প্রকৃত তালেবে ইলমের বৈশিষ্ট্য

 

একজন উস্তাদ ও তার ছাত্রের সম্পর্ক

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 
 

আজ আমি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে চাই। গত কয়েকদিন আগে আমাদের এক উস্তাদে মুহতারাম এমন কিছু অমূল্য বাণী শোনালেন, যা আমি আজীবন কাগজের বুকেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন অন্তরে আলো হয়ে ছড়িয়ে পড়েছিল, যেন সেসব বাণী ইলমপিপাসু হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে নতুন করে পথচলার দিশা দেয়।

তিনি বলেছিলেন, “প্রত্যেকটা তালেবে ইলমের অন্তর হতে হবে খুবই নমনীয়, কোমল আর বিনয়ী।” এমন এক ব্যক্তিত্ব, যার প্রতিটি কাজ থেকে ঝরে পড়বে নম্রতা ও মমতার সুবাস। যার আচরণে প্রতিফলিত হবে সম্মান ও সৌজন্য। কোনো মানুষের সঙ্গে কখনো বেয়াদবি বা অভদ্রতা যেন না থাকে—এই নীতি যেন তার নিত্যসঙ্গী হয়। কারণ এটাই হলো একজন প্রকৃত তালেবে ইলমের আসল অবস্থা, এটাই তার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য।

উস্তাদের সামনে সে থাকবে একেবারেই নতজানু হয়ে। তার চাহনি ও হৃদয়াভিমান হবে বিনয়ময়। তার অন্তরে থাকবে এই দৃঢ় অনুভূতি—“আমি কিছুই জানি না”। যতই সে জানুক না কেন, কখনো ওস্তাদকে বোঝাবে না যে সে অনেক কিছু পারে, বরং নিজের অজ্ঞতাকে প্রাধান্য দিয়ে শিখতে থাকবে। এই মনোভাবই তাকে করবে আল্লাহর নিকট প্রিয়, এই নতজানু মানসিকতাই তাকে পৌঁছে দেবে ইলমের উচ্চস্তরে।

তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিখিয়েছেন—সবসময় আল্লাহর দিকে মুতাওয়াজ্জুহ থাকা। হৃদয়ের দৃষ্টি যেন সবসময় তাঁর দয়ার সাগরে নিবদ্ধ থাকে। ইলমের সমুদ্রে ডুব দেওয়ার পাশাপাশি কিতাবের পাতার সঙ্গে যেন একাত্ম হয়ে যাওয়া হয়। তিনি বললেন, “তুমি যেন কিতাবের পাতায় রূপান্তরিত হয়ে যাও।” এই কথা যেন কানে বেজে ওঠে—আমার শরীরটাই কিতাবের পাতা হয়ে যাবে, আমি হয়ে যাবো এক চলমান কিতাব।

এভাবেই চলতে থাকবে মুতালাআ, এক কিতাবের পর আরেক কিতাব শেষ হবে, আরেক কিতাব শুরু হবে। হয়তো সময়ের স্রোতে কিছু বিষয় ভুলে যাবে, কিন্তু যখন প্রয়োজন হবে তখন সেই শেখা বিষয়গুলো কাজে লাগবে। তাই নিরাশ হওয়া যাবে না। আল্লাহর ইলমের পথে যাত্রা একটি অবিরাম স্রোতধারা, যা থেমে যায় না। তিনি যেন প্রতিটি তালেবে ইলমকে এই অমর নসিহত শিখিয়ে দিলেন—“তুমি মুতালাআ চালিয়ে যাবে, কখনো থামবে না, কারণ জ্ঞানই তোমাকে আলোকিত করবে।”

এই বাণীগুলো শুধু কোনো পরামর্শ নয়; বরং তালেবে ইলমের জীবনের জন্য এক চিরন্তন দিশারি। এ যেন ইলমের পথে চলার মানচিত্র, যা আমাদের হৃদয়কে করে বিনয়ী, মস্তিষ্ককে করে তীক্ষ্ণ এবং আমলকে করে উজ্জ্বল।

হুজুর যখন এই কথাগুলো বলেছিলেন, তখন আমার অন্তরে যেন অদ্ভুত এক আলো নেমে এল। মনে হলো, এই জীবনকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে, নতুনভাবে মেহনত করতে হবে, ইলমের পথে নতুন করে যাত্রা শুরু করতে হবে। হৃদয়ের গভীরে অদ্ভুত এক স্পন্দন শুরু হলো—এবার আর শুধু পড়া নয়, জীবনকে বদলে দেওয়ার মতো পড়া। জ্ঞানের পাতায় নিজের জীবনকে লিখে যাওয়ার মতো পড়া। যেন প্রতিটি মুহূর্ত কেবল জ্ঞান আর আল্লাহর সন্তুষ্টির খোরাকে পরিণত হয়।

