বিয়ের অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ও গুনাহময় কাজ—সচেতনতা, পরিহার ও বিকল্প পথ
বিয়ের অনুষ্ঠানে অপ্রয়োজনীয় ও গুনাহময় কাজ—সচেতনতা, পরিহার ও বিকল্প পথ
আধুনিক সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠানকে অনেকেই আনন্দ, সাজসজ্জা ও আড়ম্বরের সুযোগ হিসেবে দেখে থাকে। অথচ ইসলাম বিয়েকে একটি ইবাদত, একটি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। দুঃখের বিষয়, অনেক সময় আমাদের বোনেরা ও ভাইয়েরাও এই পবিত্র অনুষ্ঠানটিকে গুনাহ, ফিতনা, অশ্লীলতা, অহেতুক রীতি এবং ইসলামবিরোধী কাজে ভরিয়ে দেয়। বিশেষ করে গায়ে হলুদ, গান-বাজনা, নাচ, সেলফিসহ নানান অপ্রয়োজনীয় কাজ দেখা যায়, যা আল্লাহর অসন্তুষ্টি ডেকে আনে।
এক. গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের ভুল প্রথা
গায়ে হলুদ বিয়ের একটি রীতি—কিন্তু তা কখনোই গান-বাজনা, নাচ, অশ্লীলতা, ছেলেমেয়ের মিক্সড অনুষ্ঠান, অযথা জটলা, হইহুল্লোড়ের জন্য নয়। আজ দেখা যায়—
- মেয়েরা গান বাজিয়ে নাচ করছে, ভিডিও করছে।
- ছেলেরা এসে পাত্রীর সঙ্গে ছবি তুলছে, সেলফি তুলছে।
- পাত্র–পাত্রীর বন্ধুরা মিক্সড হয়ে অনুষ্ঠান করছে।
- লাইভ ভিডিও, ভিডিওগ্রাফি, গান বাজনা—এসব ফাহাশার পরিবেশ সৃষ্টি করছে।
এসবের প্রতিটি কাজই আল্লাহর নাফরমানি। কুরআনে আল্লাহ বলেন—
﴿ وَلَا تَقْـرَبُوا الزِّنَى ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً ﴾
“অশ্লীলতার কাছেও যেয়ো না।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
দুই. সেলফি, ভিডিও ও সোশ্যাল মিডিয়া প্রকাশ
এখন বিয়েতে সেলফি তোলা এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় তা প্রকাশ করা যেন বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে। বিশেষত মেয়েরা পাত্রীর সঙ্গে, বর পক্ষের ছেলেরা পাত্রীর সঙ্গে ছবি তুলছে—যা অত্যন্ত গুনাহের কাজ। কারণ:
- নন-মাহরাম পুরুষ-মহিলার একসঙ্গে ছবি তোলা—হারাম।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় মহিলাদের ছবি প্রকাশ করা—ফিতনার দরজা খুলে দেয়।
- ভিডিও করে লাইভ দেওয়া—লজ্জাশীলতা নষ্ট করে দেয়।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“লজ্জাশীলতা ঈমানের একটি শাখা।” (বুখারি)
তিন. নাচ-গান, বাদ্যযন্ত্র ও উচ্চস্বরে হইচই
ইসলামে গান-বাজনা, নাচ, বাদ্যযন্ত্র কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কিন্তু বিয়ের অনুষ্ঠানে এগুলোকে বড় আনন্দের অংশ করা হয়েছে। মেয়েরা নাচে, ছেলেরা তালি দেয়, অনেকে ডিজে সিস্টেম পর্যন্ত ব্যবহার করে!
রাসুল ﷺ বলেছেন—
“আমার উম্মতের মধ্যে এমন দল আসবে যারা ব্যভিচার, রেশম, মদ এবং বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে।” (বুখারি)
এখন অনেকেই ঠিক এ কাজগুলিই করছে—গান বাজিয়ে বিয়ে উদযাপন করছে, যা কেয়ামতের আলামত।
চার. ছেলেমেয়ের মিক্সড পরিবেশ
আজকাল বিয়ে মানেই মিক্সড পরিবেশ—পাত্রীর বান্ধবী, বরের বন্ধু সবাই একসঙ্গে মিশে ছবি তুলছে, বসছে, গল্প করছে। এটি সরাসরি হারাম। কুরআন স্পষ্টভাবে বলে—
﴿ قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ ﴾
“মুমিন পুরুষদের বল, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে।” (সূরা নূর: ৩০)
অনর্থক হাসাহাসি, দৃষ্টিচর্চা, মেলামেশা—এগুলো প্রতিটি গুনাহ। বিবাহের অনুষ্ঠানে গুনাহ কখনো বৈধ হয় না।
পাঁচ. অযথা খরচ, বিলাসিতা ও প্রতিযোগিতা
বিবাহের অনুষ্ঠানে মানুষ প্রতিযোগিতা শুরু করে—কে বেশি সাজাবে, কার অনুষ্ঠান বেশি জমকালো হবে! অথচ ইসলাম মিতব্যয়িতা শিক্ষা দেয়। কুরআনে আছে—
﴿ إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ﴾
“অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা ইসরা: ২৭)
বিয়েতেও অপব্যয় শয়তানের কাজ।
বিয়েতে অপ্রয়োজনীয় কাজগুলো থেকে বাঁচার উপায়
১. বিয়েকে ইবাদত হিসেবে মানা
বিয়েকে বিনোদন নয়, বরং ইবাদত হিসেবে দেখলেই গুনাহ এড়াতে সহজ হবে।
২. আলাদা পরিবেশ তৈরি করা
- ছেলে-মেয়েদের সম্পূর্ণ পৃথক বসার ব্যবস্থা।
- মাহরাম ছাড়া কারো সঙ্গে ছবি তোলা নয়।
- মেয়েদের জন্য পর্দা ও গোপনীয় পরিবেশ।
৩. গান-বাজনা সম্পূর্ণ পরিহার
গান-বাজনার পরিবর্তে—
- কুরআন তিলাওয়াত
- নাত/হামদ (কণ্ঠস্বর, বাদ্যযন্ত্র ছাড়া)
- উপদেশমূলক আলোচনা
৪. ফটোগ্রাফি সীমিত ও শালীন রাখা
- মহিলাদের ছবি প্রকাশ নয়।
- নন-মাহরামদের একসঙ্গে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় পারিবারিক ছবি রাখা।
৫. অপব্যয় কমানো
- সাধারণভাবে বিয়ে সম্পন্ন করা।
- অতিরিক্ত সাজসজ্জা বন্ধ করা।
- মেহমানদের সম্মান রাখাই সর্বোত্তম।
৬. ইসলামী রীতিনীতির প্রচলন
- মুনাজাত
- পাত্র-পাত্রীর জন্য দোয়া
- সুন্নত অনুযায়ী অনুষ্ঠান পরিচালনা
বিকল্প সুন্নতিপূর্ণ পথ
- গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান অতিরিক্ত সজ্জা নয়, বরং পরিবারের মধ্যে সীমিত ও শান্তভাবে।
- এসব অনুষ্ঠানে কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া রাখা।
- ফ্যামিলাদের নিজস্ব পরিবেশে আনন্দ—যেখানে পর্দা বজায় থাকবে।
- ছেলেদের জন্য আলাদা আশরাফি পরিবেশে আলোচনা ও দোয়া।
- ফটো তোলার পরিবর্তে পাত্র-পাত্রীর জন্য দোয়া করা—এটাই সর্বোত্তম স্মৃতি।
পরিশেষে,,,,
বিয়ের অনুষ্ঠান আল্লাহর দেওয়া একটি বরকতময় ইবাদত। অথচ আমরা নিজেরাই এটাকে গুনাহে ভরিয়ে ফেলেছি। গান, নাচ, সেলফি, মিক্সড মেহফিল—সব কিছু মিলিয়ে একেকটা বিয়ে যেন ফিতনার বাজার।
এখনই সময়—পবিত্রতা ফিরিয়ে আনার। বিয়েকে ইবাদত বানাও, আল্লাহকে খুশি করো, গুনাহ থেকে দূরে থাকো।
আল্লাহ আমাদের সকলকে গুনাহ থেকে বাঁচার তাওফিক দান করুন—আমীন।
Comments
Post a Comment