উপন্যাস ১
এই শিশুটির জন্ম কোনো সাধারণ জন্ম ছিল না। তার আগমনে পুরো পরিবারে যে আনন্দের জোয়ার উঠল, তা যেন আল্লাহর বিশেষ রহমতে ভরা। তার পরিবারের পদচারণা অর্থ-সম্পদে সমৃদ্ধ হলেও, তারা জানত এই কন্যা ভবিষ্যতে তাদের শুধু দুনিয়ার নয়, আখিরাতেরও উজ্জ্বল আশা হয়ে উঠবে।
শিশুটির প্রথম কান্না শুনেই তার বাবা হতবাক হয়ে বলেছিলেন, “এই কান্না সাধারণ নয়। আল্লাহর কোনো রহমত লুকিয়ে আছে এ শিশুর মাঝে।”
নাম রাখা হলো—আরিয়ানা নূর। “নূর”—যা আলো, এবং “আরিয়ানা”—যার অর্থ মহৎ, সম্মানিত, নেতৃত্বগুণে ভরপুর।
তার মা যখন প্রথমবার তাকে বুকে নিলেন, মেয়ের চোখের গভীরে তাকিয়ে দেখলেন এমন নীরবতা—যেন শিশুটি জানে সে কী উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে। পৃথিবীর বুকে তার মিশন কেবল দুনিয়াকে সাজানো নয়, বরং ঈমানের আলো ছড়ানো।
আরিয়ানা যখন খুব ছোট, তখন থেকেই অসাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যেত। তার চারপাশে যেন এক অদৃশ্য শান্তি বিরাজ করত। অন্য শিশু যেখানে খেলাধুলায় ব্যস্ত, সে সেখানে ঘন্টার পর ঘন্টা চুপচাপ বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। মা তাকে জিজ্ঞেস করলে সে ছোট্ট হাসি দিয়ে বলত, “আমি ভাবছি, আকাশের ওপারে কী আছে।”
পরিবারের সবাই বুঝতে পারল—এই মেয়ে শুধু জ্ঞানী নয়, তার অন্তরে আল্লাহর নূর প্রবেশ করছে অল্প বয়স থেকেই। সে যখন কয়েক মাসের, তখন আজান শুনলেই হাত-পা নাড়িয়ে হাসত। মসজিদের দোয়া বা কুরআনের তিলাওয়াত শুনলে তার মুখে ফুটে উঠত অপরূপ প্রশান্তি।
তার দাদী একদিন বলেছিলেন, “এই মেয়ে আল্লাহর নেক বান্দাদের ছায়া নিয়ে জন্মেছে।”
আরিয়ানার পরিবার ছিল অগাধ ধনসম্পদের মালিক। বাড়ির দিকে তাকালে মনে হতো যেন একটি প্রাসাদ—উঁচু দেয়াল, অগণিত কক্ষ, সুইমিং পুল, ঝলমলে গাড়ি, বিদেশি সামগ্রী, আর যা চাই তাই পাওয়ার সুবিধা।
কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো—এই সব কিছুর দিকে ছোট্ট আরিয়ানার কোনো আকর্ষণই ছিল না। অন্য বাচ্চাদের মতো খেলনা, ভিডিও গেম, দামি পোশাক—কিছুতেই তার মন ভরত না।
সে বরং বই ভালোবাসত। বিশেষ করে বিজ্ঞান ও ইসলামের বই—দুটোই তাকে সমানভাবে টানত। বাবা-মা বিস্ময়ভরা চোখে দেখতেন—৩ বছর বয়সেই সে তার বয়সের তুলনায় অনেক বেশি শব্দ বুঝতে পারে।
একবার তার বাবা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?”
মেয়েটির উত্তর সবার মনে গভীর ছাপ ফেলেছিল— “আমি এমন মানুষ হব, যাকে দেখে মানুষ আল্লাহকে মনে করবে।”
বয়স যত বাড়তে লাগল, ততই তার স্বভাবের মধ্যে প্রকাশ পেল বিশুদ্ধতা। ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েদের মতো সে কখনো প্রতিযোগিতার ঝাঁপিয়ে পড়ত না। বরং অন্যকে সাহায্য করা, সহানুভূতি দেখানো, দরিদ্রদের হাতে নিজের খাবার তুলে দেওয়া—এসবই তার দৈনন্দিনের অংশ ছিল।
শিক্ষকরা তাকে বলতেন, “তুমি শুধু মেধাবী নও, তুমি শ্রদ্ধার যোগ্য। তোমার মতো চরিত্রের ছাত্র খুব কম।”
বিজ্ঞানশিক্ষক হতবাক হয়ে গেলেন যখন মাত্র ৬ বছর বয়সে সে নিউটনের তৃতীয় সূত্র ব্যাখ্যা করেছিল। আর ৭ বছর বয়সে কুরআনের বেশ কিছু সূরা শুদ্ধভাবে তিলাওয়াত করতে শিখে ফেলেছিল।
কিন্তু এই সব জ্ঞান অর্জনের মাঝেও সে কখনো গর্বিত হয়নি। বরং বারবার বলত, “আল্লাহ আমার অন্তরে আলো না দিলে আমি কিছুই পারতাম না।”
তার ভেতরে ছিল এক অদ্ভুত বিনয়—যা তাকে সাধারণ পৃথিবীর মেয়ে থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
একদিন স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে সে দেখল এক দরিদ্র বৃদ্ধ অসুস্থ অবস্থায় রাস্তার পাশে বসে আছে। মানুষ পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে, কেউই ফিরেও তাকাচ্ছে না।
আরিয়ানা দৌড়ে গিয়ে তাকে পানি পান করাল, খাবার কিনে দিল, এবং যতক্ষণ না বৃদ্ধ একটু সুস্থ হচ্ছিল, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকল।
বাড়িতে ফেরার পর তার মা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “এভাবে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলে কেন?”
মেয়েটির চোখে পানি এসে গেল— “মা, আমরা এত সম্পদ নিয়ে কী করব যদি অসহায় মানুষকে সাহায্যই না করি?”
সেদিনই তার মা বুঝলেন—এই মেয়ের জীবন সাধারণ মানুষের জন্য নয়। সে আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনার অংশ।
তার শৈশবের প্রতিটি দিন যেন আল্লাহর নূরের ছায়ায় গড়ে উঠছিল। জ্ঞান, বিনয়, সাহস, দয়া—সবকিছুর সমন্বয় ছিল তার জীবনে। তবে তার সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস ছিল—তার তাকওয়া এবং ইসলামি বুযুর্গি।
যখন সে বড় হতে লাগল, তার পর্দা, ইবাদত, কুরআনপ্রেম, এবং দুনিয়াকে লাথি মারার মানসিকতা আরও গভীর হলো। লোকেরা তাকে বলত— “এই মেয়ে শুধু দুনিয়ার নয়, আখিরাতের রত্ন।”
এভাবেই ধীরে ধীরে শুরু হলো তার পরবর্তী অধ্যায়— তার হৃদয়ের ভেতর আল্লাহর নূরের জাগরণ, পর্দার প্রতি ভালোবাসা, নেক পথে চলার অদম্য শক্তি।
Comments
Post a Comment