মানুষের আশা, পরিশ্রম এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা
মানুষের আশা, পরিশ্রম এবং আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা
দুনিয়ার প্রতিটি মানুষই কিছু না কিছু আশা-স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকে। কারো আশা—সে বড় হবে, সমাজে সম্মানিত হবে। কারো আশা—তার অনেক টাকা-পয়সা হবে। কেউ আশা করে—ভালো একটি চাকরি পাবে, আবার কেউ আশা করে—সুন্দর ও ধনী পরিবারে বিয়ে হবে। আরো কেউ ভাবতে থাকে—সে খুব ভালো জীবনসঙ্গী পাবে, সুখের সংসার হবে, সন্তান হবে নেককার। এই আশা-চাওয়া মানুষের স্বভাবজাত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো— আমরা কী সত্যিই সেই আশার মতো করে চেষ্টা করি? আমরা কি দোয়া করি? আমরা কি আল্লাহর কাছে চাই, তাঁর উপর ভরসা করি?
বাস্তবতা হলো—অনেক সময়ই মানুষ আশা তো করে, কিন্তু সেই আশার উপযুক্ত পরিশ্রম করে না। দোয়া করে না। আল্লাহর উপর ভরসা না করে কেবল নিজের পরিকল্পনা নিয়েই ব্যস্ত থাকে। যখন তার আশা পূরণ হয় না, তখন সে হতাশ হয়। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করে—“কেন আমার হলো না? আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেন না কেন?”
আশা থাকা দোষ নয়, কিন্তু আশা অনুযায়ী চেষ্টা না করা দোষ
মানুষ যদি আশা-স্বপ্ন দেখে, তাহলে তার সাথে পরিশ্রম করা বাধ্যতামূলক। কোরআনে আল্লাহ তা'আলা বলেন—
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
"মানুষের জন্য নেই শুধু সেইটুকুই, যা সে চেষ্টা করে।" (সূরা النجم: 39)
এই আয়াত বলে দিচ্ছে—আশা করলেই হবে না, চেষ্টা করতে হবে, দোয়া করতে হবে, সবর করতে হবে এবং ফলাফলের উপর আল্লাহর উপর ভরসা রাখতে হবে।
মানুষের আশা পূরণ না হওয়ার বড় কারণ
আজকের যুগে আমরা তিনটি বড় ভুল করি—
- ১. আশা করি, কিন্তু চেষ্টা করি না।
- ২. চেষ্টা করি, কিন্তু দোয়া করি না।
- ৩. দোয়া করি, কিন্তু তাওয়াক্কুল করি না।
এ তিনটি জিনিস পূর্ণ না হলে মানুষের ইচ্ছা পূরণ হয় না। সেই সাথে আমরা ভুলে যাই— যা আল্লাহ ঠিক করে দেন, তাতেই আমাদের কল্যাণ।
আল্লাহর পরিকল্পনা সবসময় সর্বোত্তম
মানুষ ভাবে—“আমার অনেক টাকা হলে ভালো হতো”, কিন্তু আল্লাহ জানেন—এই টাকা হয়তো তার জন্য ফিতনা হয়ে যেত। মানুষ ভাবে—“আমি যদি ওই মানুষটাকে বিয়ে করতে পারতাম তাহলে জীবন ভালো হতো”, কিন্তু আল্লাহ জানেন—তার মধ্যে এমন কষ্ট লুকিয়ে আছে যা তুমি দেখতে পাও না।
وَعَسَىٰ أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ
"তোমরা কোনো কিছুকে অপছন্দ কর অথচ তাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে।" (সূরা البقرة: 216)
তাই আশা পূরণ না হলে হতাশ হওয়ার দরকার নেই। বরং বুঝতে হবে—আল্লাহ আমাকে তার চেয়েও ভালো কিছু প্রস্তুত করছেন।
মানুষ আশা পূরণ না হলে কেন অভিযোগ করে?
আজকের মানুষ খুব দ্রুত হতাশ হয়ে পড়ে। তার মনে হয়—সে যা চেয়েছে, সেটা না পেলেই সব শেষ। অনেকে আল্লাহকে দোষারোপ করে— “কেন আমার হলো না?” এটি খুবই বড় ভুল।
হাদীসে এসেছে—
قَدَّرَ اللَّهُ وَمَا شَاءَ فَعَلَ
"আল্লাহই তাকদির করেছেন, তিনি যা ইচ্ছা তা-ই করেন।" (বুখারি ও মুসলিম)
অর্থাৎ, আল্লাহর সিদ্ধান্তই সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত। মানুষের জ্ঞান সীমিত, আর আল্লাহর জ্ঞান অসীম।
আসলে কী করা উচিত?
যদি আমরা সত্যিই আশা পূরণ করতে চাই, তাহলে তিনটি জিনিস জীবনভর ধরে রাখতে হবে—
১. সঠিক পরিশ্রম
বিদ্যার আশা করলে পড়াশোনায় মেহনত, টাকার আশা করলে হালাল রোজগারের চেষ্টা, ভালো পরিবার চাইলে চরিত্র শুদ্ধ করা— এসব কাজ করতেই হবে।
২. পূর্ণ দোয়া
দোয়া হচ্ছে মুমিনের অস্ত্র। শুধু জিহ্বায় দোয়া না, হৃদয় দিয়ে, কান্না দিয়ে, আশা নিয়ে দোয়া করতে হবে।
৩. তাওয়াক্কুল (আল্লাহর উপর ভরসা)
ফলাফল আল্লাহর হাতে। আমরা শুধু চেষ্টা করবো, বাকিটা তিনি ঠিক করবেন। কোরআনে আছে—
وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
"বিশ্বাসীগণ আল্লাহর উপরেই ভরসা করবে।" (সূরা آل عمران: 122)
আশা পূরণে নেক আমল ও গুনাহ ত্যাগ জরুরি
অনেকে বলে—"আমি তো চেষ্টা করি, তবুও আমার হয় না!" তখন প্রশ্ন করতে হয়— আমরা কি গুনাহ থেকে বেঁচে আছি? কারণ গুনাহ মানুষের রিজিক, সুখ, শান্তি ও আশা— সবই বন্ধ করে দেয়।
হাদীসে এসেছে—
إِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِالذَّنْبِ يُصِيبُهُ
"মানুষ গুনাহের কারণে রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।" (ইবনে মাজাহ)
তাই আমাদের উচিত— নামাজ ঠিক রাখা, গুনাহ ত্যাগ করা, হারাম থেকে দূরে থাকা, এবং সৎ পথে চলা।
আশা পূরণের বাস্তব পরামর্শ
- নামাজ ঠিকমতো আদায় করা
- সকালে-সন্ধ্যায় যিকির করা
- সদকা করা
- পিতামাতার দোয়া নেওয়া
- গুনাহ ও হারাম বিষয় পরিত্যাগ করা
- পরিশ্রমে ধারাবাহিক থাকা
- নিজের পরিকল্পনাকে আল্লাহর হুকুমের সাথে মিলিয়ে নেওয়া
শেষ কথা
আশা করা দোষ নয়। মানুষ আশায় বেঁচে থাকে। কিন্তু আশা পূরণের জন্য— চেষ্টা + দোয়া + তাওয়াক্কুল— এই তিনটি জিনিস একসাথে থাকতে হবে। যদি আশা পূরণ না হয়, হতাশ হওয়ার কিছু নেই— হয়তো আল্লাহ তোমার জন্য এর চেয়েও উত্তম কিছু লিখে রেখেছেন।
আল্লাহর বান্দা হিসেবে আমাদের কর্তব্য হলো— হাল ছাড়বে না, অভিযোগ করবে না, হতাশ হবে না— বরং চেষ্টা করবে, দোয়া করবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করবে।
Comments
Post a Comment