পরপর দুইদিন ভূমিকম্প—আল্লাহর সতর্কবার্তা, আমাদের অবস্থান ও করণীয়

 

পরপর দুইদিন ভূমিকম্প—আল্লাহর সতর্কবার্তা, আমাদের অবস্থান ও করণীয়

গতকাল যে ভূমিকম্পটি হলো, সেটি এখনো মানুষের মনে আতঙ্কের ছাপ রেখে দিয়েছিল। ঠিক তার পরদিনই, আজ মাগরিবের পর আবারও ভূমিকম্প অনুভূত হলো। পরপর দুইদিন ভূমিকম্প হওয়ার কারণে মানুষের মাঝে স্বাভাবিকভাবেই ভয়, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অনেকে দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে পড়েছে, কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁপতে থাকা ভবন দেখেছে। মনে হয়েছে, যদি আরও কয়েক সেকেন্ড দীর্ঘ হতো, তাহলে হয়তো বড় বিপদ নেমে আসতে পারত।

ভূমিকম্পের এ ধারাবাহিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানুষ কত অসহায়! এই পৃথিবী, আমাদের ঘরবাড়ি, আমাদের সমস্ত নিরাপত্তা—সবই আল্লাহর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। তিনি যদি রক্ষা করেন, তাহলে পাহাড়ও আমাদের ক্ষতি করতে পারবে না। আর তিনি যদি হেফাজত তুলে নেন, তাহলে একটি ছোট কম্পনই বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ভূমিকম্প—আল্লাহর পক্ষ থেকে সতর্কবার্তা

ইসলামে বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ অনেক সময় আল্লাহর কুদরতি পরীক্ষার অংশ হয় এবং একই সঙ্গে মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মানুষ যখন গুনাহের পথে চলে, অবাধ্য হয়ে যায়, হারাম-হালালের সীমা ভুলে যায়, তখন আল্লাহ বিভিন্ন উপায়ে মানুষকে সাবধান করে দেন।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—
﴿ وَمَا نُرْسِلُ بِالْآيَاتِ إِلَّا تَخْوِيفًا ﴾
“আমি নিদর্শনসমূহ পাঠাই শুধুমাত্র ভয় দেখানোর জন্য।” (সূরা ইসরা: ৫৯)

এই “তাখুইফ” বা সতর্কবার্তার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে চিন্তায় ফেরানো— আমরা কি ঠিক পথে আছি? আমরা কি আল্লাহকে ভুলে যাইনি? আমাদের আমল কি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?

পরপর দুইদিন ভূমিকম্প—এটা কি কাকতালীয়?

কোনো কিছুই কাকতালীয় নয়। পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনা আল্লাহর ইলম, হুকুম ও পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে। পরপর দুইদিন ভূমিকম্প হওয়া নিছক একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়—এটি গভীর চিন্তার বিষয়।

অনেকে বলতেই পারে, “প্লেট মুভমেন্ট”, “টেকটনিক শিফট”—হ্যাঁ, এগুলো বাহ্যিক কারণ। কিন্তু বাহ্যিক কারণের পেছনেও আল্লাহর হুকুমই কার্যকর।

কুরআনে আল্লাহ বলেন—
﴿ أَفَأَمِنُوا مَكْرَ اللَّهِ ۚ فَلَا يَأْمَنُ مَكْرَ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْخَاسِرُونَ ﴾
“তারা কি আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করে? হারামখোর লোক ছাড়া কেউই আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিরাপদ মনে করে না।” (সূরা ইউসুফ: ১০৭)

আমরা যে মুহূর্তটি অনুভব করেছি

ভূমিকম্পের সময় মানুষ কোনো ভাবনা করে না—না পোশাক, না অর্থ, না ঘরবাড়ি, না মোবাইল—শুধু দৌড়ে বাহিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। সেদিনের দৃশ্য—

  • মা-বাবাকে ভুলে দৌড়ে বের হয়ে যাওয়া,
  • নিজেকে শুধু বাঁচানোর চিন্তা,
  • ঘরের ভেতরে কি আছে না আছে তা খেয়াল করারও সময় নেই,
  • চারতলা, পাঁচতলা ভবনে যারা ছিলেন তাদের আতঙ্ক আরও বেশি,
  • খালি মাঠে গিয়ে শান্ত হওয়া পর্যন্ত হৃদপিণ্ড যেন থামছেই না—
এসবই প্রমাণ করে—মানুষ অত্যন্ত দুর্বল।

এই সামান্য কম্পনই যদি আমাদের এমন অবস্থায় ফেলে, তাহলে কিয়ামতের কম্পনে কী অবস্থা হবে?

কুরআনে আল্লাহ বলেন—
﴿ يَوْمَ تَرَوْنَهَا تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ ﴾
“যেদিন সেই ভূকম্পন দেখবে, স্তন্যদানকারী মা তার শিশুকে ভুলে যাবে।” (সূরা হজ্জ: ২)

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—
﴿ يَوْمَ يَفِرُّ الْمَرْءُ مِنْ أَخِيهِ ﴾
“যেদিন মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে পালাবে।” (সূরা আবাসা: ৩৪)

গতকাল ও আজকের ভূমিকম্প আমাদের এই আয়াতগুলোর বাস্তব অভিজ্ঞতা দিয়ে গেল।

আমাদের করণীয়—কিভাবে বাঁচবো আল্লাহর গজব থেকে?

মানুষের বাঁচার একটাই পথ—আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়া। কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা, নিরাপত্তা, ভবনের শক্তি—কিছুই আল্লাহর হুকুমের সামনে টিকতে পারে না।

১. গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে

আজ আমাদের সমাজে গুনাহ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। মিথ্যা, পরচর্চা, সুদ, অশ্লীলতা, নামাজ না পড়া, বেপর্দা—সব যেন অভ্যেস। এগুলো থামানোই প্রথম করণীয়।

২. পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ কায়েম করতে হবে

নামাজ আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার প্রথম উপায়। নামাজ না থাকলে আল্লাহর হেফাজত আমরা পাবো না। রাসুল ﷺ বলেছেন— “নামাজ দীন-এর স্তম্ভ।” (তিরমিজি)

৩. চোখের পানি ফেলে দোয়া করা

দোয়া আল্লাহর কাছে মানুষের সর্বশক্তিশালী অস্ত্র। চোখের পানি দিয়ে দোয়া করলে আল্লাহর রহমত খুব দ্রুত নেমে আসে।

৪. তওবা করা এবং জীবনের দিকে ফিরে তাকানো

আমার জীবনে কি এমন গুনাহ আছে যা আল্লাহকে রাগান্বিত করছে? তাওবা মানে শুধু “আস্তাগফিরুল্লাহ” বলা নয়— বরং সত্যিকারের অনুশোচনা, বিরত থাকা এবং আর সেই গুনাহে না ফেরা।

৫. সৎকর্মে ধাবিত হওয়া

  • সদকা করা
  • কুরআন তিলাওয়াত
  • গরিব-দুঃখীদের সাহায্য
  • অসুস্থদের খোঁজ নেওয়া
  • পিতা-মাতার সেবা
এসব আমল আল্লাহর গজব থেকে রক্ষা করে।

ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে

  • যদি ঘরের ভেতরে থাকো—টেবিল/বিছানার নিচে আশ্রয় নাও।
  • দ্রুত লিফট ব্যবহার করো না।
  • যদি নিচ তলায় থাকো—সোজা বাইরে বের হও।
  • উপরের তলায় থাকলে—সিঁড়ি ধরে ধীরে নেমে আসো।
  • বাইরে গেলে খোলা মাঠে অবস্থান করো।
  • দোয়া পড়তে থাকো—لا حول ولا قوة إلا بالله

পরিশেষে,,,

পরপর দুইদিন ভূমিকম্প হওয়া আমাদের জন্য একটি বিরাট শিক্ষা ও সতর্কবার্তা। আল্লাহ আমাদের সবার ওপর দয়া করেছেন, রক্ষা করেছেন—এটাই তাঁর রহমত। এখন আমাদের করার সময় মাত্র তিনটি কাজ— গুনাহ ছাড়া, নামাজ কায়েম করা, আর আল্লাহর দিকে আন্তরিকভাবে ফিরে যাওয়া।

আজকের এই ভূমিকম্প আমাদের শিখিয়ে দিয়েছে— “মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই। সবকিছু আল্লাহর হাতে।” সুতরাং এখনই তওবা করি, নামাজে ফিরে যাই, আর আল্লাহর কাছে কান্না করে দোয়া করি—

আল্লাহ যেন আমাদের দেশে শান্তি, নিরাপত্তা, ইমান এবং রহমত বর্ষণ করেন—আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি