নতুন বছরের আলো, কমে আসা হায়াত এবং জাগ্রত হৃদয়ের ডাক

 

নতুন বছরের আলো, কমে আসা হায়াত এবং জাগ্রত হৃদয়ের ডাক

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 

আজ জানুয়ারি মাসের ১ তারিখ, ২০২৬ সাল। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে গেছে। একটি নতুন সংখ্যা, নতুন বছর, নতুন সম্ভাবনা নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চারপাশে খুশির আমেজ—নতুন বছর পেয়েছি বলে আমরা আনন্দিত। মনে হচ্ছে, এবার সবকিছু নতুন করে সাজাবো। বাড়িঘর নতুনভাবে গুছাবো, পড়াশোনার টেবিল নতুন করে পরিষ্কার করবো, রুমের দেয়ালে নতুন রঙ লাগাবো, আলমারির ভেতর পুরোনো কাগজ ফেলে দিয়ে নতুন স্বপ্ন রাখবো।

নতুন বছর মানেই আমাদের জীবনে একধরনের উৎসব। আত্মীয়স্বজন আসবে, বন্ধু-বান্ধব আসবে, মেহমানের আনাগোনা বাড়বে। ঘরে ঘরে রান্নার ঘ্রাণ ছড়াবে। হরেক রকমের খাবার—মিষ্টি, ঝাল, নানান স্বাদের পদ। হাসি, গল্প, ছবি তোলা, শুভেচ্ছা বিনিময়—সব মিলিয়ে জীবন যেন একটু বেশি রঙিন হয়ে ওঠে।

কিন্তু এই সব খুশির মাঝেও একটি নীরব সত্য দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের সামনে—নতুন বছর এসেছে, কিন্তু আমাদের হায়াত কমে গেছে।

আমরা খেয়াল করি না। আমরা শুধু বলি—“আরেকটা বছর পেয়ে গেলাম।” কিন্তু সত্য হলো, আরেকটা বছর হারিয়ে গেল। যদি আমার বেঁচে থাকার সময় ৯০ বছর নির্ধারিত হতো, তাহলে আজ আর ৯০ নেই—আজ ৮৯। প্রতিটি নতুন বছর আমাদের বয়স বাড়ায়, কিন্তু জীবনের সময় কমায়।

এই সত্যটা খুব ধীরে, খুব নীরবে আমাদের দরজায় এসে কড়া নাড়ে। কিন্তু আমরা দরজা খুলে তাকাতে চাই না।

একদিন আমিও বাচ্চা ছিলাম। মায়ের হাত ধরে হাঁটতাম। ছোট্ট খেলনায় খুশি হয়ে যেতাম। তখন বুঝিনি—এই ছোট্ট সময়গুলো একদিন স্মৃতি হয়ে যাবে। তারপর কিশোর হলাম, যুবক হলাম। কেউ পড়াশোনায় ব্যস্ত হলো, কেউ ব্যবসায় নামলো, কেউ সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিল। কেউ বাবা হলো, কেউ দাদা, কেউ নানা। সময় আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা রূপ দিয়েছে।

কত হ্যাপি নিউ ইয়ার আমরা চোখের সামনে দেখেছি! কিন্তু সেই পুরোনো নতুন বছরগুলো কোথায়? তারা আর ফিরে আসে না। তারা শুধু স্মৃতির খাতায় থেকে যায়। প্রতিটি নিউ ইয়ার আমাদের কিছু না কিছু দিয়ে গেছে—কেউ সুখ পেয়েছে, কেউ কষ্ট, কেউ অভিজ্ঞতা, কেউ ক্ষতি।

প্রতিটি নতুন বছর আমাদের জীবন থেকে কিছু নিয়ে গেছে—অদৃশ্যভাবে, নিঃশব্দে।

আমরা আজ কেউ ধনী, কেউ গরিব। কেউ সুস্থ, কেউ অসুস্থ। কেউ হাসিতে ভরা, কেউ ভেতরে ভেতরে ভাঙা। কিন্তু একটি বিষয় আমাদের সবার জন্য সমান—মৃত্যু আমাদের দিকে সমান গতিতে এগিয়ে আসছে।

মৃত্যু কোনো ঘোষণা দিয়ে আসে না। সে বলে না—“আমি আগামীকাল আসবো।” সে হঠাৎ আসে। কখনো রাতে, কখনো দিনে। কখনো তরুণ বয়সে, কখনো বৃদ্ধ বয়সে। তাই নতুন বছরের এই প্রথম দিনে আমাদের একটু থামতে হবে। নিজের ভেতরের দিকে তাকাতে হবে।

আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি—আর কতদিন আমি নিজেকে ভুলে থাকবো? আর কতদিন আমি শুধু বাহিরের সাজগোজ নিয়ে ব্যস্ত থাকবো, কিন্তু ভেতরের ঘরটা অগোছালোই থেকে যাবে?

নতুন বছর এসেছে মানেই শুধু ঘর সাজানো নয়—হৃদয় সাজানোরও সময় এসেছে। শুধু নতুন জামা নয়—নতুন নিয়ত পরারও সময় এসেছে। শুধু অতিথিদের আপ্যায়ন নয়—নিজের আত্মার খোরাক দেওয়ারও সময় এসেছে।

আমরা প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চেহারা দেখি, কিন্তু খুব কম মানুষ নিজের আমলের আয়নায় তাকায়। নতুন বছর সেই সুযোগ এনে দেয়—নিজের সাথে নিজের সাক্ষাতের।

এই বছর আমি কী হতে চাই? শুধু বড় হতে চাই, নাকি ভালো হতে চাই? শুধু সফল হতে চাই, নাকি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হতে চাই?

জীবন খুব ছোট। কিন্তু আমরা এমনভাবে বাঁচি যেন শেষ নেই। আমরা আগামীকালের পরিকল্পনা করি, কিন্তু আজকের আমল ঠিক করি না। অথচ আজই হয়তো শেষ দিন।

নতুন বছরের আনন্দ আমাদের চোখে জল এনে দিক—কৃতজ্ঞতার জল। আল্লাহ আমাদের এখনো সময় দিয়েছেন। এখনো তাওবার দরজা খোলা। এখনো ফিরে আসার সুযোগ আছে।

এই বছর হোক আত্মসমালোচনার বছর। নিজের ভুলকে অস্বীকার করার নয়, স্বীকার করার বছর। অহংকার ভেঙে বিনয় শেখার বছর।

আমরা অনেক কিছু সাজাবো—ঘর, রুম, অফিস, দোকান। কিন্তু আসুন, এই বছর নিজের চরিত্রটাকেও একটু সাজাই। মিথ্যা ছেড়ে সত্য ধরি। হিংসা ছেড়ে ভালোবাসা ধরি। গুনাহ ছেড়ে তাওবা ধরি।

নতুন বছর আমাদের বলুক—“জাগো।” নিজেকে ভুলে থাকা বন্ধ করো। সময় ফুরিয়ে আসছে।

আজ জানুয়ারি ১, ২০২৬। এই তারিখটা শুধু ক্যালেন্ডারে নয়—আমাদের হৃদয়ে লিখে রাখি। যেন বছরের শেষে ফিরে তাকিয়ে বলতে পারি—এই বছর আমি শুধু বড় হইনি, আমি ভালোও হয়েছি।

নতুন বছরের খুশি হোক দায়িত্বশীল। নতুন স্বপ্ন হোক বাস্তব ও পবিত্র। নতুন পথচলা হোক আল্লাহর দিকে।

হে নতুন বছর, তুমি আমাদের জন্য কল্যাণ বয়ে আনো। আর হে মানুষ, তুমি নিজেকে চিনে নাও—এই সুযোগ আর নাও আসতে পারে।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি