উপন্যাস ৩

 

সোনার রাজপ্রাসাদে বন্দি মুক্ত আত্মা

সে যেন রত্নখচিত স্বপ্নের প্রাসাদে বড় হয়েছে—মহামূল্যবান ঝাড়বাতি, রুপালি সিঁড়ি, মহাগুরুত্বপূর্ণ অতিথিদের আনাগোনা আর কোটি টাকার হাসি। তবু তার অন্তরের ভুবন ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। পৃথিবীর সৌন্দর্য তার চোখে এতটুকু ঝিলিক ফেলত না। সে যেন জন্ম থেকেই জানত—দুনিয়া শাশ্বত নয়, দুনিয়া মায়া; চিরন্তন ঠিকানা আখিরাত।

বাড়ির গেট পার হলেই লম্বা লম্বা খেজুরগাছ, বাগানের গোলাপ, আর সুসজ্জিত পথচিহ্ন—সবই যেন বলে, “এই মেয়েটি রাজকন্যা।” কিন্তু রাজকন্যার মন তো বাঁধা নেই সোনার খাঁচায়; মনের খাঁচা মুক্ত—আল্লাহর দিকে ঝুঁকে থাকা।

তার বাবা দেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী। বাড়ি বলতে যা বোঝায়—চৌদ্দটি বিশাল কক্ষ, চারপাশে পাহারা, সিসিটিভি, গাড়ির শো–রুমে যত মডেল আছে সবই তার গ্যারেজে। একজন মেয়ে যা চাইতে পারে তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি পাওয়া—এইটাই ছিল তার স্বাভাবিক জীবন।

কিন্তু তার ইচ্ছা? তার আকাঙ্ক্ষা? তার হৃদয়ের রঙ? সেগুলো এই বিলাসের সাথে কোনোভাবেই মিলত না।

ধর্মভীরু আত্মা বনাম দুনিয়ার চাকচিক্য

মেয়েটির চোখে পৃথিবী কখনোই মোহ সৃষ্টি করেনি। বড়লোকদের কফি পার্টি, বিদেশি ট্যুর, ব্র্যান্ডেড পোশাক, এমনকি যেসব জিনিস অন্য মেয়েরা দেখতে দেখতেও মুগ্ধ হয়ে যায়—সে এগুলোতে শূন্যতা খুঁজে পেত। যখন অন্যেরা সাজঘরে ভিড় করত, সে তখন সেজদার মাটিতে লেগে থাকত। যখন বাবা-মা বলতেন, “বাবা, একটু চলো আজ গালা নাইট আছে… বড় বড় মন্ত্রী-এমপিরা থাকবে।” সে মৃদু হেসে বলত, “আমার গন্তব্য অন্য। সেখানে আলোর উৎস তুমি নও, দুনিয়া নও—আল্লাহ।”

দুনিয়ার সোনা তার অন্তরের দরজায় কখনোই টোকা দিতে পারেনি। তার চারপাশে থাকা চাকচিক্য যেন নিঃশব্দে ভেঙে পড়ত তার তাওয়ার্দার সামনে। তার কেবল একটাই কথা— “আমি ইসলাম চাই, শান্তি চাই, আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে চাই।”

বিলাসী বাড়ির দেয়ালে তার নিঃসঙ্গতা

বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে অলঙ্কার, কিন্তু তার কক্ষে একটি ট্যাপেস্ট্রি— “إِنَّ مَعَ الْعُسْرِ يُسْرًا”— কষ্টের সাথেই রয়েছে স্বস্তি।

তার ঘর অন্যসব রুমের মতো নয়। যেখানে অন্য রুম ঝলমলে আলোয় ভরা, তার রুম ভরা সাদামাটা নীল আলো, কুরআনের তাক, নরম সেজদার জায়নামাজ, আর জানালার পাশে একটি পুরনো কাঠের টেবিল। ধনী বাড়ির মেয়ে হয়েও সাদামাটা কালি-কলম, পুরনো খাতা, হাতে লেখা দোয়া—এগুলোই ছিল তার সুখ।

কখনো কখনো সে বাড়ির ছাদে উঠে যায়। হাওয়া বয়ে যায়। তার ওড়না নরম বাতাসে উড়ে উঠে, আর সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে— “হে রব, তুমি ছাড়া কেউ নেই… আমার মন তোমার কাছেই ফিরে যায়।”

মনে মনে সে জানত—এই বাড়ি, এই সম্পদ, এই রাজত্ব—সবই পরীক্ষামাত্র। যেখানে সবাই তাকে বলে, “সব তোমার জন্য।” কিন্তু তার হৃদয় বলে, “কিছুই আমার নয়, সবই আল্লাহর।”

ধন-সম্পদের জন্য তার ভয়

বেশিরভাগ মানুষ ধনসম্পদকে উপভোগ করে, কিন্তু সে ধনসম্পদকে ভয় পায়। এসব জিনিস তার কাছে ফাঁদ। সে জানে— ধন সম্পদ যত বাড়ে, হিসাবও তত ভারি হয়। সে বারবার সূরা তাকাসুর পড়ে— “অতিরিক্ত সম্পদের প্রতিযোগিতা মানুষকে ধ্বংস করে দেয়…”

সে ভাবত— “যদি এসব সম্পদ আমায় গর্বীলা বানায়? যদি আমার রুহানি পথ রুদ্ধ হয়ে যায়?”

তার ভয় ছিল অদ্ভুত কিন্তু সত্য। সে জানত—বিলাসিতা ইমানের সবচেয়ে বড় চোর। কিন্তু তার বাবা-মা এসব বুঝতেন না। তারা মনে করতেন—মেয়ের এই ধমধমে সতর্কতা শুধু বাড়াবাড়ি।

মেয়েটির হাতছানি—ইলমের জগৎ

ধনী পরিবারে জন্ম নিলেও তার মন পড়ে ছিল কিতাবের পাতায়। সে ছিল একজন অনন্য মেধাবী— ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, অংক, ইংরেজি—সবতেই তার দক্ষতা যেন স্বভাবজাত।

কিন্তু তার জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইসলাম। তাজবিদ, হাদীস, তাফসির, আকাইদ—সে রাত জেগে পড়ে। যখন বাড়ির লোকেরা ঘুমায়, সে তখন সেজদায় কাঁদে— “হে আল্লাহ, আমাকে তোমার পথে দৃঢ় রাখো… আমি যেন কখনো দুনিয়ার চাকচিক্যে না হারাই।”

এটাই ছিল তার শক্তি। এটাই ছিল তার পরিচয়। এটাই তাকে আলাদা করত পৃথিবীর হাজারো মেয়ের থেকে।

তার বাবার সিদ্ধান্ত—এক আভিজাত্যের ঝড়

তার বাবা-মা বহুদিন ধরে একটি চিন্তা করছিলেন— কীভাবে এই রত্নকন্যাকে আরেক ধনী পরিবারের রাজপুত্রের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া যায়। দুই পরিবারের কোটি কোটি টাকার ব্যবসা এক হবে— এটাই ছিল তাদের স্বপ্ন।

তারা একদিন রাতে তাকে বসিয়ে বললেন— “বাবা, আমরা তোমাকে একটি সুখবর দিতে চাই। তোমার বিয়ে ঠিক করেছি দেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়ীর ছেলের সাথে।”

মেয়েটি যেন মুহূর্তেই অভিভূত হয়ে গেল। চোখে জল এসে জমে উঠল। কিন্তু সেটা আনন্দের নয়—ভয়ের, ব্যথার, এবং গভীর অস্বস্তির।

সে মৃদু স্বরে বলল— “আমি দুনিয়ার রাজপুত্র চাই না… আমি এমন কাউকে চাই, যে আল্লাহকে ভালোবাসে।”

বাবা রেগে বললেন— “তোমার এসব ধার্মিকতা ভবিষ্যতে বুঝবে… এখন আমাদের কথাই শুনতে হবে।”

সে জানত—ঝড় আসছে

সেদিন রাতে সে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারল না। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো তার মুখে পড়ে ছিল। তার চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু ঝলমল করে উঠছিল আলোতে।

সে কোরআন খুলল। তার চোখ পড়ল একটি আয়াতে— “যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য এমন পথ বের করে দেন যা তার ধারণার বাইরে।”

তার বুক কেঁপে উঠল। এটা কি ইশারা?

এই রাজপ্রাসাদে, এই সোনার খাঁচায়, এখানে কি সে বন্দি? হয়তো মুক্তি তাকে ডাকছে… আর সেই মুক্তির দরজায় হয়তো অপেক্ষা করছে তার জীবনের সবচেয়ে বড় মোড়।


★ ক্লাইম্যাক্স – চার নাম্বার অধ্যায়ের দিকে টান ★

সেই রাতে হঠাৎ— একটি ফোন কল আসে। মেয়েটি ফোন ধরে, আর ওপাশ থেকে শোনা যায় কাঁপা কণ্ঠে কেউ বলছে— “তোমাকে খুব জরুরি কিছু বলতে চাই… এখনই… এখনই বের হও।”

মেয়েটি সংবিত ফিরে পায়। হৃদপিণ্ড তীব্রভাবে ধড়ফড় করে। কে? কেন? কিসের জন্য? কোথায়?

সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোয়— ফোন এখনো কানে… আর তার পরের প্রহরে— যা ঘটবে, তা তার পুরো জীবনের গতিপথ পাল্টে দেবে…

👉 তারপর? যা ঘটতে যাচ্ছে… তাই নিয়ে শুরু হবে—
অধ্যায় ৪: আরান্ত রাতের পথ—বাড়ি ছাড়ার সিদ্ধান্ত

---

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি