উপন্যাস দুই

 

হৃদয়ে আল্লাহর নূর—তার বুযুর্গি ও পর্দার সৌন্দর্য

সূর্যের আলোয় জন্ম নেওয়া সেই রত্নকন্যা আরিয়ানা এখন ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে। তার শৈশবের নিষ্পাপতা, অন্তরের শান্তি ও স্বভাবের কোমলতা যেন তার প্রতিটি অঙ্গভঙ্গিতে ফুটে উঠছে। কিন্তু তার ভেতরে সবচেয়ে গভীরভাবে যা শেকড় গেঁথে বসেছিল—তা হলো আল্লাহর প্রতি অতলভক্তি। এই ভালোবাসা তার জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করত, তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলত।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার আল্লাহমুখিতা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠল। মনের গভীরে যেন এক আলোকিত প্রদীপ ছিল, যা তাকে বারবার মনে করিয়ে দিত— “এই দুনিয়া ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টি চিরন্তন।”

আরিয়ানা যখন মাত্র দশ বছরের, তখনই তার মধ্যে ইবাদতের এমন শক্ত প্রেম দেখা গেল যা বড়দের মধ্যেও বিরল। ফজরের আজান উঠার আগেই সে জেগে বসে থাকত, যেন ফেরেশতারা তাকে স্পর্শ করে জাগিয়ে দেয়। তার মা অবাক হয়ে বলতেন— “এই মেয়ে তো যেন ইবাদতের জন্যই জন্মেছে।”

নামাজ তার কাছে ছিল শুধুই ফরজ নয়—এ ছিল আল্লাহর সাথে তার হৃদয়ের গোপন কথোপকথন। প্রতিটি সিজদা তাকে মাটির কাছাকাছি নয়, বরং আসমানের আরও কাছে নিয়ে যেত। সিজদা শেষে সে চোখ বন্ধ করে বলত— “আল্লাহ, আমি তোমার, তুমি আমাকে ধরে রেখো।”

তার কুরআন শেখার মধ্যে ছিল অন্যরকম তৃষ্ণা। একদিন তার ইসলামিক শিক্ষিকা অভিভূত হয়ে বলেছিলেন— “এই মেয়ে শুধু কুরআন পড়ে না, কুরআনকে বাঁচে, কুরআনকে অনুভব করে।”

বয়ঃসন্ধির পরে সে আরও বেশি পর্দাশীল হয়ে উঠল। মানুষ দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য—দুনিয়ার রঙিন অফার যেখানে তরুণীদেরকে টানছে, সেখানে এই মেয়ে পর্দাকে বেছে নিল রাণীর মতো গর্ব নিয়ে।

তার বন্ধু একদিন জিজ্ঞেস করেছিল— “তুমি এত কঠোরভাবে পর্দা করো কেন? তোমার সৌন্দর্য তো মানুষ দেখলে মুগ্ধ হবে!”

আরিয়ানা মৃদু হাসল। তার হাসিতে ছিল শান্তি, এবং তার উত্তরে ছিল অদ্ভুত শক্তি— “আমি আমার সৌন্দর্য মানুষের সামনে দেখানোর জন্য নয়। আমি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এই দেহ ও নজরকে রক্ষা করি। মোর লক্ষ্যে দুনিয়া নয়… আখিরাত।”

তার পর্দা ছিল কেবল কাপড় নয়—এ ছিল চরিত্র, নীতির মানদণ্ড, একটি পতাকা যার নিচে সে গর্বের সাথে হাঁটত।

পর্দা তাকে সীমাবদ্ধতা দেয়নি, বরং সে বলত— “পর্দা আমাকে মুক্ত করেছে দুনিয়ার পরীক্ষাগুলো থেকে।”

সে জানত—দুনিয়ার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো নিজের নফস। তাই সে নিজের সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করত। বন্ধুরা তাকে মডার্ন জীবনের বিভিন্ন প্রলোভনে ডাকত— সিনেমা, পার্টি, টিকটক, রঙিন সাজগোজ, মেকআপ, অর্থের অহংকার।

কিন্তু আরিয়ানা সবকিছু থেকে দূরে থাকত। সে বলত— “যা আমার হৃদয়কে আল্লাহ থেকে দূরে নিয়ে যায়, আমি তাকে দূরেই রাখি।”

