তাখাসসুসের প্রস্তুতি ও তালিবে ইলমের দায়িত্ব
তাখাসসুসের প্রস্তুতি ও তালিবে ইলমের দায়িত্ব
দ্বীনের ইলম এমন এক মহান আমানতের, যা কেবলমাত্র আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের ভাগ্যে নসীব হয়। একজন তালিবে ইলম যখন প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চতর স্তরে অগ্রসর হয়, তখন তার লক্ষ্য হওয়া উচিত ইলমে গভীরতা ও দৃঢ়তা অর্জন করা। তাখাসসুস হলো সেই উচ্চ স্তরের যাত্রা যেখানে একজন ছাত্র কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে ইলমের ময়দানে আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। কিন্তু এই যাত্রা হঠাৎ শুরু হয় না। এর প্রস্তুতি নিতে হয় অনেক আগেই, বিশেষ করে জালালাইন জামাত থেকেই।
জালালাইন জামাত থেকে প্রস্তুতির সূচনা
জালালাইন জামাতকে বলা যায় তাখাসসুসের প্রথম দরজা। কারণ এখানে এসে তালিবে ইলম তাফসীর, ফিকহ, উসূল, হাদীস ও আরবী ভাষার আসল স্বাদ পেতে শুরু করে। এখান থেকে তার চিন্তাশক্তি প্রসারিত হয়, কিতাব বোঝার যোগ্যতা গড়ে ওঠে, এবং ইলমে গভীরতা অর্জনের প্রথম ধাপ শুরু হয়। তাই একজন তালিবুল ইলমকে এ জামাত থেকেই উচ্চতর স্তরের জন্য মানসিক, বৈজ্ঞানিক এবং রুহানী প্রস্তুতি নিতে হবে।
তাখাসসুসের ক্ষেত্র নির্বাচন
তাখাসসুসের অনেক শাখা আছে—যেমন:
- তাখাসসুস ফিল ফিকহ ওল ইফতা – ফিকহ ও ফতোয়ার বিষয়ে গভীর দক্ষতা অর্জন।
- তাখাসসুস ফিল হাদীস – হাদীস শাস্ত্রে গভীর গবেষণা ও ইস্তিনবাত।
- তাখাসসুস ফিত তাফসীর – কুরআনের তাফসীর, উলূমুল কুরআন ও মাআরিফুল কুরআন।
- তাখাসসুস ফিল আরাবিয়্যা – আরবী ভাষা ও বালাগাতের উপর দক্ষতা।
- তাখাসসুস ফিত তাসাউফ – আত্মশুদ্ধি ও ইলমে তাযকিয়ার ক্ষেত্র।
তবে ছাত্রের উচিত হবে তার স্বভাব, মেধা, আগ্রহ ও যোগ্যতা অনুযায়ী বিষয় নির্বাচন করা। এ ক্ষেত্রে ওস্তাদের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ওস্তাদরা ছাত্রকে তার আসল যোগ্যতা চিনিয়ে দিতে পারেন।
ওস্তাদের পরামর্শ অনুসরণের গুরুত্ব
ইলমের ময়দানে একাকী চলা বিপদজনক। ইলমী সাফরে পথপ্রদর্শক ছাড়া মানুষ অন্ধকারে পড়ে যায়। এজন্য তালিবে ইলমের উচিত অভিজ্ঞ, বিজ্ঞ ওস্তাদদের সান্নিধ্যে থাকা, তাদের পরামর্শ মেনে চলা এবং তাদের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো। কারণ তাখাসসুসের ময়দান কেবল বই পড়ার ময়দান নয়; বরং অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি, এবং সঠিক মুরব্বীয়াত এখানে অপরিহার্য।
কিতাব মুতালাআর গুরুত্ব
তাখাসসুসের প্রস্তুতির সবচেয়ে বড় অংশ হলো কিতাব মুতালাআ। প্রতিটি ফনের কিতাব ছাত্রকে চিনতে হবে, তার মুসান্নিফের নাম জানতে হবে, কিতাবের মূল বিষয়বস্তু ও উদ্দেশ্য বুঝতে হবে। কেবল দরসে শুনলেই হবে না; বরং বারবার নিজে পড়তে হবে, নোট তৈরি করতে হবে, মতন মুখস্থ করতে হবে এবং শরাহ আয়ত্ত করতে হবে।
দরসে ব্যবহৃত কিতাব আয়ত্ত করা
একজন তালিবে ইলম যদি তাখাসসুসে প্রবেশ করতে চায়, তবে দরসে ব্যবহৃত কিতাবগুলো পুরোপুরি আয়ত্ত করা আবশ্যক। যেমন:
- মিজানুস সরফ – আরবী সরফ শাস্ত্রে ভিত্তি গড়ে তোলে।
- কাফিয়া – নাহবের উচ্চতর স্তরে অগ্রসর করে।
- শরহে বেকায়া – ফিকহের গভীর দিকগুলোতে দক্ষ করে।
- জালালাইন – তাফসীরের সূক্ষ্ম দিকগুলো বুঝতে সহায়তা করে।
এসব কিতাব শুধু পড়লেই চলবে না; বরং মতন মুখস্থ করতে হবে, শরাহ বুঝতে হবে, এবং প্রতিটি ইবারত সঠিকভাবে আয়ত্ত করতে হবে।
রুহানী প্রস্তুতি
তাখাসসুস কেবল বাহ্যিক জ্ঞানের নাম নয়। বরং এটি হৃদয়ের ইলম। তাই ছাত্রকে নামায, কুরআন তিলাওয়াত, যিকর-আযকার, দোয়া ও মুরুব্বীদের খেদমতের মাধ্যমে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে হবে। কেবল পড়াশোনা নয়, বরং আমল, তাকওয়া ও ইখলাসের মাধ্যমে তাখাসসুসের আসল বরকত নসীব হয়।
উপসংহার
সংক্ষেপে বলা যায়, তাখাসসুসের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে জালালাইন জামাত থেকেই। কোন বিষয়ে তাখাসসুস করা উচিত তা নির্ধারণ করতে হবে ওস্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী। তারপর ধাপে ধাপে কিতাব মুতালাআ, দরসের কিতাব আয়ত্ত, শরাহ বোঝা, মতন মুখস্থ করা এবং রুহানী আমল করার মাধ্যমে একজন তালিবে ইলম ধীরে ধীরে যোগ্যতা অর্জন করবে। ইলমের ময়দান দীর্ঘ পথ, কিন্তু ধৈর্য, নিয়মিত অধ্যবসায় এবং সঠিক দিকনির্দেশনার মাধ্যমে তাখাসসুসে একজন ছাত্র শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ইলমে নাফেয় ও খেদমতে দ্বীনের জন্য কবুল করুন।
Comments
Post a Comment