বই আমার বন্ধু—যখন বন্ধু আমার শত্রু তখন

 

বই আমার বন্ধু—যখন বন্ধু আমার শত্রু তখন 

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 

প্রত্যেকটা মানুষের জীবনে কেউ না কেউ থাকে, যার সাথে হৃদয়ের এক অদৃশ্য বন্ধন জড়িয়ে থাকে। কারো জীবনে সে বন্ধন ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে, কারো জীবনে পরিবারের সঙ্গে, আবার কারো জীবনে বন্ধুদের সঙ্গে। কিন্তু খুব কম মানুষই উপলব্ধি করতে পারে—জীবনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য, সবচেয়ে নিঃস্বার্থ, সবচেয়ে নীরব সঙ্গীটি আসলে কে। আমি বিশ্বাস করি, ছাত্রজীবন হোক কিংবা পরিণত বয়স—মানুষের জীবনে সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু হলো বই

মানুষ বদলে যায়। সম্পর্ক বদলে যায়। সময়ের সাথে সাথে মুখোশ খুলে পড়ে অনেক আপনজনের। যে বন্ধু একদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেছিল, সেই বন্ধুই একদিন অচেনা হয়ে ওঠে। কখনো হিংসা, কখনো স্বার্থ, কখনো অহংকার—বন্ধুত্বের বুক চিরে ঢুকে পড়ে বিষাক্ত ছুরি। তখন মানুষ ক্লান্ত হয়, ভেঙে পড়ে, বিশ্বাস করতে ভয় পায়। ঠিক সেই মুহূর্তে, নীরবে পাশে এসে দাঁড়ায় একটি বই।

বই কখনো প্রতারণা করে না। বই কখনো ঈর্ষা করে না। বই কখনো তোমার সাফল্যে অস্বস্তি বোধ করে না। বরং তুমি যত বড় হও, যত গভীরে যাও, বই তত বেশি গর্ব করে তোমাকে আপন করে নেয়। বই তোমাকে প্রশ্ন করে, আবার উত্তরও দেয়। বই তোমাকে কাঁদায়, আবার শক্ত করে দাঁড়াতেও শেখায়।

একটি ভালো বই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে—এটা কোনো অলঙ্কার নয়, এটি বাস্তব সত্য। ইতিহাসের পাতায় তাকালেই দেখা যায়, যাদের আমরা আজ আলোকবর্তিকা বলে জানি, তাদের অধিকাংশের সঙ্গী ছিল বই। বই তাদের শিখিয়েছে চিন্তা করতে, যুক্তি করতে, নিজের ভেতরের মানুষটিকে আবিষ্কার করতে।

খারাপ সময়ে মানুষ প্রায়ই একা হয়ে যায়। চারপাশে অনেক মুখ, কিন্তু পাশে কেউ থাকে না। তখন একটি বইই হতে পারে একমাত্র আশ্রয়। মনের ভেতরের অন্ধকার কোণগুলোতে আলো জ্বালিয়ে দেয় বই। যে কথা কাউকে বলা যায় না, সেই কথাগুলো বই নিঃশব্দে শুনে ফেলে। বই কখনো বিচার করে না, বরং বোঝার চেষ্টা করে।

বন্ধু অনেক সময় বদলে যায়—এই বাস্তবতা তিক্ত হলেও সত্য। আজ যে বন্ধু হাসিমুখে পাশে দাঁড়ায়, কাল সে-ই পেছন থেকে আঘাত করতে দ্বিধা করে না। কারণ মানুষ দুর্বল, মানুষ স্বার্থপর। কিন্তু বই? বই কখনো বদলে যায় না। শত বছর আগের বই আজও একই কথা বলে, একই সত্য বহন করে।

একটি বই মানুষের ভেতরে শৃঙ্খলা তৈরি করে। সময়ের মূল্য বোঝায়। মনকে গভীর করে। বই পড়া মানুষ সহজে ভেঙে পড়ে না, কারণ সে জানে—জীবন একমাত্র সে নয় যে কষ্ট পেয়েছে। অন্যের গল্প পড়ে সে নিজের ব্যথাকে বোঝে, সহ্য করতে শেখে।

বই আমাদের নৈতিকতা শেখায়, আদর্শ শেখায়। ধর্মীয় বই ঈমানকে শক্ত করে, সাহিত্য মানুষের হৃদয়কে নরম করে, বিজ্ঞান বই যুক্তিবোধ জাগিয়ে তোলে। ইতিহাস আমাদের ভুল থেকে শিক্ষা দেয়। প্রতিটি বই যেন মানুষের জীবনের এক একটি শিক্ষক।

বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব মানে নিজের সাথে বন্ধুত্ব করা। নিজের চিন্তার সাথে, নিজের স্বপ্নের সাথে, নিজের ভবিষ্যতের সাথে বন্ধুত্ব করা। যে মানুষ বইকে আপন করে নিতে পারে, সে কখনো একা থাকে না।

আজকের ব্যস্ত, কোলাহলমুখর পৃথিবীতে মানুষ সম্পর্কের ভিড়ে একা হয়ে যাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার হাজারো বন্ধু, কিন্তু হৃদয়ের কথা শোনার কেউ নেই। এই শূন্যতায় বই হয়ে উঠতে পারে একমাত্র আশ্রয়স্থল। একটি বই খুললেই যেন অন্য এক জগৎ—যেখানে কোলাহল নেই, আছে শুধু ভাবনা।

বই আমাদের ধৈর্য শেখায়। ধীরে পড়তে শেখায়, গভীরভাবে ভাবতে শেখায়। এই দ্রুতগতির যুগে বই মানুষকে থামতে শেখায়—নিজেকে বুঝতে শেখায়।

আমি মনে করি, ছাত্রজীবনে যদি কেউ একটি জিনিস আঁকড়ে ধরতে পারে, তবে সেটি বই। কারণ বই শুধু পরীক্ষায় পাস করায় না, জীবনের পরীক্ষায়ও উত্তীর্ণ হতে শেখায়।

বন্ধু যদি শত্রু হয়ে যায়, তাতে দুঃখ আছে—কিন্তু বই কখনো শত্রু হয় না। বরং মানুষ যত বেশি আঘাত পায়, বই তত বেশি আপন হয়ে ওঠে।

একদিন আমরা থাকব না। আমাদের কণ্ঠ থেমে যাবে। কিন্তু বই থেকে যাবে। আমাদের লেখা, আমাদের চিন্তা, আমাদের স্বপ্ন—সবকিছু বইয়ের পাতায় বেঁচে থাকবে। এটাই বইয়ের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য।

তাই বলি—বন্ধু আসবে, যাবে, বদলাবে। কিন্তু বই? বই থাকবে। নীরবে, অবিচল, বিশ্বস্ত। যখন মানুষ কষ্ট দেয়, তখন বই আগলে ধরে। যখন সম্পর্ক ভেঙে যায়, তখন বই গড়ে তোলে। যখন মন ক্লান্ত হয়, তখন বই বিশ্রাম দেয়।

বই আমার বন্ধু— কারণ বই কখনো আমাকে একা ছেড়ে যায় না।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি