সময়, দায়িত্ব ও লেখার উত্তরাধিকার

 

সময়, দায়িত্ব ও লেখার উত্তরাধিকার

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 
 

আমরা আমাদের জীবনে অনেক কিছুই স্বচক্ষে দেখি। কিছু দৃশ্য আমাদের চোখের সামনে দিয়ে নীরবে হেঁটে যায়, আর কিছু দৃশ্য গভীরভাবে হৃদয়ে গেঁথে থাকে—আজীবনের জন্য। আবার এমন অনেক কিছু আছে, যা আমরা দেখি না; কিন্তু কল্পনায় লালন করি, স্বপ্নে আঁকি, ভাবনায় বাঁচিয়ে রাখি। এই দেখা আর না-দেখার মাঝখানেই গড়ে ওঠে মানুষের জীবন।

মানুষের আশা থাকে, স্বপ্ন থাকে, লক্ষ্য থাকে। কেউ চায় জ্ঞান অর্জন করতে, কেউ চায় সমাজ বদলাতে, কেউ চায় নিজেকে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য বানাতে। কিন্তু এই চাওয়াগুলোর সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে অলসতা— আর তার চেয়েও বড় শত্রু নিজের দুর্বলতা। আমরা অনেক সময় ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এগোতে পারি না, কারণ আমরা সময়কে হেফাজত করতে জানি না।

সময় এমন এক নিয়ামত, যা আল্লাহ তায়ালা সবাইকে সমানভাবে দিয়েছেন, কিন্তু সবাই সমানভাবে ব্যবহার করতে পারে না। কেউ সময়কে রাজত্বে পরিণত করে, আর কেউ সেই সময়ের নিচেই চাপা পড়ে যায়। সময় নিজে কখনো দোষী নয়— দোষ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির, আমাদের অগোছালো জীবনের।

সময়কে হেফাজত করতে হলে শুধু ঘড়ি দেখা যথেষ্ট নয়। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মকানুন, প্রয়োজন আত্মশাসন, প্রয়োজন নিজের প্রতি নিজের দায়িত্ববোধ। যেদিন মানুষ নিজের কাছে নিজে প্রশ্ন করতে শেখে— “আমি কি আমার দায়িত্ব পালন করছি?”— সেদিন থেকেই সময় তার কথা শুনতে শুরু করে।

নিজের প্রতি যদি দায়িত্ব অর্পিত হয়, তাহলেই সময়কে হেফাজত করা সহজ হয়ে যায়। যে ব্যক্তি জানে—তার জীবন কোনো হাওয়ার খেলনা নয়, বরং একটি আমানত, সে কখনোই সময় নষ্ট করতে পারে না। কারণ সে বুঝে যায়— এই সময়ের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব একদিন দিতে হবে।

এই দায়িত্ববোধ জাগ্রত রাখার একটি সুন্দর উপায় হচ্ছে—লেখা। হ্যাঁ, সাধারণ একটি কাগজ, একটি কলম, আর সামান্য সচেতনতা— এই তিনটি জিনিসই মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। আমরা পারি আমাদের আশাগুলো লিখে রাখতে। আমরা পারি আমাদের স্বপ্নগুলোকে শব্দে বেঁধে ফেলতে।

একটি ছোট কাগজ পকেটে নিয়ে রাখা, যখন কোনো আশা মনে পড়বে—সেটা লিখে ফেলা, যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নজরে আসবে—সেটা নোট করে রাখা, যখন কোনো ভুল বুঝতে পারবো—সেটা নিজের জন্য লিখে রাখা। এই ছোট ছোট লেখাগুলোই একদিন বড় হয়ে ওঠে, ডায়েরি হয়, চিন্তার ভাণ্ডার হয়, আত্মার ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায়।

শুরুতে হয়তো সেই কাগজে লেখা থাকবে কয়েকটি ভাঙা বাক্য, কয়েকটি অসম্পূর্ণ ভাবনা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে, এই লেখাগুলো পূর্ণতা পেতে থাকে। একটি নোটের পাশে আরেকটি নোট যুক্ত হয়, একটি ভাবনার সাথে আরেকটি ভাবনা জুড়ে যায়। অজান্তেই গড়ে ওঠে চিন্তার একটি রাজ্য।

একদিন হয়তো আমরা থাকবো না। আমাদের কণ্ঠস্বর থেমে যাবে, পদচিহ্ন মুছে যাবে, নাম ধীরে ধীরে মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু যদি লেখা থেকে যায়— তবে সেটাই হবে আমাদের অস্তিত্বের সাক্ষী।

ইতিহাস আমাদের শেখায়— মানুষ মারা যায়, কিন্তু তার লেখা বেঁচে থাকে। কলমের কালি কখনো কখনো রক্তের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। কারণ রক্ত ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু লেখা যুগের পর যুগ মানুষকে পথ দেখায়।

এই কারণেই আমি চেষ্টা করি— আমি যা শিখেছি, আমি যা বুঝেছি, আমি যা উপলব্ধি করেছি— সেগুলো লিখে রাখার। নিজের জন্য নয়, বরং উম্মাহর জন্য।

উম্মাহ আজ ক্লান্ত। তারা অনেক কথা শুনেছে, কিন্তু কম উদাহরণ পেয়েছে। অনেক স্লোগান দেখেছে, কিন্তু কম দিকনির্দেশনা পেয়েছে। এই সময়ে প্রয়োজন এমন লেখা, যা শুধু আবেগ নয়— বরং দায়িত্ব শেখায়।

আমি বিশ্বাস করি— যদি একজন মানুষও আমার লেখা পড়ে নিজের সময়ের মূল্য বুঝতে শেখে, নিজের দায়িত্বের কথা মনে করে, নিজের জীবনটাকে একটু গুছিয়ে নিতে চায়— তবেই আমার লেখা সার্থক।

লেখা মানে শুধু সাহিত্য নয়। লেখা মানে সাক্ষ্য। লেখা মানে আমানত। লেখা মানে ভবিষ্যতের কাছে একটি চিঠি।

“হয়তো আমি থাকবো না, কিন্তু আমার শব্দগুলো কাউকে একদিন থামিয়ে দেবে— এই আশাতেই আমি লিখে যাই।”

আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে সময়ের কদর করা শিখিয়ে দিন। আমাদের কলমকে সত্যের বাহক বানিয়ে দিন। আমাদের লেখাকে উম্মাহর জন্য উপকারী করে তুলুন।

আমিন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি