অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড—ইসলামের দৃষ্টিতে
অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা ও সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড—ইসলামের দৃষ্টিতে
বর্তমান যুগে ছেলে-মেয়ে উভয়েই বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে ঘোরাফেরা, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া, সেলফি তোলা এবং সেই ছবিগুলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করার প্রবণতা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে। বিশেষ করে ছবি তোলা যেন একটি ‘ফ্যাশন’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু ইসলাম এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক করেছে।
শরীয়তের দৃষ্টিতে **অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা, নিজেকে প্রদর্শন করা, অর্ধনগ্ন বা পর্দাহীন অবস্থায় ছবি আপলোড করা**—এসবই হারাম বা কমপক্ষে কঠোরভাবে নিষেধ।
১. ছবি তোলার বিষয়ে ইসলামের মূলনীতি
হাদীসে রাসূল ﷺ স্পষ্টভাবে ছবি আঁকা বা প্রাণীর ছবি তৈরির উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। যদিও প্রয়োজনীয় যেমন—পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্র—এসব ক্ষেত্রে আলেমদের অনেকেই অনুমতি দিয়েছেন। কিন্তু **আনন্দের জন্য, শখের জন্য, নিজেদের সৌন্দর্য প্রদর্শনের জন্য ছবি তোলা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় এবং গুনাহের কাজ।**
হাদিসের দলিল:
রাসূল ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ»
অর্থ: “কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে সবচেয়ে কঠোর শাস্তির অধিকারী হবে সেইসব চিত্রশিল্পীরা।” (সহিহ বুখারি ৫৯৫০, মুসলিম ২১০৯)
এখানে المصورون শব্দের ব্যাখ্যায় অনেক আলেম বলেন: — যে কেউ প্রাণীর ছবি আঁকে / তৈরি করে / সংরক্ষণ করে এবং তা প্রচার করে।
ফেসবুকে ছবি আপলোডও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত
যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড করা মানুষের চোখে প্রদর্শন করা হয়—সুতরাং এটি ‘তাসবীর’ (ছবি প্রচার) এর অন্তর্ভুক্ত।
২. পর্দাহীন ছবি তোলা—কঠোরভাবে নিষিদ্ধ
মেয়েরা পর্দাহীন ছবি তুলে আপলোড করা—ইসলামে মারাত্মক গুনাহ। কারণ পুরুষদের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করা হারাম।
কোরআনের দলিল:
﴿ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا ﴾
অর্থ: “তারা যেন নিজেদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা প্রকাশ পাওয়া স্বাভাবিক তার বাইরে।” (সূরা আন-নূর ৩১)
ফেসবুকে ছবি আপলোড করার মাধ্যমে মেয়েরা অচেনা পুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ করছে। এটি সুস্পষ্ট হারাম।
৩. ছেলে-মেয়ের মেলামেশা করে ছবি তোলা—গুনাহ ও ফিতনার দরজা
বন্ধু-বান্ধবী মিলে ঘুরতে যাওয়া, রেস্টুরেন্টে যাওয়া, ছবি তোলা—ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
কোরআনের দলিল:
﴿ وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَى ﴾
অর্থ: “ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না।” (সূরা আল-ইসরা ৩২)
ছেলে-মেয়েদের অপ্রয়োজনীয় ঘোরাফেরা, হাসি-ঠাট্টা, সেলফি—এসবই ব্যভিচারের দরজা খুলে দেয়।
৪. ফেসবুকে ছবি পোস্ট করার ফিতনা
যখন একজন ছেলে বা মেয়ে নিজের ছবি পোস্ট করে— ✔ মানুষ লাইক দেয় ✔ কমেন্ট করে ✔ প্রশংসা করে ✔ হিংসা করে ✔ খারাপ দৃষ্টি দেয় এসবই গুনাহ সৃষ্টি করে।
আল্লাহ বলেন:
﴿ قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ ﴾
অর্থ: “মুমিন পুরুষদের বল—তারা যেন দৃষ্টি সংযত করে।” (সূরা আন-নূর ৩০)
যখন তুমি ছবি দাও—মানুষ তোমার দিকে তাকাতে বাধ্য হয়। এটি তাদের জন্যও গুনাহ, তোমার জন্যও গুনাহের কারণ।
৫. অহংকার, রিয়াকারি ও সেলফির রোগ
অনেক সময় ছবি তোলার পেছনে উদ্দেশ্য থাকে— ✔ লোক দেখানো ✔ নিজের সৌন্দর্য প্রকাশ ✔ ফলোয়ার বাড়ানো ✔ দুনিয়ার প্রশংসা পাওয়া কিন্তু এগুলো রিয়াকারীর লক্ষণ।
«مَنْ رَاءَى رَاءَى اللَّهُ بِهِ»
অর্থ: “যে লোক দেখানোর জন্য কাজ করে — আল্লাহ তাকে লোকদের সামনে লাঞ্ছিত করবেন।” (সহিহ মুসলিম ২৯৮৬)
৬. পর্দাহীনতা ফাইনালি ধ্বংস ডেকে আনে
কোরআন ও হাদিসে বারবার পর্দার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। সুতরাং ছবি তুলে অনলাইনে প্রকাশ করা সরাসরি পর্দা ভঙ্গ করার একটি মাধ্যম।
﴿ يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ ﴾
অর্থ: “হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন—তারা যেন নিজেদের উপর চাদর টেনে নেয়।” (সূরা আল-আহযাব ৫৯)
৭. এখনকার তরুণদের মধ্যে যে ভুলগুলো বেশি হচ্ছে
- বন্ধু/বান্ধবীদের সাথে অপ্রয়োজনীয় আড্ডা
- রেস্টুরেন্টে ছবি তুলে আপলোড
- টিকটক, রিলস বানানো
- অশ্লীল স্টাইলে সেলফি
- পর্দা ছাড়া মেয়েদের ছবি প্রকাশ
- ছেলেদেরও শরীর প্রকাশ করে ছবি দেওয়া
এসবই ইসলামে হারাম বা গুনাহ।
৮. করণীয়—আমরা কীভাবে বাঁচবো?
✔ অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা বাদ দিতে হবে ✔ পর্দাহীন ছবি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে ✔ ফেসবুক সেলফি কালচার পরিত্যাগ করতে হবে ✔ অনলাইন জীবনে সংযমী হতে হবে ✔ সৎ সঙ্গ গ্রহণ করতে হবে ✔ আল্লাহর ভয় ও হায়া জাগ্রত করতে হবে ✔ পাপের দিকে আহ্বানকারী বস্তু (অশ্লীল কনটেন্ট) বন্ধ করতে হবে
দোয়া:
«اللهم إني أسألك الهدى والتقى والعفاف والغنى»
অর্থ: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, পবিত্রতা এবং সামর্থ্য প্রার্থনা করছি।” (মুসলিম)
৯. শেষ কথা,,,
ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি আপলোড করা অনেকের কাছে “সাধারণ” মনে হলেও ইসলামের দৃষ্টিতে এটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। অপ্রয়োজনীয় ছবি তোলা, পর্দাহীনভাবে ছবি প্রকাশ, ছেলে-মেয়ে মেশামেশা করে সেলফি আপলোড—এসবই হারাম এবং গুনাহের দরজা খুলে দেয়।
মুমিনের কাজ হলো—নিজেকে গুনাহ থেকে বাঁচানো এবং অন্যদেরও বাঁচানো।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হায়া, পর্দা, তাকওয়া এবং গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন—আমিন।
Comments
Post a Comment