবে কেটে নেয়। পার্থক্য শুধু একটাই—কেউ সেই কাটা সময় দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ে, কেউ দিয়ে দেয় আফসোসের বোঝা।

যারা সময় থাকতে সময়ের মূল্য বোঝে না, তারা ভাবে—জীবন অনেক বড়। কিন্তু জীবন আসলে খুব ছোট। একটি সকাল আসে, একটি রাত যায়—এইভাবেই পুরো জীবন ফুরিয়ে যায়।

একদিন মানুষ বুঝতে পারে— যে সময়ে সে নামাজ ফেলে রেখেছিল, সে সময়ে সে তাস খেলেছিল। যে সময়ে সে কুরআন খুলতে পারতো, সে সময়ে সে গল্প শুনেছিল।

তখন আর কিছুই করার থাকে না।

সময় মানুষকে বারবার সুযোগ দেয় না। সে শুধু একবার দরজাটা খুলে দেয়। যে ঢুকে পড়ে, সে বাঁচে। যে গাফেল থাকে, সে হারায়।

এইজন্য জীবনে নিয়মকানুন খুব জরুরি। একটি সুশৃঙ্খল জীবন মানেই সময়ের হেফাজত। ঘুমের সময় নির্দিষ্ট, কাজের সময় নির্দিষ্ট, ইবাদতের সময় নির্দিষ্ট—এভাবেই একজন মানুষ নিজের সময়কে সম্মান করতে শেখে।

যে মানুষ নিজের প্রতি দায়িত্বশীল, সে কখনো সময়কে অবহেলা করতে পারে না। কারণ সে জানে—সময় নষ্ট করা মানে নিজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা।

আজ যদি তুমি লিখে না রাখো, কাল ভুলে যাবে। আজ যদি তুমি শুরু না করো, কাল সাহস পাবে না। আজ যদি তুমি বদলাতে না চাও, কাল বদলানোর শক্তি থাকবে না।

সময় এমন এক শিক্ষক, যে কোনো শব্দ ছাড়াই শিক্ষা দিয়ে যায়। কিন্তু শর্ত একটাই—শিক্ষা নিতে হবে সময় থাকতে।

একদিন এই জীবন শেষ হবে। মানুষ থাকবে না, নাম থাকবে না, পদবী থাকবে না। থাকবে শুধু কাজের হিসাব। তখন কেউ জিজ্ঞেস করবে না—তুমি কত সুন্দর কথা বলতে। জিজ্ঞেস করবে—তুমি সময়ের সাথে কী করেছ?

এই জন্য এখনই সময়। আজই সময়। এই মুহূর্তই সময়।

সময় থাকতে সময়ের মূল্য বুঝে নাও। কারণ সময় গেলে, শুধু স্মৃতি থাকে— আর স্মৃতি দিয়ে নতুন জীবন গড়া যায় না।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে তৌফিক দিন— সময়কে সম্মান করার, নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার, এবং হারিয়ে যাওয়ার আগেই জেগে ওঠার।

আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি