পর্ব 11
১১. হৃদয়ে ঈমানের পথে হাঁটা দু’জন
এই যাত্রার নাম— “হৃদয়ে ঈমানের পথে হাঁটা দু’জন”।
এটা কোনো হঠাৎ জন্ম নেওয়া প্রেম নয়, এটা কোনো চোখের চাহনি থেকে গড়ে ওঠা সম্পর্কও নয়। এটা এমন এক বন্ধন—যা ধীরে ধীরে জন্ম নেয় আল্লাহর ভয়ে, তাকওয়ার আলোতে, সীমারেখার সৌন্দর্যে।
আরিয়ানা ও ইয়াসির—দু’জনেই তা জানত। তারা কেউই নিজেদের অনুভূতিকে অস্বীকার করছিল না, কিন্তু কেউই তা ছেড়ে দিচ্ছিল না নফসের হাতে।
নীরব বোঝাপড়া
তাদের মাঝে কোনো প্রকাশ্য প্রেমালাপ ছিল না। কোনো “তুমি-আমি” গল্প ছিল না। তবুও এক অদ্ভুত বোঝাপড়া গড়ে উঠছিল— যেখানে শব্দের চেয়ে নীরবতা বেশি কথা বলত।
ইয়াসির কখনো একা করে কথা বলার চেষ্টা করেনি। আরিয়ানাও কখনো সীমা ছুঁয়ে দেখার কৌতূহল দেখায়নি।
তারা জানত— যে সম্পর্ক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য শুরু হয়, তা হারাম দিয়ে এগোতে পারে না।
ইবাদতের বন্ধন
একদিন ফজরের পর হুরাইরার বাসায় বসে আরিয়ানা কুরআন তিলাওয়াত করছিল। হুরাইরা জানাল—ইয়াসিরও নাকি প্রতিদিন ফজরের পর কিছু সময় কুরআন পড়ে।
এই ছোট্ট তথ্য আরিয়ানার হৃদয়ে অদ্ভুত প্রশান্তি আনল। সে ভাবল— “যে মানুষ আল্লাহর সাথে সময় কাটায়, সে কি কখনো অন্যায় ভালোবাসা চাইতে পারে?”
ইবাদত যেন তাদের মাঝে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি করছিল। একই সময়ে, ভিন্ন জায়গায়— তারা দু’জনই সিজদায় পড়ছিল।
হয়তো একই দোয়া নিয়ে— “হে আল্লাহ, যা কল্যাণকর, তাই আমাদের জন্য সহজ করো।”
উপদেশের ভাষা
একদিন হুরাইরার মাধ্যমে ইয়াসির একটি কথা পাঠাল— “নিজেকে আগলে রেখো। এই দুনিয়া খুব দ্রুত মানুষকে বদলে দেয়।”
এই বাক্যে কোনো দাবি ছিল না, কোনো অধিকারবোধ ছিল না। ছিল শুধুই দায়িত্ববোধ।
আরিয়ানার চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল— এটা এমন একজন মানুষ, যে তাকে নিজের জন্য নয়, আল্লাহর জন্য ভালো থাকতে বলছে।
আরিয়ানাও হুরাইরার মাধ্যমে জবাব দিল— “দোয়া কোরো, যেন আমরা নিজেদের না হারাই।”
রোমান্টিকতা—কিন্তু হালালের ছায়ায়
তাদের রোমান্টিকতা ছিল অন্য রকম। একজন আরেকজনের জন্য দোয়া করা—এটাই ছিল সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।
ইয়াসির জানত— আরিয়ানা কীভাবে দুনিয়ার ঝড়ে একা দাঁড়িয়েছে। আরিয়ানাও জানত— ইয়াসির কীভাবে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে।
এই জানাটাই ছিল তাদের অনুভূতির গভীরতা।
কখনো আকাশের দিকে তাকিয়ে আরিয়ানা ভাবত— “হে আল্লাহ, যদি এই মানুষটি আমার জন্য কল্যাণকর হয়, তবে আমাদের পথ সহজ করে দাও।”
কখনো ইয়াসির সিজদায় পড়ে বলত— “হে আল্লাহ, আমাকে এমন পুরুষ বানাও, যার কারণে কোনো মেয়ের ঈমান নষ্ট না হয়।”
স্বপ্ন—কিন্তু দুনিয়ার নয়
তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলত না সরাসরি। কিন্তু স্বপ্ন দেখত—একই রকম।
একটি ঘর—যেখানে ফজরের আজান শোনা যাবে। একটি পরিবার—যেখানে সন্তানদের প্রথম শিক্ষা হবে কুরআন।
একটি জীবন—যেখানে ভালোবাসা মানে হবে ধৈর্য, আর ঝগড়া মানে হবে দোয়া।
এই স্বপ্নগুলো কোনোদিন মুখে বলা হয়নি, তবুও দু’জনেই অনুভব করছিল— আল্লাহ তাদের অন্তরে একই ছবি আঁকছেন।
অটল থাকার পরীক্ষা
তবুও আরিয়ানা জানত— এই শান্ত অধ্যায় চিরস্থায়ী নয়।
নবম অধ্যায়ের ঝড় থেমেছিল, কিন্তু তার অতীত এখনো ঘুমিয়ে আছে।
সে অনুভব করছিল— বাড়ির লোকেরা কি সত্যিই হাল ছেড়ে দিয়েছে? পাত্রপক্ষ কি থেমে গেছে?
ইয়াসিরও বিষয়টা বুঝতে পারছিল। একদিন সে শুধু এতটুকু বলেছিল— “পরীক্ষা আসবে। কিন্তু আল্লাহ থাকলে ভয় নেই।”
একসাথে হাঁটার দৃঢ়তা
তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি, কিন্তু অন্তরে একটি সিদ্ধান্ত ছিল— হারাম পথে নয়।
যদি আল্লাহ চান, পথ খুলবে। না চাইলে—এই অনুভূতিও আল্লাহর জন্য কোরবানি।
এই পরিপক্বতাই তাদের সম্পর্ককে আলাদা করছিল।
১২তম পর্বের দিকে ইঙ্গিত
কিন্তু ঠিক তখনই— যখন মনে হচ্ছিল সব কিছু শান্ত, অতীতের দরজায় আবার কড়া নাড়বে ঝড়।
পরিবারের অনুসন্ধান শুরু হবে। পুরনো পাত্রপক্ষ আবার বেপরোয়া চেষ্টা চালাবে। আরিয়ানার ওপর নেমে আসবে নতুন চাপ।
এই শান্ত ভালোবাসা কি টিকে থাকবে সেই ঝড়ে? নাকি আবারও তাকে একা দাঁড়াতে হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে পরবর্তী অধ্যায়ে— “অতীতের ঝড় ফিরে আসে—পরিবারের চাপ”।
Comments
Post a Comment