আমি নতুনভাবে মুতালাআ করার সংকল্প নিলাম। কিতাবের প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার ইচ্ছা হলো। মনে হলো—এই ইলমের মাঠে হয়তো আমি এখনো কিছুই নই, কিন্তু আমি চেষ্টা করবো, যতক্ষণ দম আছে। জীবনকে নতুনভাবে সাজানোর ইচ্ছা যেন হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছিল। একদম ভেতর থেকে কানে কানে ডাকছিল—“এবার সত্যিকারের তালেবে ইলম হয়ে ওঠো।”

হুজুর বলেছেন—জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে কাগজের পাতায় সংরক্ষণ করে রাখতে। যেন জীবন নদীর প্রতিটি ঢেউ হয়ে ওঠে একটি পঙ্‌ক্তি, একটি গল্প, একটি শিক্ষা। যাতে একদিন, সময়ের স্রোতে যখন তুমি পিছনে ফিরে তাকাবে, তখন এই লেখা গুলোই হবে তোমার আয়না, তোমার পথপ্রদর্শক, তোমার সাহসের চিহ্ন। যেন প্রতিটি অক্ষর সাক্ষী হয়ে থাকে তোমার মেহনতের, তোমার সংগ্রামের।

আলহামদুলিল্লাহ, নাহবেমির জামাত থেকেই আমি চেষ্টা করছি এই অমূল্য অভ্যাসটিকে জীবন্ত রাখতে। আমার জীবনের কত মূল্যবান মুহূর্ত, কত গোপন অনুভূতি, কতটা কান্না, কতটা হাসি, কতটা আশা-নিরাশা আমি কাগজের বুকেই লিপিবদ্ধ করে রেখেছি। কাগজের পাতাগুলো যেন আমার মনের আয়না, আমার সঙ্গী, আমার নিঃশব্দ বন্ধু। যেখানে আমি লিখেছি—আমার পারা আর না-পারা, উস্তাদের দরস ও তাকরীর, আমার কিতাবের সাথে সখ্যতা আর সংগ্রাম।

মনে পড়ে—কত রাত জেগে আমি লিখেছি আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দিনলিপি। কিতাবের পাশে বসে আমি লিখেছি আমার অনুভূতির ভাষা। আমার কাগজগুলো একদিন হয়ে উঠেছিল আমার ইলমি জীবনচরিতের প্রথম খসড়া। যেন প্রতিটি বাক্য আমার ভিতরের লড়াই আর সাধনার ইতিকথা। যেন কাগজের পাতায় আমি হয়ে উঠেছিলাম একজন নীরব গল্পকার, যে নিজের জীবনকেই কিতাব বানাচ্ছে।

কিন্তু এখন সময় কিছুটা ব্যাপক হয়ে গেছে। কাজের চাপ, ইলমের ব্যস্ততা, জীবনের নানা দায়িত্ব আমাকে কাগজ থেকে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। সব কিছু কাগজে লেখা সম্ভব হয় না আর। কিন্তু মন তো আর থামে না। তাই এখন মোবাইলই হয়ে গেছে আমার নতুন কাগজ। এই ডিজিটাল পাতায় আমি আমার অনুভূতির বীজ বুনে রাখি। আমার জীবনের চলার পথের নোটগুলো আমি এখন মোবাইলেই লিপিবদ্ধ করে রাখি।

এগুলো শুধুই আমার ব্যক্তিগত নোট নয়; বরং এগুলো একদিন ইলমপিপাসু পাঠকের জন্য একটি খোরাক, একটি প্রেরণা হয়ে উঠবে—এই আশাই বুকের মধ্যে পোষণ করি। তাই সময় পেলেই এগুলো আমি সংরক্ষণ হিসেবে রেখে দিই আগ্রহী পাঠকগণের উদ্দেশ্যে। যাতে তারা পড়ুক, দেখুক, অনুপ্রাণিত হোক, আর ভাবুক—একজন তালেবে ইলমের জীবন কতটা সংগ্রামের, কতটা ত্যাগের, কতটা স্বপ্নের।

জীবনের প্রতিটি ধাপই যেন আমার কাছে একেকটি কিতাব। প্রতিটি অভিজ্ঞতাই যেন একেকটি পাঠ। প্রতিটি ব্যর্থতাই যেন একেকটি শিক্ষা। আর আমি চেষ্টা করছি এই শিক্ষাগুলোকে কাগজের পাতায়, কিংবা ডিজিটাল পাতায় সংরক্ষণ করতে। যেন কোনো দিন, কোনো মুহূর্তে আমি হারিয়ে না ফেলি এই জীবনযুদ্ধের চিত্রগুলো।

হুজুরের সেই বাণী আজও কানে বাজছে—“তুমি জীবনের মূল্যবান অংশগুলো লিপিবদ্ধ করে রাখো। একদিন দেখবে, এই লিখনই তোমার জন্য আলো হয়ে যাবে।” আলহামদুলিল্লাহ, এই আলো যেন আমার পথচলার প্রতিটি ধাপে সাথে থাকে। আমার প্রতিটি মুতালাআর পাতায়, আমার প্রতিটি বাক্যের পেছনে, আমার প্রতিটি স্বপ্নের ভেতরে এই আলো যেন জ্বলে।

হয়তো আমি এখনো অনেক দূরে, হয়তো আমি এখনো অক্ষম, কিন্তু এই লেখার মাধ্যমেই আমি বাঁচিয়ে রাখতে চাই আমার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সংগ্রামগুলো। যেন ভবিষ্যতের কোনো তালেবে ইলম এগুলো পড়ে নিজের মধ্যে সাহস পায়, নিজের মধ্যে দৃঢ়তা পায়। আমার নীরব প্রচেষ্টা যদি তার অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়, তবেই এই লেখা গুলো সার্থক।

 হুজুর বলেছিলেন—“তুমি যদি প্রকৃত তালেবে ইলম হও, তাহলে দেখবে তোমার সমালোচনা করার মানুষ আশেপাশে অনেক দেখবে। কিন্তু তোমাকে উৎসাহ দেওয়ার মতো মানুষ প্রায় থাকবে না।” এই বাণী যেন আমার অন্তরের ভিতর দিয়ে স্রোতের মতো বইতে লাগলো। সত্যিই তো—যে পথটা ইলমের, সে পথটা ফুলের বাগান নয়, বরং পরীক্ষা আর কণ্টকের পথ। এখানে মানুষের প্রশংসা খুব কম, সমালোচনা বেশি। কিন্তু সেই সমালোচনার ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে সত্যিকারের মেহনতী তালেবে ইলম।

হুজুর বললেন—“তোমার একমাত্র প্রকৃত সহায়ক হচ্ছেন তোমার উস্তাদ। আশেপাশের মানুষ নানা কথা বলবে—সে এমন, সে তেমন, সে এটা করে, ওটা করে। কিন্তু তোমার উস্তাদ কখনো তোমাকে ফেলে দেবেন না। তিনি সর্বদাই তোমাকে তাম্বীহ করবেন, সঠিক পথে রাখবেন।” এই কথাগুলো যেন আমার বুকের ভেতর আলো হয়ে ঝলসে উঠলো। মনে হলো—যারা এই ইলমের পথে হাঁটে, তারা যতই ছোট, যতই দুর্বল হোক না কেন, একজন প্রকৃত উস্তাদ তাদের সঙ্গেই থাকেন, ভুল হলে ধৈর্য ধরেন, কঠোর না হয়ে মমতায় ভরপুর থাকেন।

হুজুর আরো বললেন—উস্তাদের তাম্বীহ কখনো ছাত্রকে নিরাশ করে না। উস্তাদ যদি ভুল দেখেও তিরস্কার না করে বরং শালীনতা বজায় রেখে নরম ভাষায় সতর্ক করে, তখন ছাত্রের মন নষ্ট হয় না। বরং তার ভেতরে নতুন এক উচ্ছ্বাস জন্ম নেয়। সে আরও বেশি উস্তাদের অনুগত হয়, আরও বেশি মেহনতী হয়ে ওঠে। যেন উস্তাদের প্রতিটি কথা হয়ে ওঠে প্রেরণার উৎস।

আমি এমন একজন উস্তাদকে আলহামদুলিল্লাহ চোখে দেখেছি। তিনি যখন দরসে আসেন, বহু ছাত্রের বহু ভুল হয়। কিন্তু তিনি কখনোই সেই ভুলগুলো নিয়ে কটু কথা বলেন না। সমালোচনা করে ছাত্রের মন ভেঙে দেন না। বরং তিনি এমনভাবে তাম্বীহ করেন যে ছাত্র লজ্জিত হয় না, বরং অনুপ্রাণিত হয়। মনের ভেতরে দৃঢ়তা জন্মায়। উস্তাদের প্রতি তার ভালোবাসা বাড়ে, দোয়া করতে থাকে।

এখনো পৃথিবীতে এমন মানুষ আছেন, যারা অন্যের মন খারাপ হয় এমন কাজ করতে পারেন না। তাঁরা তাম্বীহের ভেতরও রাখেন আদব, কোমলতা, ভালোবাসা। তাঁরা ছাত্রের ভবিষ্যৎকে ভেবে কথা বলেন। যেন প্রতিটি শব্দ হয় ছাত্রের জীবনের আলো, জীবনের আশ্রয়। আমি এই হুজুরকে দেখে বুঝেছি—উস্তাদ কেমন হলে ছাত্রের হৃদয়ে প্রেরণার শিখা জ্বলে ওঠে।

যখন হুজুর দরসে প্রবেশ করেন, মনে হয় যেন দরসখানা একটি প্রশান্ত বাগানে পরিণত হয়েছে। ছাত্রদের ভুল যেন বাগানের শুকনো পাতা, আর উস্তাদের তাম্বীহ যেন নরম বাতাস, যা শুকনো পাতা ঝরিয়ে দিয়ে নতুন সবুজ জন্মায়। তিনি কখনোই ছাত্রকে সমালোচনার আঘাতে ভেঙে ফেলেন না। বরং তিনি এমনভাবে সতর্ক করেন যেন ছাত্র কষ্ট না পায়, বরং আরও উৎসাহিত হয়, উস্তাদের জন্য দোয়া করে।

আমি নিজের চোখে দেখেছি—একদিন মাকতাবায়, মাত্র চার দিন আগেই, যখন আমি মুতালাআ করছিলাম একটি কিতাব, সেই মুহূর্তে এই উস্তাদের কোমল ব্যবহার আমাকে নতুন করে অনুপ্রাণিত করলো। মনে হলো—যে ছাত্র এমন উস্তাদের হাতে গড়ে উঠছে, তার মনের ভেতর কখনো নিরাশার ছায়া ঘনাবে না। কারণ সে জানে—তার উস্তাদ আছে, যিনি শাসন করেন ভালোবাসা দিয়ে, তাম্বীহ করেন কোমলতায়, আর সমালোচনা করেন শুধু তাকে উত্তম বানানোর জন্য।

হুজুরের এই কথাগুলো আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে। আমরা অনেক সময় ভেবে নিই, প্রশংসা আর উৎসাহই আমাদের এগিয়ে নেবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, সমালোচনা আর প্রতিকূলতার ভেতর দিয়েই জন্ম হয় আসল মেহনতের, আসল তালেবে ইলমের। আর সেই কঠিন মুহূর্তগুলোতেও একজন প্রকৃত উস্তাদ ছাত্রকে কখনো একা ফেলে দেন না।

এই বাণীগুলো আমার জীবনের জন্য যেন এক নতুন দিকনির্দেশনা। মনে হলো—হ্যাঁ, আমাকেও শিখতে হবে সমালোচনার ভেতর থেকে শিক্ষা নিতে, উস্তাদের শালীন তাম্বীহকে প্রেরণায় পরিণত করতে, আর নিজের মেহনতকে থামিয়ে না রাখতে। হুজুরের কথাগুলো যেন আমার জীবনের পাতায় এক নতুন অধ্যায় লিখে দিলো।

 মাকতাবার সেই দিনটির কথা এখনও যেন মনের পাতায় স্পষ্ট লেখা আছে। চার দিন আগের ঘটনা হলেও, আমার কাছে সেটা এক অনন্য শিক্ষা হয়ে আছে। আমি তখন মাকতাবায় বসে “الأحكام” কিতাবটি মুতালাআ করছিলাম। লেখক আবু মারওয়ান, আব্দুল মালিক বিন হাবীব আল আন্ডালুসী আল মালিকী (রহিমাহুল্লাহ)—মালিকি মাযহাবের একজন সুপ্রসিদ্ধ ইমাম। ২৩৮ হিজরিতে যিনি ইন্তেকাল করেছেন। কিতাবটি কাতারের ওয়াকফ মন্ত্রণালয় থেকে ছাপা হয়েছে। গবেষণা ও তাহকীক করেছেন ডক্টর আহমদ বিন আব্দুল করীম নাজিব। ১৪৩৫ হিজরিতে প্রথম সংস্করণ বের হয়েছে, ২৪৮ পৃষ্ঠার কিতাব।

সেদিন আমি এই কিতাবটির একাংশ পড়ছিলাম একটি নির্দিষ্ট মাসআলা তাহকীক করার উদ্দেশ্যে। আমার ভেতরে ছিল একধরনের অনুসন্ধানী আগ্রহ। এমন সময়ে হুজুর হঠাৎ মাকতাবায় প্রবেশ করলেন। আমি কিতাবের পাতায় নিমগ্ন ছিলাম। হুজুরের উপস্থিতি অনুভব করেই চমকে উঠলাম। তিনি স্নেহমাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন—“তুমি কি পড়ছো বাবা?” আমি কিতাবটি তাঁর হাতে দিলাম।

হুজুর কিতাবটি হাতে নিয়ে দেখলেন আর বললেন—“তুমি এই কিতাবটি কেন পড়ছো?” আমি উত্তর দিলাম—“হুজুর, আমি একটি মাসআলায় আটকে গিয়েছিলাম। সেখানে এই কিতাবের হাওলা পেয়েছি, তাই সরাসরি খুঁজতে এসে পড়ছি।” আমার কণ্ঠে ছিল একধরনের নির্দোষী আন্তরিকতা, আর হৃদয়ে ছিল একান্ত পিপাসা।

হুজুর তখন ধীরে ধীরে বললেন—“আসলে ইলম খুব ভারী একটি জিনিস। তুমি শুধু হাওলা পেয়েই এখানে দেখতে চলে এসেছো। এই কিতাবটি তো মালিকি মাযহাবের কিতাব। তুমি এখন যে স্তরে আছো, সেই স্তর থেকে সরাসরি এ কিতাবে তাহকীক করা সহজ কাজ নয়।” আমি বিনীতভাবে বললাম—“হুজুর, এটা আমি জানতাম। কিন্তু আগ্রহের কারণে দেখতে এসেছি।” হুজুরের চোখে তখন কোমল দৃষ্টি, কিন্তু কথায় ছিল দিকনির্দেশনা।

তিনি বললেন—“হানাফী মাযহাবেই এই মাসআলাটি যে কিতাবগুলোতে লেখা আছে, তুমি সেগুলো থেকেই তাহকীক করতে পারতে। মালিকি মাযহাবের কিতাবগুলো থেকে তাহকীক করতে হলে তোমাকে সেই স্তরে পৌঁছাতে হবে। তুমি এখনো সেখানে পৌঁছাওনি। তবে আলহামদুলিল্লাহ, তোমার এই তৃষ্ণা প্রশংসনীয়। কিন্তু পদ্ধতিটা তোমার অজানা থাকার কারণে তুমি মূল বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে পৌঁছাতে পারোনি। অবশ্যই পরামর্শ থাকা দরকার ছিল।”

হুজুরের এই কথাগুলো আমার ভেতরে যেন এক নতুন আলো জ্বেলে দিলো। মনে হলো—ইলমের রাস্তা শুধুই কিতাব খুঁজে নেওয়া নয়, বরং ধাপে ধাপে, সঠিক সূত্র ধরে, উস্তাদের পরামর্শে এগিয়ে যাওয়া। হুজুরের সেই দিনের উপদেশ যেন আমার আত্মাকে নাড়িয়ে দিলো। তিনি আমার আগ্রহকে নিরুৎসাহিত করলেন না, বরং সেটিকে সঠিক পথে চালিত করার উপায় শিখিয়ে দিলেন।

আমি বুঝলাম—ইলমের ভারী আমানত বহন করতে হলে মেঝলা জ্ঞান দিয়ে চলে হবে না। কিতাবের নাম আর হাওলা জানা মানেই ইলমের মালিক হওয়া নয়। বরং এর জন্য চাই স্তরে স্তরে প্রস্তুতি, চাই মৌলিক মাযহাবের কিতাবগুলোয় দৃঢ় দখল। চাই উস্তাদের নির্দেশনা, চাই বিনয়, চাই ধৈর্য। হুজুর সেই দিন আমাকে শুধু একটুকরো উপদেশ দিলেন না, বরং ইলমের প্রকৃত রূপরেখা এঁকে দিলেন।

হুজুরের কথাগুলো ভেবে আমার মনে হলো—আমরা কত সহজে ভেবে নিই, একটা হাওলা পেলে আমরা তাহকীক করতে পারবো। অথচ প্রতিটি মাযহাবের ফিকহের মধ্যে আছে শত শত সূক্ষ্ম পার্থক্য। তাদের পরিভাষা, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাদের দলিলপদ্ধতি সবই আলাদা। এগুলো না শিখে কেবল অন্য মাযহাবের কিতাবে ডুবে গেলে পথ হারিয়ে ফেলা সম্ভব। সেই দিন হুজুর যেন আমাকে এই অদৃশ্য বিপদ থেকে টেনে বের করলেন।

তাঁর কথাগুলো ছিল স্নেহমাখা, কিন্তু গভীর সতর্কবার্তা। তিনি আমার আগ্রহকে অমূল্য বলে আখ্যায়িত করলেন, কিন্তু শিখিয়ে দিলেন পদ্ধতি। বললেন—পরামর্শ ছাড়া, ধাপে ধাপে না পড়ে, এমন ভারী কিতাবে নামা উচিত নয়। সেই দিনের কথা মনে করলে আজও আমার অন্তরে কৃতজ্ঞতা জাগে। আমি বুঝলাম, উস্তাদের দিকনির্দেশনা ছাড়া ইলমের সমুদ্রের গভীরতায় নামা অন্ধকার গহ্বরে নামার মতো।

সেই দিন থেকে আমার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে গেছে। আমি শিখেছি—হাওলা মানেই চূড়ান্ত নয়, বরং সেটি একটি সেতু মাত্র। যে সেতুর ওপারে রয়েছে বিস্তৃত জ্ঞানসাগর। সেখানে পৌঁছাতে হলে চাই মাযহাবভিত্তিক কিতাবের পূর্ণাঙ্গ মুতালাআ, চাই তাদরীব, চাই তাদাররুস, চাই উস্তাদের পরামর্শ। হুজুরের কোমল সতর্কবার্তা যেন আমার ইলমের যাত্রায় একটি অমোঘ মাইলফলক।

এই অভিজ্ঞতা আমাকে বুঝিয়ে দিলো, ইলম শুধুই পাঠ নয়—এটি একটি যাত্রা। আর সেই যাত্রায় উস্তাদ হচ্ছেন পথপ্রদর্শক। তিনি যেমন ছাত্রকে ভুল করলে তিরস্কার করেন না, তেমনি সঠিক দিকেও চালিত করেন। আমার জীবনেও সেই দিনটি ছিল একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। আমি ইলমকে আরও শ্রদ্ধা করতে শিখলাম, আরও পদ্ধতিগত হতে শিখলাম, আরও ধৈর্যবান হতে শিখলাম।

তখন আমি হুজুরকে বললাম—“হুজুর, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি যে এই মুহূর্তে কিতাবটি আমার দেখা অনুচিত ছিল। ইনশাআল্লাহ, সামনে থেকে আর করব না।” আমার কথাগুলো ছিল আন্তরিক অনুতাপের স্বীকারোক্তি। হুজুর তখনও কোনো রাগ দেখালেন না। তাঁর ব্যবহার আমার হৃদয়ে অমোঘ ছাপ ফেলে দিলো।

হুজুর এমন ভঙ্গিতে আমাকে বুঝিয়ে বললেন যে মনে হলো তিনি শুধু উপদেশ দিচ্ছেন না, বরং আমার অন্তরের গভীরে একটি বীজ বপন করছেন। তিনি আমার ভুলের দিকটি পরিষ্কার করে দিলেন, আবার সেই ভুল সংশোধনের পথও দেখালেন। এতে আমার মনে কোনো কষ্ট জন্ম নিলো না; বরং শ্রদ্ধা ও ভক্তির একটি নতুন স্রোত বয়ে গেল।

আসলে এটাই তো প্রকৃত উস্তাদের বৈশিষ্ট্য—ছাত্রকে নিরাশ না করে, শালীনতার সাথে এমনভাবে উপদেশ দেওয়া যাতে ছাত্রের হৃদয় আরও প্রফুল্ল হয়। সেই দিনের শিক্ষা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। আমি বুঝলাম, ইলম শেখা শুধু কিতাবের পাতার সাথে সম্পর্কিত নয়; বরং উস্তাদের আচার-আচরণ থেকেও জ্ঞানের আসল আলো পাওয়া যায়।

আরেকদিন আরেকটি ঘটনা আমার চোখের সামনে ঘটেছিল। এক ছাত্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিল। সাধারণত এমন দৃশ্য দেখলে অনেক শিক্ষকই ধমক দিয়ে ফেলেন। কিন্তু হুজুরের ব্যবহার ছিল ভিন্ন। তিনি শান্ত ভঙ্গিতে তাকে নিজের কামরায় ডাকলেন। ছাত্রটি কিছুটা ভীত সন্ত্রস্ত অবস্থায় প্রবেশ করলো।

কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, হুজুর তাকে একটুও ধমক দিলেন না। বরং স্নেহভরা কণ্ঠে বললেন—“বাবা, তোমাকে তো দেখলাম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খেতে। তুমি যদি বসে খেতে, তাহলে তোমার জন্য অনেক ভালো হতো। কারণ দাঁড়িয়ে খাওয়া নবীর সুন্নাহর পরিপন্থী। আমরা তো মাদরাসার মেহমান, মানুষ আমাদেরকেই অনুসরণ করে। এজন্য এরপর থেকে আর দাঁড়িয়ে খেও না কেমন?”

হুজুরের এই কোমল উপদেশে ছাত্রটির চোখমুখে এক ধরনের আলোর ঝলক দেখা দিলো। সে বুঝতে পারলো—হুজুর তাকে শুধুই সতর্ক করছেন না, বরং ভালোবাসায় ভরিয়ে দিচ্ছেন। আর এই ভালোবাসার শক্তিই তাকে হুজুরের প্রতি ভক্ত করে তুললো। এরপর থেকে সে প্রতিটি কাজে হুজুরের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে লাগলো।

সেদিন আমি উপলব্ধি করলাম—প্রকৃত ওস্তাদ কখনো ছাত্রকে ধ্বংস করেন না, বরং গড়ে তোলেন। তাঁর প্রতিটি বাক্য ছাত্রের হৃদয়ে আশার বীজ বপন করে, প্রতিটি পরামর্শ জীবনের জন্য পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে। আর এই কারণেই ছাত্ররা ওস্তাদের প্রেমে বেঁধে যায়, তাঁর কথার প্রতি আত্মসমর্পণ করে।

 আরেক দিনের ঘটনা। আমার ক্লাসে আসতে সামান্য দেরি হয়ে গিয়েছিল। কিছুটা জরুরতের কারণে আমাকে বাইরে যেতে হয়েছিল। ক্লাস চলছিল, আর দরস শুরু হয়ে গিয়েছিল প্রায় পনেরো মিনিট আগে। আমি দ্রুত রুমে প্রবেশ করলাম, অন্তরে লজ্জা আর সংকোচের এক অদ্ভুত মিশ্রণ নিয়ে।

হুজুর আমার দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন—“বাবা, দরস তো শুরু হয়েছে আরও পনেরো মিনিট আগে। তুমি দেরি করলে যে।” তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনো রাগ, ছিল কেবল এক ধরণের মমতা। আমি মাথা নিচু করে বললাম—“হুজুর, আমার ভুল হয়ে গিয়েছে। একটু জরুরতের কারণে বাইরে ছিলাম।”

হুজুর তখন মুচকি হেসে বললেন—“আরে বাবা, তুমি এই সময় বাইরে ছিলে, এটা যে প্রয়োজনীয় ছিল, সেটা আমি ভালো করেই জানি। কোনো সমস্যা নেই। তুমি পেরেশানি হইও না। আমি কিছুই বলব না, তুমি ভয় পেয়ো না।” তাঁর প্রতিটি শব্দ যেন আমার হৃদয়ের ভেতর মমতার স্রোত বইয়ে দিলো।

তারপর হুজুর আরও যোগ করলেন—“তবে, যদি তুমি আমাকে একটু জানিয়ে রাখতে যে ‘হুজুর, আমার একটু প্রয়োজন আছে, তাই আমি পনেরো মিনিট দেরি করব’, তাহলে আমি তোমার জন্য দোয়া করতাম— ‘আল্লাহ, তুমি তার প্রয়োজন দ্রুত পূর্ণ করে দাও, যাতে সে তাড়াতাড়ি দরসে ফিরে আসতে পারে।’

এই কথাগুলো শুনে আমার চোখ ভিজে উঠেছিল। আমি ভাবলাম, এ কেমন উস্তাদ! যেখানে অন্য কারও কাছ থেকে আমি তিরস্কার, অভিযোগ কিংবা শাসন আশা করতে পারতাম, সেখানে তিনি দিলেন দোয়া আর উৎসাহ। এমন আচরণ কেবল জ্ঞানীদের নয়, বরং প্রকৃত আল্লাহওয়ালাদেরই শোভা পায়।

সেদিন আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম—ওস্তাদের হৃদয় ছাত্রের জন্য দোয়ার খনি। তিনি শুধু শিক্ষা দেন না, তিনি ছাত্রের প্রতিটি পদক্ষেপে দোয়ার ছায়া বিস্তার করেন। তাঁর ঠোঁটের মিষ্টি বাক্য শুধু কানে নয়, হৃদয়ের গভীরে গিয়ে গেঁথে যায়। সেই দিন থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কখনো বিনা কারণে দেরি করব না; আর যদি কোনো জরুরত ঘটে, তবে অবশ্যই উস্তাদকে জানাব।

যখন হুজুর আমাকে সেই কথা বললেন, আমার ভিতর থেকে অটোমেটিক এমন এক আওয়াজ সৃষ্টি হলো যে আমি হুজুরের জন্য তৎক্ষণাৎ দোয়া করা শুরু করলাম। চোখ থেকে দু ফোটা পানি silently চলে এল, কিন্তু হুজুরকে তা দেখতে দেইনি। পরে নিজে একাকী হুজুরের জন্য কেঁদেছি। আল্লাহর রহমতে এমন নরম মনের মানুষ এই দুনিয়ার বুকে সৃষ্টি হয়েছে, যে সামান্য ভুলের কারণে কখনোই ধমক দেন না।

তিনি নরমভাবে কথা বললেন, অথচ সেই কোমল কথাতেই সবাই মেনে নেয়, সবাই ভুল বুঝে নেয়। যা অন্য কেউ ধমকের স্বরে বা অশালীন ভাষায় বললে ছাত্রদের মনে বিরক্তি বা রাগ সৃষ্টি হতো, হুজুরের নরম ভাষা তা কখনোই ঘটায় না। এই অনুভূতিটুকু আমাকে গভীরভাবে ছুঁয়ে গেছে।

আমি আশা করি, আল্লাহ আমাকে ভবিষ্যতে এমন ওস্তাদ হওয়ার তৌফিক দিন। যাতে আমি ছাত্রদের সতর্ক করতে পারি, কিন্তু তাদের হৃদয় বা মন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। যদি আমি কখনো উল্টো পথে কষ্ট দেই, তারা আর আমার কাছে ফিরে আসবে না। বরং যদি আমি তাদেরকে দয়া, বিনয় ও দৃষ্টান্ত দিয়ে শিখাই, তাহলে ছাত্ররা সবসময় আমার পাশে থাকবে, কখনোই সমালোচনা করবে না, এবং যে কোনো প্রয়োজনে আমার কাছে আসবে।

হুজুরকে দেখেই আমি শিখি, কিভাবে চলতে হয়, কিভাবে কথা বলতে হয়, কিভাবে অন্যের ভুল ধরিয়ে দিতে হয়। হুজুর কখনো কাউকে জনসমক্ষে ভ্রান্তি বা ভুলের জন্য লজ্জা দেননি। তিনি একান্তভাবে ছাত্রকে ডেকে শালীনভাবে সতর্ক করেন। এভাবে হলেও ছাত্ররা বিনা বাক্যে তাঁর কথা মেনে চলে। হুজুরের এই দৃষ্টান্ত ছাত্রদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে, যা শিক্ষার বাইরে একটি মহব্বতের অনুভূতিও সৃষ্টি করে।

এভাবেই একজন প্রকৃত ওস্তাদ শিক্ষার সঙ্গে মমতা ও কোমলতা প্রদর্শন করে ছাত্রের মনে বিশ্বাস, ভালোবাসা ও আনুগত্য প্রতিষ্ঠা করেন। আমার হৃদয় মর্মে এটি গেঁথে গেছে, এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করি যে হুজুরকে আজীবন ইলমের খেদমতে রাখুন এবং আল্লাহর অলি হিসেবে কবুল করুন।

হুজুরের আচরণে আমি শিখেছি, কিভাবে অন্যের ভুল চিহ্নিত করা যায়, কিভাবে সতর্কতা প্রদান করা যায়, কিভাবে বিনয় ও দয়া দিয়ে শিক্ষাদান করা যায়। এমন মহব্বত, ধৈর্য এবং কোমলতার শিক্ষা আমার জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ছাত্ররা যখন এ ধরনের আচরণ লক্ষ্য করে, তখন হৃদয়ে আলাদা এক মহব্বত ও শ্রদ্ধার জন্ম হয়। এবং সেই শিক্ষার আলোয় তাদের ইলমের প্রতি আগ্রহ আরও প্রবল হয়।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি