উপন্যাস 6

 

৬. বাড়ি ছাড়ার বিদায়: অন্ধকার রাস্তায় আলোর সন্ধান

রাত তখন শেষ প্রহর। আকাশের কিনারায় ভোরের আভা রঙ তুলতে শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু অন্ধকারের আস্তর এখনও ঘরপথে ছড়িয়ে আছে। পর্ব ৫-এর সেই সিদ্ধান্তের রাত—যা ছিল কান্না, দোয়া, তাওয়াক্কুল আর আত্মসমর্পণের রাত—ঠিক সেই রাতের পূর্ণতা নিয়েই আরিয়ানা দাঁড়িয়ে আছে তার ছোট্ট ঘরের দরজার সামনে।

চোখের নিচে ঘুমহীনতার ছাপ, কিন্তু দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। যে সিদ্ধান্ত সে নিয়েছে তা এতটাই কঠিন যে তার হাত কাঁপছে, কিন্তু হৃদয়ের গভীর থেকে যেন কেউ তাকে শক্তি দিচ্ছে। সে নীরবে বলল— “হে আল্লাহ, তুমি পথ দেখিয়েছ… এবার আমাকে স্থির রাখো।”

ঘরের ভেতর তার পরিবারের কেউ এখনো ঘুমিয়ে। বাবা মোশাররফ হোসেনের নাকডাকার শব্দ দূরে faint করে শোনা যায়। মা রওশন আরা হয়তো ঠিক এ মুহূর্তেও বালিশে হাত রেখে ঘুমোচ্ছেন, মুখে চিন্তার রেখা। আর ছোট বোন আরিবা, বড় ভাই কামরুল—তারাও নিশ্চিন্ত রাতের ঘুমে। কিন্তু আরিয়ানা? সে আজ নিজের জীবনকে নতুন এক পথে ঠেলে দিচ্ছে।

অন্ধকার ঘর ছেড়ে প্রথম পদক্ষেপ

ডায়েরিটি বুকের ভেতর চাপা রেখে সে একবার তাকাল নিজের বিছানার দিকে। চাদরটি ভেজা—কান্নার দাগে। এই চাদরেই সে ইস্তিখারা করেছে, এই বিছানায়ই আল্লাহর কাছে সারারাত আকুতি করেছে, আর এই জানালার সামনে দাঁড়িয়েই সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিজের ভবিষ্যতের পথ।

সে ধীরে ধীরে দরজার চাবিটি ঘুরিয়ে খুলল। চাবির খুব হালকা ‘ক্লিক’ শব্দ হলো। সেই ক্ষুদ্র শব্দেও বুকের ভেতর ধুকপুক বাড়ল। মনে হলো—এই শব্দেই কি সবাই জেগে উঠবে?

কিন্তু কেউ ওঠেনি। ঘরগুলো শান্ত। রাতের নীরবতা যেন আরিয়ানার জন্য এই মুহূর্তে এক কোমল আশ্রয়।

সে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল একদম নিঃশব্দে। হাতে তার ছোট ব্যাগ—ভেতরে তিন জোড়া কাপড়, মোবাইল, চার্জার, একখানা তসবিহ, আর দুইটি প্রয়োজনীয় বই: কুরআন শরীফ আর রিয়াদুস সালিহীন।

নিজের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে সে যেন মনে ভর করে থাকা সব স্মৃতিকে আরেকবার ছুঁয়ে নিল। বাবার কণ্ঠ, মায়ের হাত, বোনের হাসি, ভাইয়ের রাগ—সব মিলেমিশে তৈরি হওয়া একটি নিরাপদ পৃথিবী। কিন্তু আজ তাকে সেই পৃথিবীর বাইরে পা রাখতে হচ্ছে। সত্যের পথে, তওয়াক্কুলের পথে, নিজের সম্মান, ঈমান আর ভালোবাসার পথে।

সে হৃদয়ের ব্যথা চেপে পা বাড়াল। এটাই তার বাড়ি ছাড়ার প্রথম পদক্ষেপ।

অন্ধকার রাস্তায় যাত্রা

রাস্তায় নরম কুয়াশা পড়েছে। স্ট্রিটলাইটগুলো মাঝে মাঝে কম্পমান আলো ফেলছে। রাস্তার ধারে কুকুর ডেকে উঠল একবার—কিন্তু আরিয়ানা থামল না। তার মনে একটাই কথা— “আল্লাহ আমার সাথে আছেন।”

মোবাইলে ৩:৫৮ AM। সে দ্রুত হাঁটা শুরু করল। তার গন্তব্য—তার বান্ধবী মাহিরার বাসা। মাহিরা তার ক্লাসমেট, খুব ঘনিষ্ঠ, এবং সেদিন কথা দিয়েছিল— “যদি কখনো কিছু হয়, তুমি আমার বাসায় চলে আসবে। আমি আছি।

আজ সেই কথাটি সত্যিকারের আশ্রয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাস্তার গভীর নীরবতা মাঝে মাঝে ভয় ধরায়। কিন্তু তার হৃদয়ে এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি। হয়তো সেটাই ইস্তিখারার বরকত, হয়তো আল্লাহর তরফ থেকে দেওয়া একটি শক্তি।

হাঁটতে হাঁটতে সে মনে মনে সূরা ফাতিহা পড়ছিল। তার কণ্ঠ ছিল এত নিচু যে বাতাসের শব্দেও হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই ফিসফিস দোয়াও আজ তাকে শক্তি দিচ্ছিল।


তওয়াক্কুলের আলো: আল্লাহর সাহায্যের অনুভূতি

রাস্তার মাঝপথে এসে সে একটু থামল। তার মনে হলো—কেউ কি তাকে দেখলো? কেউ কি তার বাড়িতে গিয়ে নিয়ে যাবে যে সে চলে গেছে? এই ভয়গুলো তাকে কাঁপিয়ে তুলতে লাগল।

ঠিক তখন বাতাসে হালকা একটা দমকা হাওয়া এল। গাছের ডালগুলো নড়ে উঠল, শুকনো পাতা উড়ে তার পথ ছুঁয়ে গেল। সে থমকে গেল। মনে হলো যেন বাতাস তাকে আশ্বস্ত করছে। “যাও। তোমার পথ ঠিক। আল্লাহ তোমার সাথে আছেন।”

তার চোখে আবার পানি চলে এল। কিন্তু এবার তা ভয়ের নয়—আশার।

তার মন বলল— যে পথে আল্লাহই পথপ্রদর্শক, সে পথ অন্ধকার হলেও আলোকিত।

তার পা আবার দ্রুত চলতে শুরু করল।

একটি স্মৃতি: বাড়ির জানালা

হাঁটতে হাঁটতে সে একবার পিছনে তাকাল। তার বাড়ির ছাদ, সেই চেনা জানালা—যেখান থেকে সে বহু রাত চাঁদ দেখেছে, দোয়া করেছে। আজ সেই জানালা থেকে কেউ তাকে দেখছে না। কিন্তু সে জানে, একদিন তার পরিবার অবশ্যই তার সিদ্ধান্তের মানে বুঝবে।

সে ফিসফিস করল— “আল্লাহ, আমার পরিবারকে হিফাজত করো।”

তার চোখে আবার কান্না। কিন্তু সে পেছনে ফিরে যায়নি। সত্যিকারের যাত্রীরা কখনো পেছনে তাকায় না—তারা শুধু সামনে এগোয়।

হাঁটার শেষ প্রান্তে এক নতুন আলো

দূরে একটি বাড়ির জানালা থেকে আলো ঝলমল করে বেরোচ্ছে। সেই বাড়িটিই মাহিরার। সেই আলো যেন অন্ধকার রাতটিকে ছিন্ন করে তার পথ আলোকিত করছিল। মনে হচ্ছিল—এটাই তার এই মুহূর্তের নিরাপদ বাতিঘর।

মোবাইলে কল দিল মাহিরাকে।

মাহিরা ফোন ধরতেই উদ্বিগ্ন গলায় বলল— “আরিয়ানা? তুমি পৌঁছে গেছো? বাইরে দাঁড়িয়ে আছো?”

আরিয়ানার কণ্ঠ ভেঙে গেল— “হুঁ… দরজার সামনে।”

মাত্র কয়েক সেকেন্ড পর দরজা খুলে গেল। মাহিরা ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। “তুই ঠিক আছিস? কাঁদছিস কেন?

আরিয়ানা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। মাহিরার কাঁধে মাথা রেখে সে তীব্রভাবে কাঁদতে লাগল। সারা রাতের দুঃখ, ভয়, সিদ্ধান্তের ভার, পরিবারকে ফেলে আসার যন্ত্রণা—সব যেন এই জড়িয়ে দেয়া সান্ত্বনার মধ্যে বেরিয়ে এলো।

মাহিরা তাকে বাসার ভেতরে নিয়ে গেল। ঘরে আলো, উষ্ণতা ছিল। আর বাইরে ছিল অন্ধকার, অনিশ্চয়তা, ভয়।

কিন্তু এই আলোই আজ ছিল তার তওয়াক্কুলের প্রতিদান— আল্লাহ তাকে নিরাপদে পৌঁছে দিয়েছেন।

ঘরের ভেতর নতুন আশ্রয়

মাহিরার মা, সুমি আপা—একজন শান্ত স্বভাবের, মমতাময়ী নারী—ঘরে এসে অবাক হয়ে দাঁড়ালেন। “আরিয়ানা? এই সময়ে?”

মাহিরা সব খুলে বলতে লাগল। সুমি আপা শুধু কাছে এসে আরিয়ানার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। “মা, তুমি এখন নিরাপদে আছো। ভয় পাবা না।”

এই কথা শুনে আরিয়ানার কান্না আরও বেড়ে গেল। কিন্তু সেই কান্না ছিল নিরাপত্তার কান্না—আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার কান্না।

আজ সে বুঝল— যে মানুষ আল্লাহর ওপর ভরসা করে পথে বেরোয়, আল্লাহ তার জন্য এমন বাড়ি খুলে দেন, যেটা সে কল্পনাও করতে পারে না।

পর্বের শেষ: আলো খুঁজে পাওয়ার প্রথম ধাপ

যে ভোরে সে পৌঁছাল মাহিরার বাসায়, সেই ভোরে আকাশে হালকা লালিমা ফুটছিল। আরিয়ানা জানালা দিয়ে তাকাল— এটাই ছিল তার নতুন জীবনের প্রথম সকাল। অনিশ্চয়তা আছে, ভয় আছে, ভবিষ্যৎ ধোঁয়াটে— কিন্তু তার হৃদয়ে আলো আছে, কারণ তার হৃদয় আজ তওয়াক্কুলে ভরা।

এই রাতে সে বাড়ি ছেড়েছে, কিন্তু হয়তো এই রাতই তাকে সত্যিকারের বাড়ির পথে নিয়ে যাবে— যে বাড়ি আল্লাহ বান্ডাদের জন্য নিরাপত্তা দেন।

পরবর্তী পর্বের ইঙ্গিত

মাহিরার ঘরই এখন তাঁর প্রথম আশ্রয়— কিন্তু এই নতুন আশ্রয়, নতুন পরিবেশ, নতুন সুরক্ষা— সবই তাকে আরেকটি অধ্যায়ের দিকে নিয়ে যাবে।

পরবর্তী পর্ব— ৭. নতুন ঠিকানা: বান্ধবীর ঘরে আশ্রয়

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি