উপন্যাস ৪
অধ্যায়–৪: নিষিদ্ধ স্বপ্ন—মেয়ের বিয়ের পটভূমি
সেদিন সূর্যটা যেন একটু বেশিই লজ্জায় ঢাকা ছিল। আকাশের রঙে এক অদ্ভুত অস্বস্তি। যেন বাতাসও জানত—আজ তার জীবনের কোনো গভীর দরজা খুলতে যাচ্ছে। আগের তিনটি অধ্যায়ে যাকে আমরা দেখেছি, আল্লাহর প্রেমে ডুবে থাকা, ইবাদতে গড়া, পর্দার সৌন্দর্যে মোড়া সেই রত্নকন্যা… আজ সে এক নতুন লড়াইয়ের সামনে দাঁড়িয়ে।
ধনী পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষেরা অনেক কিছু সহজে পেয়ে যায়। কিন্তু সোনার রাজপ্রাসাদের দেয়ালের ওপারে মানুষের আত্মা কোন যন্ত্রণায় থাকে—তা কেউ বোঝে না। সম্পদ থাকে, চাকচিক্য থাকে, কিন্তু নেই আত্মার স্বাধীনতা। এ কাহিনীর নায়িকাও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশাল অট্টালিকা, দামি পোশাক, অগণিত গাড়ি—সবই আছে। কিন্তু নেই তার চাইতে সবচেয়ে প্রিয় জিনিস—আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করার স্বাধীনতা।
আর ঠিক এই সময়েই শুরু হলো পরিবারগত চাপে তার বিয়ের আয়োজন। সমাজের চোখে 'স্বপ্নের পাত্র'—এক ধনী ব্যবসায়ীর ছেলে। তাদের ব্যবসা দেশের বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। শক্তি, ক্ষমতা, প্রভাব—সবই আছে তাদের হাতে। কিন্তু তার হৃদয়ে ছিল অন্য কিছু—নম্রতা, পর্দার সৌন্দর্য, আল্লাহর ভয় এবং আখিরাতের স্বপ্ন।
একদিন দুপুরে, তার মা তাকে ডাকলেন। বললেন, “বাবা, তোমার জন্য আমরা খুব ভালো একটা প্রস্তাব পেয়েছি। ছেলেটা অত্যন্ত শিক্ষিত, বিদেশে পড়াশোনা করেছে, পরিবারেরও অনেক মান-সম্মান। আমরা চাই তুমি এবার রাজি হও।”
শুনে তার বুক কেঁপে উঠল। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। চোখ নিচু করে চুপ করে রইল। নীরবতা ছিল তার সবচেয়ে বড় প্রতিবাদ।
কিন্তু পরিবার কি বুঝল সেই নীরবতার ভাষা? না—তারা ভাবলো সে লাজুক, তাই কিছু বলছে না। পরিবারের চোখে সে যেন ছোট্ট একটা পাখি—যাকে তারা নিজেদের ইচ্ছামত আকাশে ওড়াবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি—এই পাখি আকাশ দেখে, শুধু দুনিয়ার খাঁচা নয়। এই পাখির ডানা আল্লাহর প্রেমে তৈরি—দুনিয়ার কোনো সোনালি খাঁচা তাকে বন্দি করতে পারে না।
পাত্র দেখার দিন ঘনিয়ে এলো। ঘরে সাজসজ্জা, আলো, ফুল, আর মানুষের ভিড়। কিন্তু তার কক্ষে ছিল নিস্তব্ধতা। সে বসেছিল মাটিতে, জায়নামাজের ওপর, চোখ বুঁজে তিলাওয়াত করছিল—“হাসবিয়াল্লাহু লা ইলা’হা ইল্লা হু…”
এদিকে পরিবারের জোরাজুরি বাড়তে থাকল। “এটা একটা অসাধারণ সুযোগ!" “এমন প্রস্তাব বার বার আসে না!” “আমরা তো তোমার ভালোর জন্যই বলছি!”
কিন্তু সে শুধু ভাবছিল—যে পথ আল্লাহ চায় না, সেই পথে কিভাবে পা বাড়াবো? তার মনে পড়ল কুরআনের সেই আয়াত— “وَمَن يَتَّقِ ٱللَّهَ يَجْعَل لَّهُۥ مَخْرَجًۭا” “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য বের হওয়ার পথ বানিয়ে দেন।”
এই আয়াত যেন তার হৃদয়ে আলো ঢেলে দিল। সে জানল—এই বিয়ে তার জন্য নয়।
সমাজের আসল চিত্র
এই যুগে মেয়েদের জন্য বড় পরিবারে জন্ম নেওয়া যেন মাঝে মাঝে বোঝাই হয়ে দাঁড়ায়। চকচকে দারুণ এক পাত্র দেখলেই মানুষ ভাবে সব সমস্যার সমাধান। কিন্তু কেউ দেখে না—মেয়েটির মন কী চায়? তার রূহ কী খুঁজছে? তার হৃদয়ের কাবা কোন দিকে টানছে?
ছেলেটি খুব ধনী—হ্যাঁ, এইটাই তাদের কাছে ‘যোগ্যতা’। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে কিনা—এ প্রশ্ন করার মতো মানুষ পরিবারের কারও মনে আসেনি। শরিয়াত মেনে চলবে কিনা, পর্দার মূল্য দেবে কিনা—এগুলোকে ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলেই উড়িয়ে দেয়া হলো।
কিন্তু সেই মেয়ে… তার হৃদয় তো এমন নয়। সে তো কোরআনের মেয়ে। নবীজীর সুন্নাহর মেয়ে। সেদিন রাতে সে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে চুপচাপ কাঁদছিল। তার চোখের পানি সাক্ষী ছিল, —সে দুনিয়া চায় না —সে দামী গাড়ি চায় না —বিলাসবহুল জীবন চায় না সে শুধু চায় এমন একজন জীবনসঙ্গী, যে তাকে আল্লাহর পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
কিন্তু পরিবার বুঝল না। আর ঠিক তখনই—তার জীবনে শুরু হলো এক মহাসংকট।
অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
এমন সময় তার হৃদয়ে ভয়ও কাজ করছিল। সে ভাবছিল— “আমি যদি না বলি, তারা কি বুঝবে?” “আমি যদি অস্বীকার করি, তারা কি আমাকে নিজের মতো থাকতে দেবে?” “আমি কি আমার আলোয় ভরা জীবনকে দুনিয়ার অন্ধকারে ডুবতে দেব?”
তার মনে চলছিল তীব্র লড়াই। একদিকে পরিবার—তাদের স্বপ্ন, তাদের সম্মান, তাদের পরিকল্পনা। অন্যদিকে নিজের ঈমান—নিজের আত্মার শান্তি, নিজের আল্লাহর পথে চলার দৃঢ় মনোবল।
এই দ্বন্দ্বের মাঝেই সে এক সিদ্ধান্তের দিকে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। একদিকে তাকালে সে দেখল পরিবারের সাজানো ভবিষ্যৎ—চকচকে রূপ, দামী চেহারা, বিলাসী জীবন। অন্যদিকে তাকালে দেখল নূরের আলো—কান্নায় ভেজা সিজদা, প্রশান্ত হৃদয়, আল্লাহর প্রেম।
সে বুঝল—একটা পথ বেছে নিতে হবে। এবং সে জানত—আল্লাহ যাকে বেছে নেন, তাকে দুনিয়া বেছে নেবার প্রয়োজন নেই।
পাত্রের সঙ্গে প্রথম দেখা—অভিজ্ঞতা
পরিবারের ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত পাত্রপক্ষ এল। ছেলেটি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। তার গাড়ি, তার ফোন, তার পোশাক—সবই দামী। সে যখন কথা বলছিল, মেয়েটি শুধু একটা জিনিসই খুঁজছিল— আল্লাহর ভয় কিন্তু সে সেটা খুঁজে পেল না।
ছেলেটির দামী কথা, দামী পরিকল্পনা, দামী ভবিষ্যৎ—সবই দুনিয়া কেন্দ্রিক। কোনো জিকির, কোনো তাওয়াক্কুল, কোনো নূর ছিল না তার কথায়।
মেয়েটি তখনই বুঝে গেল— এই বিয়ে হলে তার জীবন কেবলই দুনিয়ার জঞ্জালে ডুবে যাবে। সিজদার নরম মাটি বদলে যাবে বিলাসের কাঁটায়। আল্লাহর পথে চলার আলো নিভে যাবে ধনী পরিবারের বাতাসে।
আর সেদিন রাতে—সে সিদ্ধান্ত নিল। এখন আর থাকা যাবে না। এখন নিজের আত্মাকে বাঁচাতে হবে। এই বিয়ে থেকে মুক্তি পেতে হবে।
চতুর্থ অধ্যায়ের শেষ—এবং পঞ্চম অধ্যায়ের দিকে সাসপেন্স
রাত গভীর হতে থাকল। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু তার হৃদয় জেগে রইল। বাতাসের শব্দে, রাতের অন্ধকারে, খোলা জানালা দিয়ে ঢুকে আসা ঠান্ডা হাওয়ায়—সে অনুভব করল আল্লাহ তাকে ডাকছেন… কোথাও যেন একটা দরজা খুলে যাচ্ছে।
সে কাঁদতে কাঁদতে জায়নামাজ বিছালো। শুরু করল লম্বা ইস্তিখারা। সিজদায় মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলল— “ইয়া আল্লাহ… আমি দুনিয়া চাই না… তুমি আমার পথটা সহজ করে দাও…”
আর ঠিক তখনই—তার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে এলো। মনে হলো—আল্লাহ তাকে একটি সংকেত দিলেন। একটি পথ… যে পথে তাকে চলতে হবে।
কিন্তু সেই পথ কি? সে কি পরিবারের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে? সে কি বাড়ি ছেড়ে চলে যাবে? সে কি নিজের স্বাধীনতার ঝুঁকি নেবে?
—এই প্রশ্নগুলো তাকে জাগিয়ে রাখল পুরো রাত। আর সেই রাতেই জন্ম নিল **এক ইতিহাস বদলে দেওয়া সিদ্ধান্ত**… যার জন্য পুরো পঞ্চম অধ্যায় অপেক্ষা করছে অস্থির হৃদয় নিয়ে।
➤ এখন শুরু হবে—অধ্যায় ৫: হৃদয়ের কান্না—মেয়ের সিদ্ধান্তের রাত
পরবর্তী অধ্যায়ে শুরু হবে সেই রাতের তীব্র কান্না, ইস্তিখারা, দোয়া, আর তার নেওয়া সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত…
Comments
Post a Comment