দাওয়াতের মহিমা ও নবীদের ত্যাগ

 

দাওয়াতের মহিমা ও নবীদের ত্যাগ

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহপাকের জন্য, যিনি সৃষ্টির জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের শান্তি, সুখ এবং সফলতার ব্যবস্থা রেখেছেন। যেমন মাছের শান্তি পানির মধ্যে, তেমনি মানুষের শান্তি রেখেছেন দ্বীনের আলোকে আঁকড়ে ধরে। আল্লাহপাকের হুকুম মেনে নবীদের তরীকা অনুসরণ করাটাই প্রকৃত দ্বীন।

কুরআনের আয়াত: "وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ" (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত 107)
"আমরা আপনাকে কেবল সৃষ্টির প্রতি রহমত হিসেবে প্রেরণ করেছি।"

হাদিস ১: হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী: "الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ" (সহীহ বুখারি)
"যে মুসলমান হলো, সে হলো যে তার লোভ-বাসনা ও হাতের দ্বারা অন্য মুসলমানকে ক্ষতি না করে।"

হাদিস ২: "من دلّ على خير فله مثل أجر فاعله" (সহীহ মুসলিম)
"যে ব্যক্তি কাউকে কল্যাণের দিকে নির্দেশ দেয়, তার জন্যও মূল কাজের সমান পুরস্কার রয়েছে।"

যখন মানুষ দ্বীন থেকে গাফেল হয়ে যায়, আখিরাতকে ভুলে দুনিয়ামুখী হয়, একমাত্র আল্লাহপাকের ওপর ভরসা না রেখে সৃষ্টির বস্তুতে নির্ভর করে, তখন আল্লাহপাক তাদের নাজাত ও কামিয়াবীর জন্য লক্ষাধিক নবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। নবীরা দাওয়াতের পথে কখনো আগুনের মধ্যে গিয়েছেন, কখনো মাছের পেটে, আবার কখনো লোহার চিরুনি দ্বারা চামড়া-গোশত খসিয়েও কাজ করেছেন। তবুও তারা সামান্যও দ্বীনের মেহনত থেকে বিচ্যুত হননি।

হযরত ঈসা আলাইহিস সালামের পর থেকে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তি পর্যন্ত আরবের মানুষ পুরোপুরি বদ্বীনী হয়ে গিয়েছিল। তারা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দিত, কাবার ঘরে ৩৬০টি মূর্তি স্থাপন করত। এই যুগকে বলা হয় অন্ধকার যুগ।

আল্লাহপাক দয়া প্রদর্শন করে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আখিরি নবী হিসেবে প্রেরণ করলেন। মাত্র ২৩ বছরের মহৎ পরিশ্রমের মাধ্যমে বর্বর, অসভ্য, ঘৃণিত মানুষদের চরিত্রে সোনার আলোকসজ্জা ফুটিয়ে তোলেন।

যেহেতু আর কোনো নবী দুনিয়াতে আসবেন না, তাই এই মহৎ মেহনতের দায়িত্ব এখন আমাদের উপর। আমরা যদি এই দাওয়াতের মেহনত না করি, কিয়ামতের দিন আমাদেরকে এর জন্য জবাবদিহি করতে হবে। কিন্তু যদি আমরা সততার সঙ্গে আল্লাহর পথে কাজ করি, আল্লাহ আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মান এবং ইজ্জত দান করবেন। ভাই, আমরা কি সবাই এই মহৎ মেহনতের জন্য প্রস্তুত নই?

কুরআনের আয়াত:
كُنۡتُمْ خَیۡرَ اُمَّۃٍ اُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَاۡمُرُوۡنَ بِالْمَعْرُوۡفِ وَتَنْہَوْنَ عَنِ الْمُنۡکَرِ وَتُؤْمِنُوۡنَ بِاللہِ ۗ وَلَوْ اٰمَنَ اَہۡلُ الْكِتٰبِ لَكَا نَ خَیۡرًا لَّہُمۡ ۗ مِنْہُمُ الْمُؤْمِنُوۡنَ وَاَكْثَرُہُمُ الْفٰسِقُوۡنَ ﴿۱১০﴾

“আপনারা সর্বশ্রেষ্ঠ উম্মত যারা মানুষের জন্য প্রেরিত হয়েছে, তারা মঙ্গলময় কাজ করতে আহ্বান করে এবং অপকর্ম থেকে বিরত রাখে, আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখে।” (আল-কোরআন)

হাদিসসমূহ

হাদিস ১:
"আল্লাহপাকের রাস্তায় এক সকাল অথবা এক বিকাল ব্যয় করা দুনিয়া এবং তার সমস্ত ধন-সম্পদের চেয়ে উত্তম।"
(صحيح البخاري)

হাদিস ২:
"আল্লাহর রাস্তার ধূলাবালি আর জাহান্নামের ধূয়া কখনো একত্রিত হবে না।"
(جامع الترمذي)

হাদিস ৩:
"আল্লাহর পথে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করা, শবে কদরের রাতে হাজরে আসওয়াদ পাথরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে সারারাত ইবাদত করার চেয়ে উত্তম।"
(ابن حبان)

হাদিস ৪:
"আল্লাহর পথে কিছু সময় দাঁড়ানো নিজের ঘরে ৭০ বছর নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম।"
(جامع الترمذي)

প্রিয় ভাই ও বোনেরা, আসুন আমরা সবাই একত্রিত হয়ে আল্লাহর দাওয়াতের মেহনত করি। আমাদের প্রত্যেকটি পদক্ষেপ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের দিকে। প্রতিটি ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা এবং ধৈর্য আমাদের জন্য আখিরাতের কল্যাণ এবং দুনিয়ার বরকত বয়ে আনবে। এই মহৎ দাওয়াতের মাধ্যমে আমরা কেবল নিজেদেরই নয়, সমাজকেও আলোর পথে নিয়ে যেতে পারব।

সুতরাং, আমাদের প্রত্যেককে প্রস্তুত থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের চেষ্টা এবং ধৈর্যকে কবুল করুন, এবং আমাদেরকে এই দাওয়াতের কাজে সর্বোচ্চ সফলতা দান করুন।

গাস্তের আদব ও তরতীব

আলহামদুলিল্লাহ, গাস্তের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর পথে প্রচেষ্টা করি। জামাতের মধ্যে তরতীব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুটি অংশ থাকবে; একটি মসজিদের ভিতরে ইবাদত ও আধ্যাত্মিক চর্চা চালিয়ে যাবে, আর অন্যটি গাস্তে যাবে। গাস্তে যাওয়া জামাতে থাকবে একটি রাহবার, একজন মুতাকাল্লিম, কয়েকজন মামুর এবং একজন যিম্মাদার। বিশেষ করে রাহবার যদি এলাকার লোক হয়, তবে এলাকার মানুষদের সাথে সম্পর্ক সহজ হয় এবং দাওয়াতের প্রভাব আরও বৃদ্ধি পায়।

গাস্তে যাওয়ার উদ্দেশ্য হলো পুরো মহল্লাকে আল্লাহর রাজির পথে আহ্বান করা। এ পথে যাওয়ার আগে প্রতিটি ভাই নিজের দুর্বলতা ও অপরিপূর্ণতা আল্লাহর কাছে পেশ করে, খোলা মনে দোয়া করে। গাস্তে সাধারণত ৭-১০ জন সাথী থাকা উত্তম, যাতে দাওয়াতের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়।

  • নজরের হেফাজত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; সতর্ক দৃষ্টি এবং ন্যায়পরায়ণ আচরণ বজায় রাখতে হবে।
  • গাস্তের পথে জিকির ও ফিকিরে মনোযোগ রাখা উচিত, যাতে প্রতিটি পদক্ষেপ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়।
  • রাস্তার ডান দিক দিয়ে চলা আদবের মধ্যে গণ্য।
  • মহল্লার শেষ প্রান্ত থেকে মসজিদের দিকে ধাপে ধাপে জামাত এগোবে।

মসজিদে পৌঁছানোর পরও আমল চলতে থাকবে। একটি ভাই ঈমান একীনের কথা বলবে, কিছু ভাই তার বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনবে, দুই-তিনজন ভাই এস্তেকবাল করবে এবং কিছু ভাই দোয়া ও জিকিরে লিপ্ত থাকবে। এই সমন্বিত কার্যক্রমে জামাতের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত হবে এবং প্রত্যেক ভাই ও বোনের হৃদয়ে তাওহীদ ও আধ্যাত্মিক দৃঢ়তা বৃদ্ধি পাবে।

গাস্তের এই তরতীব শুধু বাহ্যিক প্রক্রিয়া নয়, বরং এটি আমাদের অন্তরকে প্রশিক্ষণ দেয়, ধৈর্য্য, আন্তরিকতা ও একতা বৃদ্ধি করে। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি দোয়া, প্রতিটি জিকির, এবং প্রত্যেকটি আলোচনা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য। তাই ভাই ও বোনেরা, গাস্তে যাওয়ার সময় এই আদবগুলো সর্বোচ্চভাবে মানা অত্যন্ত জরুরি।

রাহবার ও মুতাকাল্লিমের আদব

রাহবারের কর্মমুখী দায়িত্ব হলো মহল্লার ডান প্রান্ত থেকে শুরু করে প্রতিটি ঘরে ঘরে সফর করা, যেন প্রত্যেক ঘরে আল্লাহর রাস্তার নাজীহ মেহমানদের আগমন এবং দাওয়াতের বার্তা পৌঁছে যায়। তিনি প্রতিটি পরিবারের কাছে সালাম পৌঁছে দেবেন এবং বিনয়ীভাবে জানাবেন যে, "আল্লাহর রাস্তার মেহমানেরা আপনার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসছেন।" যদি কোন ব্যক্তি ব্যস্ত থাকেন, তিনি তাকে শিষ্টভাবে কাজে ব্যস্ত রাখার পরামর্শ দিয়ে মুতাকাল্লিমের কাছে নিয়ে আসবেন। রাহবারের শৃঙ্খলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তিনি মুতাকাল্লিম ও যিম্মাদার ছাড়া অন্য কারো সাথে সালাম আদান-প্রদান করবেন না, এবং অন্য কেউও তাকে সালাম প্রদান করতে পারবে না। এটি দাওয়াতের মর্যাদা ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অপরিহার্য।

মুতাকাল্লিমের দায়িত্ব হলো সুন্দর ও নরম স্বরে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দাওয়াত প্রদান করা: তাওহীদ, রিসালাত এবং আখিরাত। তাঁর বাণী হবে এমন সূক্ষ্ম যে সেটি বক্তৃতার আকার ধারণ করবে না, আবার এটি অতিরিক্ত ঘোষণা বা এলানও নয়। তিনি যেন মৃদু হাসি, শান্ত স্বর এবং বিনয়ী ভঙ্গিমায় এই মহান বার্তা পৌঁছে দেন, যেন শ্রোতারা তাদের অন্তরে আল্লাহর পথে অভ্যর্থনা ও গভীর অনুভূতি গ্রহণ করতে পারে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি দৃষ্টিভঙ্গি, এবং প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নির্ধারিত হয়।

রাহবার এবং মুতাকাল্লিম একে অপরের পরিপূরক। রাহবার যেমন জামাতকে শান্তভাবে পরিচালনা করে এবং মানুষের দরজায় দাওয়াত পৌঁছে দেয়, মুতাকাল্লিম তেমনি বিনয়ী ভঙ্গিমায় হৃদয় স্পর্শকারী বাণী প্রচার করেন। এ দুইয়ের সমন্বয় গাস্তের কার্যক্রমকে পরিপূর্ণতা দেয় এবং আল্লাহর রাস্তার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।

এই তরতীব ও আদব মেনে চললে, গাস্তের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিবেদিত এবং এতে প্রতিটি ভাই ও বোনের হৃদয়ে দৃঢ়তা, ধৈর্য্য, এবং আধ্যাত্মিক প্রেরণা বৃদ্ধি পায়। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি জিকির, এবং প্রতিটি দাওয়াত যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির দিশা হয়ে ওঠে।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি