প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিদ্বেষ — একটি অশুভ প্রবণতা

 

প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিদ্বেষ — একটি অশুভ প্রবণতা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 
 

মানুষের ভেতরে আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বভাব আছে—প্রতিযোগিতা করার, উৎকর্ষ অর্জনের, অন্যের চেয়ে এগিয়ে যাওয়ার। এই প্রতিযোগিতা যদি হয় ইলমে, নেক আমলে, চরিত্র গঠনে, উন্নত কর্মে—তাহলে তা প্রশংসনীয়। কিন্তু যখন এই প্রতিযোগিতা বিকৃত রূপ নেয়, তখন তা হয়ে দাঁড়ায় বিদ্বেষ, হিংসা এবং কুৎসার জন্মভূমি। বিশেষ করে প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিদ্বেষ সমাজের জন্য একটি মারাত্মক ব্যাধি, যা সুস্থ ধারার মানুষ গঠনে বাধা সৃষ্টি করে।

বিদ্বেষের মূল কারণ

সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান যখন সুনামের আলোয় উজ্জ্বল হয়, তার ইলম, চরিত্র, আদর্শ ও মেহনত দূর-দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে, তখন অন্যরা অনেক সময় সেটা মেনে নিতে পারে না। তারা ভাবে—“আমাদের প্রতিষ্ঠান কেন পিছিয়ে থাকবে?” এখানেই শয়তান মানুষের অন্তরে হিংসা, বিদ্বেষ এবং কুপ্রতিযোগিতা ঢুকিয়ে দেয়। আর সেখান থেকে শুরু হয় দোষ খোঁজা, কুৎসা রটানো, এবং ভিত্তিহীন অপপ্রচার।

অথচ প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হলো, অন্যের উন্নতি দেখে খুশি হওয়া এবং নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা চালানো। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
وَلاَ تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الأَرْضِ — “তুমি পৃথিবীতে ফাসাদ করো না।” (সূরা কাসাস, ২৮:৭৭)

বিদ্বেষের ক্ষতি

প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিদ্বেষ সমাজকে বিভক্ত করে দেয়। একে অপরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ালে তরুণ প্রজন্ম বিভ্রান্ত হয়। ইলমের অঙ্গনে ঐক্যের পরিবর্তে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। মানুষ দ্বীনের আসল মেহনত ভুলে যায় এবং তুচ্ছ বিষয়ে লিপ্ত হয়। বিদ্বেষের কারণে একটি প্রতিষ্ঠানের ভালো দিকগুলোও ঢাকা পড়ে যায়, অথচ প্রতিটি দ্বীনি প্রতিষ্ঠানই আল্লাহর খেদমত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

হাদীসে এসেছে:
لاَ تَحَاسَدُوا — “তোমরা একে অপরের প্রতি হিংসা করো না।” (সহীহ মুসলিম)
এই বাণী আমাদের স্পষ্ট বলে দেয় যে, হিংসা ও বিদ্বেষ শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গনেও ধ্বংস ডেকে আনে।

সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি

অন্য প্রতিষ্ঠানের উন্নতি দেখে বিদ্বেষ করার বদলে সেটিকে প্রেরণা হিসেবে নেয়া উচিত। যদি কোনো প্রতিষ্ঠান কুরআন-হাদীসের খেদমতে উৎকর্ষতা লাভ করে, তবে সেটি আল্লাহর রহমতের প্রতিফলন। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত নিজেদের উন্নত করা, নিজেদের ত্রুটি খুঁজে বের করা এবং আকাবীরদের পথ ধরে নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা।

প্রকৃতপক্ষে, বিদ্বেষ নয় বরং সহযোগিতা ও শুভ প্রতিযোগিতা সমাজকে আলোকিত করে। যদি প্রতিষ্ঠানগুলো একে অপরকে সম্মান করে, তবে ইলম, শিক্ষা ও দ্বীনের প্রচার বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তখন মানুষ দ্বীনের আসল স্বাদ পাবে এবং সমাজ হবে ঐক্যবদ্ধ।

শেষকথা

প্রতিষ্ঠান ভিত্তিক বিদ্বেষ কোনো ভালো আলামত নয়। বরং এটি একটি অশুভ প্রবণতা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে বড় বাঁধা। আমাদের উচিত এই বিদ্বেষ থেকে বেঁচে থাকা, অন্যের উন্নতি দেখে খুশি হওয়া এবং নিজের উন্নতির জন্য চেষ্টা চালানো। হিংসা নয়, বরং ভালোবাসা ও সহমর্মিতা দ্বীনের কাজকে এগিয়ে নেয়।

তাই আজ আমাদের প্রত্যেককে প্রতিজ্ঞা করতে হবে— কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম দেখে বিদ্বেষ নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা নেব। অন্যের সাফল্যে আমরা খুশি হব, আর নিজের সাফল্যের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করব। তাহলেই প্রতিষ্ঠানের মাঝে ঐক্য আসবে, সমাজে শান্তি আসবে, এবং দ্বীনের আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে।

Comments

Popular posts from this blog

সময়ের অপচয়, আত্মপ্রদর্শন ও সামাজিক মাধ্যমে অহেতুক প্রকাশ: এক আত্মসমালোচনামূলক আলোচনা

ইলম অর্জনের কষ্ট ও পদক্ষেপ

বেফাক পরীক্ষার প্রস্তুতি: মিশকাত জামাতের জন্য নিয়ম-নীতি ও কলাকৌশল