তার নফসের বিরুদ্ধে জিহাদ ছিল নিঃশব্দ। রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ত, সে তখন কেবল একটি জায়গায় পরাজয় মানতে চাইত না— নিজের গুনাহের বিরুদ্ধে।

তার দোয়া ছিল— “হে আল্লাহ, আমাকে আমার নফসের দাস বানিয়ো না। আমি শুধু তোমার দাসী হয়ে থাকতে চাই।”

তার পরিবার ছিল অগাধ সম্পদের মালিক। লক্ষ-কোটি টাকার মালিকানা, বিলাসী জীবন— সবকিছুর প্রবেশাধিকার তার সামনে খোলা ছিল। কিন্তু সে কখনো এসবের প্রতি আকৃষ্ট হলো না।

তার বাবা মাঝে মাঝে অবাক হয়ে বলতেন— “তুই চাইলে যেটা বলবি, সেটা তোকে এনে দেব… কিন্তু তোকে কখনো কিছু চাইতে দেখি না!”

আরিয়ানা উত্তর দিত— “দুনিয়ার যা আছে সবই সাময়িক। আমার মন ভরে কেবল আল্লাহকে পেয়ে।”

বন্ধুরা যখন হিংসে করত, সে তখন মিষ্টি হেসে বলত— “আমার সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়… তাওহীদ।”

তার বয়সে সাধারণ মেয়েরা যখন মেসেঞ্জার, ইনস্টাগ্রাম, চ্যাটিং, ভুল সম্পর্ক, ফ্যাশনের ঝড়ে ভাসে— আরিয়ানা তখন এক অন্য জগতের মানুষ। কেউ তাকে ডিএম করলে সে বলত— “আমি আল্লাহকে বেশি ভালোবাসি, তাই হারাম আলাপ আমার কাছে মরা ফুলের মতো।”

তার এই চরিত্র দেখে সবাই একটাই কথা বলত— “এই মেয়ের হৃদয়ে মানুষ নয়… আল্লাহ রাজা।”

সে কখনো নামাজ বাদ দিত না। পরীক্ষা, অসুস্থতা, ব্যস্ততা—কিছুই তাকে বাঁধা দিতে পারত না। তার সিজদা ছিল দীর্ঘ, এবং প্রতিটি সিজদা যেন তার অন্তর শুদ্ধ করে দিত।

তার আমলের মধ্যে ছিল—

  • তাহাজ্জুদ
  • ইশরাক
  • দু'হা
  • রোজা
  • সদকা
  • যিকির
  • দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতি

বন্ধুরা কখনো জিজ্ঞেস করলে— “তুমি এত কিছু করো কীভাবে?”

তার উত্তর ছিল— “নফস যত টানবে, আমি ঠিক বিপরীত দিকে হাঁটব।”

যে মেয়ে আল্লাহর নূর বুকে ধারণ করে চলে, দুনিয়া তাকে চাইলেও এড়িয়ে যেতে পারে না। তার পর্দার আড়ালের সৌন্দর্য, তার আকর্ষণীয় চরিত্র, তার ঈমানের দৃঢ়তা— সব মিলিয়ে সে হয়ে উঠল অদৃষ্টপূর্ব এক মেয়ে।

মানুষ বলতে লাগল— “সে শুধু সুন্দর নয়… সে নূরের তৈরি।”

তার জ্ঞান, ইবাদত, পর্দা—সব মিলিয়ে সে সমাজের চোখে এক রোল মডেল হয়ে উঠল। এবং এই অবস্থাতেই শুরু হলো তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের প্রস্তুতি…

ধীরে ধীরে তার চারপাশে এমন মানুষের আগমন শুরু হলো— যারা তার সৌন্দর্য নয়, তার রূহের আলো দেখে মুগ্ধ হচ্ছিল। এদের মাঝেই থাকবে একজন— একজন বিশেষ মানুষ, যে একদিন তার জীবনে নীরবে প্রবেশ করবে।

এই অধ্যায় শেষ হতে হতে আরিয়ানার মনে প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল— যা ভালোবাসা নয়, কিন্তু ভালোবাসার পথে প্রথম আলো।

এবং এখান থেকেই শুরু হবে— তার হৃদয়ের নূর এবং কারো নীরব উপস্থিতি মিলেমিশে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।


Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি