অন্যকে মাফ করার উপকারিতা ও কেন মাফ করা উচিত

 

অন্যকে মাফ করার উপকারিতা ও কেন মাফ করা উচিত

মাফ করা—এটা মানুষের চরিত্রের এমন একটি আলো, যা অন্ধকার হৃদয়কে আলোকিত করে, সম্পর্ককে সুশীতল করে এবং আল্লাহর রহমতের দরজা খুলে দেয়। মাফ করা শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়; বরং এটি আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ ভালোবাসা, বরকত, শান্তি, বিনয়, প্রশান্তি এবং আখিরাতের সওয়াব লাভের শক্তিশালী মাধ্যম। কুরআন ও হাদীস বারবার মানুষকে ক্ষমা করার উৎসাহ দিয়েছে। এই প্রবন্ধে আমরা দেখব—অন্যকে মাফ করলে কী কী উপকার হয়, কেন মাফ করা উচিত, এবং ইসলামের আলোকে মাফের প্রজ্ঞা কী।


১. কুরআনে মাফ করার নির্দেশ ও প্রশংসা

কুরআনে আল্লাহ তা’আলা স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন—ক্ষমা করো, উপেক্ষা করো, উদার হও।

﴿ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا ۚ أَلَا تُحِبُّونَ أَنْ يَغْفِرَ اللَّهُ لَكُمْ ﴾ (সূরা আন-নূর, ২৪:২২)

অর্থ: “তোমরা ক্ষমা করো, উপেক্ষা করো। তোমরা কি পছন্দ করো না যে আল্লাহও তোমাদের ক্ষমা করবেন?” এ আয়াতে মাফ করার পেছনে আল্লাহ এমন একটি প্রেরণা দিলেন যা কোনো মানুষই অস্বীকার করতে পারে না— তুমি অন্যকে মাফ করলে আল্লাহ তোমাকে মাফ করবেন।

﴿ وَلْيَعْفُوا وَلْيَصْفَحُوا ﴾ (সূরা আন-নূর)

এখানে “আফ্‌ও” মানে—অপরাধ সম্পূর্ণ মুছে দেওয়া, “সফহ” মানে—মন থেকে বিরক্তিও দূর করে ফেলা।


২. হাদীসে মাফের মর্যাদা

قَالَ النَّبِيُّ ﷺ: «مَا نَقَصَتْ صَدَقَةٌ مِنْ مَالٍ، وَمَا زَادَ اللَّهُ عَبْدًا بِعَفْوٍ إِلَّا عِزًّا» (মুসলিম)

অর্থ: “মাফ করার দ্বারা আল্লাহ বান্দার সম্মানই বাড়িয়ে দেন।” মজার বিষয় হলো—মানুষ ভাবে মাফ করলে মান-সম্মান কমে যাবে; কিন্তু হাদীস বলছে—বরং বাড়বে।

«ارْحَمُوا تُرْحَمُوا، وَاغْفِرُوا يَغْفِرِ اللَّهُ لَكُمْ» (মুসনাদ আহমাদ)

“তোমরা রহম করো—তোমাদের প্রতি রহম হবে। তোমরা ক্ষমা করো—আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন।” এই হাদীস সরাসরি প্রতিশ্রুতি: তুমি যেমন আচরণ করবে, আল্লাহও তোমার সাথে তেমন আচরণ করবেন।


৩. অন্যকে মাফ করলে কী কী উপকার পাওয়া যায়

ক. হৃদয় থেকে বোঝা নেমে যায়

রাগ, বিদ্বেষ ও ক্ষোভ হৃদয়ের ভেতর আগুনের মতো। মাফ করার মাধ্যমে সে আগুন নিভে যায়, মন হয় পরিষ্কার।

খ. মানসিক প্রশান্তি ও ঘুমের শান্তি আসে

যে মানুষ কাউকে ক্ষমা করে না, সে সাধারণত অস্থির থাকে। অপরদিকে যে মানুষ মাফ করতে পারে, তার মন নরম থাকে, ঘুম শান্ত হয়, জীবনে প্রশান্তি আসে।

গ. সম্পর্ক টিকে থাকে

প্রতিটি সম্পর্কেই ভুল হয়—স্বামী-স্ত্রী, ভাই-ভাই, বন্ধু-বন্ধু, শিক্ষক-শিক্ষার্থী। কিন্তু ক্ষমাই সম্পর্ককে বাঁচিয়ে রাখে। যে পরিবারে ক্ষমা আছে, সেই পরিবারে সুখ আছে।

ঘ. প্রতিশোধের আগুন থেকে রক্ষা

প্রতিশোধ নেওয়ার আগ্রহ মানুষকে দুর্বল করে। মাফ তাকে উচ্চতা দেয়। এ জন্য আল্লাহ বলেন—

﴿ وَأَنْ تَعْفُوا أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى ﴾ (সূরা বাকারা)

অর্থ: “ক্ষমা করা তাকওয়ার কাছাকাছি।”

ঙ. বিপদ থেকে মুক্তি ও বরকত আসে

হাদীসে আছে— যে মানুষ ক্ষমা করতে পারে, আল্লাহ তার বিপদ দূর করেন। অনেক সময় দুনিয়ার বালা-мুসীবত মাফ করার কারণে দূর হয়ে যায়।

চ. দুআ কবুলের পথ সহজ হয়

হৃদয়ে বিদ্বেষ থাকলে আল্লাহর রহমত কম আসে। মাফ করলে হৃদয় পরিষ্কার হয়ে যায়—দুআ সহজে কবুল হয়।

ছ. আখিরাতে মহান প্রতিদান

﴿ فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّهِ ﴾ (সূরা আশ-শুরা, ৪০)

“যে ক্ষমা করল এবং সংশোধনের চেষ্টা করল—তার প্রতিদান আল্লাহর জিম্মায়।” এই আয়াত অসাধারণ। আল্লাহ নিজেই বলছেন—“তার পুরস্কার আমি দেব।” যে পুরস্কারের দায়িত্ব আল্লাহ নিলেন—এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি কি আছে?


৪. কেন মাফ করা উচিত—ইসলামের দৃষ্টিকোণ

১. আল্লাহ নিজে ক্ষমাশীল—আমাদেরও ক্ষমাশীল হতে হবে

﴿ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ ﴾

যে বান্দা আল্লাহর গুণ ধারণ করে, আল্লাহ তাকে ভালোবাসেন। আল্লাহর সবচেয়ে বড় গুণ—তিনি ক্ষমা করেন। তাই মুমিনও ক্ষমা করবে।

২. মাফ করা রাসূল ﷺ এর সর্বোচ্চ সুন্নাহ

রাসূল ﷺ কে মানুষ মিথ্যাবাদী, জাদুকর, মানসিক রোগী পর্যন্ত বলেছিল, জুলুম করেছিল। কিন্তু তিনি কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে প্রতিশোধ নেননি। তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় ক্ষমার উদাহরণে ভরা।

৩. মাফ করা উদারতা (হিলম) ও তাকওয়ার পরিচয়

যে মানুষ ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, সে মহান। কুরআনে আল্লাহ বলেন—

﴿ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴾ (সূরা আলে ইমরান, ৩:১৩৪)

এ আয়াতে তিন স্তর: ১. রাগ চেপে রাখা ২. ক্ষমা করে দেওয়া ৩. উপকার করে দেওয়া এ তিনটির সম্মিলন—মুমিনের শ্রেষ্ঠ চরিত্র।

৪. নিজের ভুলের জন্য আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার সহজ উপায়

মানুষ ভুল করে, আবার ভুল করবে। তাই অন্যকে ক্ষমা করলে আল্লাহও আমাদের ক্ষমার দরজা খুলে দেন।

৫. মাফ করলে রাগ শান্ত হয়—হৃদয় কোমল হয়

রাগ মানুষকে অন্ধ করে দেয়। মাফ মানুষকে আলোয় ভরে দেয়। একজন রাগী ব্যক্তি যত মাফ করতে শেখে, তার চরিত্র তত উজ্জ্বল হয়।

৬. সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়

যদি সবাই প্রতিশোধ নেয়, সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়। আর যদি ক্ষমা করে, সমাজ শান্ত হয়। ইসলামের লক্ষ্যই—শান্তি প্রতিষ্ঠা।


৫. রাসূল ﷺ ও সাহাবাদের জীবনে ক্ষমার উদাহরণ

১. ত্বায়েফের ঘটনা

রাসূল ﷺ কে ত্বায়েফের লোকজন রক্তাক্ত করেছিল। তখন ফেরেশতা এসে বলল—চাইলেই আমরা এ লোকদের ধ্বংস করে দেব। কিন্তু নবী ﷺ বললেন— “না, আমি ক্ষমা করি। আশা করি এদের বংশধরদের মধ্যে কেউ ঈমান আনবে।” এ হলো ক্ষমার সর্বোচ্চ উদাহরণ।

২. মক্কা বিজয়ের দিন

মক্কার কুফফার যারা রাসূল ﷺ কে বহু বছর জুলুম করেছিল— বিজয়ের দিনে তিনি বললেন— “আজ তোমাদের উপর কোনো প্রতিশোধ নেই, তোমরা মুক্ত।” এত বড় ক্ষমা মানব ইতিহাসে বিরল।

৩. আবু বকর (রা.) এর ঘটনা

যে ব্যক্তি তার মেয়ের (আয়েশা রা.) বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ ছড়িয়েছিল— আবু বকর (রা.) প্রথমে সাহায্য বন্ধ করেছিলেন। পরে আয়াত নাযিল হলো— “ক্ষমা করো, তোমরা কি চাও না যে আল্লাহও তোমাদের ক্ষমা করুন?” তখন তিনি কেঁদে দিয়ে বললেন— “আমি তো চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।” তারপর তিনি সেই মানুষকে সাহায্য পুনরায় শুরু করেন।


৬. কীভাবে মাফ করার অভ্যাস গড়ে তুলব

মাফ করা সহজ নয়। কিন্তু কিছু পদ্ধতি নিজের মধ্যে আনলে সহজ হয়:

  • মনে রাখো—আমি নিজেও ভুল করি, তাই অন্যের ভুল ক্ষমা করা উচিত।
  • যে আমাকে কষ্ট দিয়েছে, তার পক্ষেও দোয়া করো—হৃদয় নরম হবে।
  • রাগ উঠলে সঙ্গে সঙ্গে কোন সিদ্ধান্ত না নেওয়া—রাগ কমলে ক্ষমা করা সহজ হয়।
  • জীবন ছোট—বিদ্বেষ ধরে রাখার সময় নেই—এটা মনে রাখা।
  • আল্লাহর প্রতিশ্রুত পুরস্কার স্মরণ করা।

৭. শেষ কথা

অন্যকে মাফ করা কোন দুর্বলতা নয়; বরং এটি শক্তিশালী মানুষদের কাজ। ক্ষমা মানুষের হৃদয়কে পরিচ্ছন্ন করে, রাগকে নিয়ন্ত্রণ করে, সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখে এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশাল পুরস্কার এনে দেয়। যে মাফ করে, আল্লাহ তার জন্য দুনিয়া-আখেরাতকে সহজ করে দেন। তাই মানুষের ভুল হলে, ব্যথা লাগলেও—আল্লাহর জন্য মাফ করে দাও। মাফের বিনিময় আল্লাহ নিজে দেবেন—এটাই মুমিনের আশার আলো।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি