সীরাতুন্নবী ﷺ এর গুরুত্ব ও শিক্ষা
সীরাতুন্নবী ﷺ এর গুরুত্ব ও শিক্ষা
আল্লাহ তা‘আলা মানবজাতিকে হিদায়াত দেওয়ার জন্য যুগে যুগে নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন। তাদের মধ্যে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ ﷺ। তাঁর জীবন হলো মানবতার জন্য পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। তিনি শুধু একজন নবি ছিলেন না, তিনি একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক, শিক্ষক, দাওয়াতদাতা, আদর্শ স্বামী, দয়ালু নেতা এবং মানবতার কল্যাণকামী ছিলেন। তাই তাঁর জীবন নিয়ে আলোচনা বা সীরাতুন্নবী ﷺ অধ্যয়ন করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
সীরাতুন্নবী ﷺ এর পরিচয়
সীরাত শব্দের অর্থ হলো জীবনধারা, জীবনকাহিনী বা চলার পথ। আর সীরাতুন্নবী ﷺ বলতে বোঝায়—রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পবিত্র জীবন, তাঁর আচার-আচরণ, দাওয়াত, সংগ্রাম, যুদ্ধ, শান্তি, ইবাদত, শিক্ষা, সমাজ সংস্কার, এবং জীবনের প্রতিটি দিক। এ জীবন অধ্যয়ন করলে আমরা জানতে পারি কিভাবে একজন মানুষ আল্লাহর ইবাদত করে, মানুষের হক আদায় করে এবং একটি উন্নত সমাজ গড়ে তোলে।
শৈশব ও যৌবনের জীবন
রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন এতিম। জন্মের কিছুদিন পরেই তিনি পিতৃহারা হন এবং অল্প বয়সে মাতৃহারা হন। দাদা ও পরে চাচা আবু তালিবের আশ্রয়ে বড় হন। জীবনের এই কষ্টকর সময় তাঁকে ধৈর্যশীল, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলে। যৌবনে তিনি ব্যবসায় অংশ নিতেন এবং সৎ ও বিশ্বস্ত হওয়ার কারণে তাঁকে আল-আমীন নামে ডাকা হতো।
নবুওয়তের দায়িত্ব
চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় ইবাদতের সময় তাঁর ওপর ওহী নাযিল হয়। জিবরাঈল (আ.) এসে তাঁকে কুরআনের প্রথম আয়াত শিক্ষা দেন: اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَقَ — “পড়ো তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” এখান থেকেই শুরু হয় নবুওয়তের দায়িত্ব। তিনি মানুষকে তাওহীদের দিকে আহ্বান করেন এবং শির্ক, কুসংস্কার, অন্যায় ও জুলুম থেকে বিরত থাকার দাওয়াত দেন।
মক্কার জীবন ও সংগ্রাম
নবুওয়তের পর প্রথম ১৩ বছর মক্কায় তাঁর জীবন ছিল কষ্ট ও নিপীড়নে ভরা। কুরাইশরা তাঁর দাওয়াতকে অস্বীকার করে, তাঁকে উপহাস করে, সাহাবীদের উপর নির্যাতন চালায়। কিন্তু তিনি কখনো ধৈর্য হারাননি। তাঁর দাওয়াতের মূল ছিল “قولوا لا إله إلا الله تفلحوا” — “বল, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই, তাহলেই মুক্তি পাবে।”
মদিনার জীবন ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
মক্কার কষ্ট সহ্য করার পর তিনি আল্লাহর নির্দেশে মদিনায় হিজরত করেন। সেখানেই তিনি প্রথম ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। মসজিদে নববী গড়ে তোলেন, মুয়াখাত প্রতিষ্ঠা করেন (মুহাজির ও আনসারের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব)। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ শাসক, যিনি মুসলিম-অমুসলিম সবার সাথে ন্যায়বিচার করেছেন। মদিনার সনদ দিয়ে তিনি বহুধর্মীয় সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
যুদ্ধ ও জিহাদ
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনে বদর, উহুদ, খন্দকসহ বহু যুদ্ধ এসেছে। তবে এসব যুদ্ধ তিনি নিজ থেকে শুরু করেননি। বরং মুশরিকদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যই তিনি জিহাদ করেছেন। প্রতিটি যুদ্ধে তাঁর চরিত্রে দয়া, ক্ষমা ও মানবতা প্রকাশ পেয়েছে। মক্কা বিজয়ের সময় তিনি তাঁর শত্রুদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: اذهبوا فأنتم الطلقاء — “তোমরা মুক্ত, আজ তোমাদের জন্য কোনো দোষ নেই।”
সীরাতুন্নবী ﷺ এর শিক্ষা
- মানুষকে ভালোবাসা ও সেবা করা।
- সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততা বজায় রাখা।
- ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা।
- ন্যায়পরায়ণতা ও ভ্রাতৃত্ব গড়ে তোলা।
- দুনিয়ার সাময়িক জীবন নয়, আখিরাতকে লক্ষ্য করা।
শেষ কথা,,
সীরাতুন্নবী ﷺ হলো এমন এক আলোকবর্তিকা, যা প্রতিটি যুগে মানুষকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেয়। বর্তমান সমাজের অস্থিরতা, অন্যায়, দুর্নীতি ও বিভাজনের অন্ধকার দূর করতে হলে আমাদের সীরাত অধ্যয়ন করতে হবে এবং তা জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবন হলো সেই আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের দুর্বলতা খুঁজে পাব এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে এগিয়ে যেতে পারব। তাই সীরাত অধ্যয়ন শুধু একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের জন্য অপরিহার্য নির্দেশিকা।
Comments
Post a Comment