১২ পর্ব
১২. অতীতের ঝড় ফিরে আসে—পরিবারের চাপ
এই শান্ত ভালোবাসা কি টিকে থাকবে সেই ঝড়ে? নাকি আবারও তাকে একা দাঁড়াতে হবে?
এই প্রশ্নটাই যেন বাতাসে ভাসছিল— নীরব, কিন্তু ভয়ংকর।
আরিয়ানা বুঝতে পারছিল, আল্লাহ তাকে যে সাময়িক প্রশান্তি দিয়েছেন, তা ছিল এক প্রস্তুতি। কারণ ঝড় আসার আগে সমুদ্র যেমন অদ্ভুতভাবে শান্ত হয়ে যায়, ঠিক তেমনই তার জীবনে নেমে এসেছিল এই নীরবতা।
অনুসন্ধানের শুরু
এক সকালে হুরাইরা ঘুম থেকে উঠেই লক্ষ্য করল— আরিয়ানার ফোনে একের পর এক মিসড কল।
নামগুলো অচেনা নয়। বাবার পুরোনো ড্রাইভার, এক দূর সম্পর্কের খালা, এমনকি গ্রামের এক প্রতিবেশীর নম্বরও।
আরিয়ানা ফোনটা হাতে নিয়েই বুঝে গেল— অতীত তাকে খুঁজে পেয়েছে।
তার বাবা, হাজী নুরুল আমীন— যিনি একসময় মেয়ের জন্য আকাশ ছুঁতে চেয়েছিলেন, আজ তিনি শুধু নিজের সম্মান বাঁচাতে ব্যস্ত।
মা ফারজানা খাতুন— যার চোখে মেয়ের জন্য ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সমাজের ভয়ে তা চাপা পড়ে গিয়েছিল।
ভাই রাশেদ— যে ছোটবেলায় আরিয়ানাকে আগলে রাখত, আজ সে পরিবারের “মান-সম্মান” রক্ষার সৈনিক।
চাপের ভাষা
প্রথমে কথাগুলো ছিল নরম।
“মা খুব অসুস্থ…” “বাবা রাতে ঘুমাতে পারে না…” “মানুষ কী বলছে জানো?”
আরিয়ানা ফোন কানে ধরে নিশ্চুপ থাকত। সে জানত—এই কথাগুলোর পেছনে লুকিয়ে আছে আরও বড় দাবি।
কয়েকদিন পরই আসল কথা বেরিয়ে এলো।
“ওরা এখনো অপেক্ষা করছে,” বলল এক আত্মীয়।
ওরা— সেই ধনী পাত্রপক্ষ। যাদের প্রাসাদসম বাড়ি, যাদের সম্পদ ছিল পাহাড়সম।
তাদের অহংকারে আঘাত লেগেছিল। এখন তারা আরিয়ানাকে পেতে চায়— ভালোবাসা থেকে নয়, জেদের আগুনে।
বেপরোয়া চেষ্টা
একদিন হুরাইরার বাসায় অচেনা একজন লোক এল। নিজেকে পরিচয় দিল— “পারিবারিক শুভাকাঙ্ক্ষী।”
কথার ফাঁকে ফাঁকে সে স্পষ্ট করে দিল— আরিয়ানার অবস্থান তারা জেনে গেছে।
আরও বলল— “এভাবে থাকলে ভালো হবে না। মেয়ের সম্মান নষ্ট হবে।”
এই শব্দগুলো আরিয়ানার বুকে ছুরি বসিয়ে দিল।
সে বুঝল— এটা আর শুধুই আবেগের চাপ নয়, এটা এখন ভয় দেখানো।
মেয়ের ভেতরের ঝড়
সেই রাতে আরিয়ানা ঘুমাতে পারল না।
মায়ের মুখ ভেসে উঠল। বাবার কঠিন চোখ। ভাইয়ের নীরব অভিমান।
তারপর ভেসে উঠল ইয়াসিরের কথা— “পরীক্ষা আসবে। কিন্তু আল্লাহ থাকলে ভয় নেই।”
আরিয়ানা সিজদায় পড়ে গেল।
চোখের পানি মাটিতে পড়তে পড়তে সে বলল— “হে আল্লাহ, আমি কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে চাই না। আমি শুধু তোমার সন্তুষ্টি চাই।”
“যদি আমার এই পথ ভুল হয়, আমাকে ফিরিয়ে নাও। আর যদি ঠিক হয়, তাহলে আমাকে শক্ত করো।”
সম্মান বনাম ঈমান
পরিবার আবার যোগাযোগ করল।
এইবার সোজাসাপ্টা কথা।
“তুই ফিরে আয়। বিয়ে হবে। এই অধ্যায় এখানেই শেষ।”
আরিয়ানা গভীর শ্বাস নিল।
সে জানত— এটা শুধু বিয়ের প্রশ্ন নয়।
এটা তার ঈমানের প্রশ্ন।
সে কি দুনিয়ার শান্তির জন্য নিজের আত্মাকে বিকিয়ে দেবে?
নাকি আল্লাহর ওপর ভরসা করে সব হারানোর ঝুঁকি নেবে?
নীরব শক্তি
এই সময় ইয়াসির কোনো বার্তা পাঠায়নি। কোনো আবেগী কথা বলেনি।
শুধু হুরাইরার মাধ্যমে এতটুকু বলেছিল— “আমি দোয়া করছি। সিদ্ধান্ত তোমার।”
এই কথাটাই আরিয়ানাকে ভেঙে পড়া থেকে বাঁচাল।
কেউ তাকে টানছে না। কেউ বাধ্য করছে না।
সে একা— শুধু আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো এক বান্দী।
ঝড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে
পাত্রপক্ষ শেষ চাল দিল।
হুমকি, অপমান, লোভ—সব একসাথে।
“না এলে সব দরজা বন্ধ।” “সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না।” “তোর ভবিষ্যৎ ধ্বংস।”
আরিয়ানার বুক কাঁপছিল।
কিন্তু তার ভেতরে এক অদ্ভুত শান্তি জন্ম নিচ্ছিল।
সে বুঝতে পারছিল— এই ঝড়ই তার আসল পরীক্ষা।
১৩তম পর্বের দিকে ইঙ্গিত
এই মুহূর্তে আরিয়ানার সামনে দুটি পথ—
একটি— সব ছেড়ে দিয়ে ফিরে যাওয়া, দুনিয়ার কাছে মাথা নত করা।
আরেকটি— সব হারানোর ঝুঁকি নিয়ে বলা, “আমার আল্লাহ আছেন।”
সে কোন পথ বেছে নেবে?
এই প্রশ্নের উত্তর নিয়ে আসবে পরবর্তী অধ্যায়— “স্থির ঈমান—মেয়ের ত্যাগ ও অটল সিদ্ধান্ত”।
যেখানে দেখা যাবে— দুনিয়া হারানোর ভয় নেই, কারণ আল্লাহ আছেন—এই বিশ্বাসে কীভাবে একজন মেয়ে অটল পাহাড় হয়ে দাঁড়ায়।
Comments
Post a Comment