কিতাব মুতালাআ ও কিতাবের তাআরুফ: ইলমে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ

 

কিতাব মুতালাআ ও কিতাবের তাআরুফ: ইলমে দ্বীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

ইলমে দ্বীনের আলো লাভ করা শুধু মাদরাসার দরসের হিফ্‌জ বা মুখস্থ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং ইলমের প্রকৃত সৌন্দর্য হলো—বিস্তৃত মুতালাআ (পড়াশোনা) এবং কিতাব সম্পর্কে মৌলিক ধারণা অর্জন। একজন প্রকৃত তালেবে ইলমের পরিচয় হবে এভাবে যে, সে শুধু তার পাঠ্য কিতাবের ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সে কিতাবসমূহের নাম, মুসান্নিফ (লেখক), তাদের ওফাত, কোন মাকতাবা থেকে প্রকাশিত হয়েছে, কে তাহকীক করেছেন, কোন কোন ফনের অন্তর্ভুক্ত—এসব বিষয়ে ন্যূনতম হলেও ধারণা রাখবে।

কিতাব মুতালাআর গুরুত্ব

কুরআন-হাদিস, ফিকহ, উসুল, তাফসির, আকীদা, মানতিক, আরবী সাহিত্য—প্রতিটি ফনেই অসংখ্য কিতাব রচিত হয়েছে। প্রতিটি কিতাব হলো একটি ইলমি খনি। একজন ছাত্র যত বেশি কিতাব মুতালাআ করবে, তার ইলম তত বেশি গভীর হবে। কিতাব মুতালাআর মাধ্যমে—

  • বিভিন্ন ফনের পরিচয় পাওয়া যায়,
  • ইলমি বিশ্লেষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়,
  • আকাবিরদের পরিশ্রম ও কষ্টের ইতিহাস জানা যায়,
  • নিজেকে সুসংগঠিত তালিবে ইলম হিসেবে গড়ে তোলা যায়।

কিতাবের তাআরুফ: কেন জরুরি?

একটি কিতাব হাতে নিলেই ছাত্রের উচিত জানা—

  • কোন বিষয়ে এই কিতাব রচিত হয়েছে,
  • মুসান্নিফের নাম,
  • মুসান্নিফের ওফাতের সাল,
  • কোন মাকতাবা থেকে প্রকাশিত হয়েছে,
  • কোন উস্তায বা মুহাক্কিক এটি তাহকীক করেছেন।
এই তাআরুফ ছাড়া ছাত্রের জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কেননা, কিতাবের পরিচয় জানা মানেই তার ভিতরের বিষয়বস্তু সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া।

ফিকহের কিছু কিতাব

ফিকহের দুনিয়া বিশাল। এখানে রয়েছে ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর আল-মাবসুত, ইমাম সারাখসীর আল-মাবসুত, কাসানীর বদায়েউস সানায়ে, ইবনে হাম্মামের ফাতহুল কাদীর, এবং আল্লামা মারগিনানীর আল-হিদায়া। প্রতিটি কিতাবের সাথে রয়েছে তাদের মুসান্নিফের ইতিহাস ও বিশাল অবদান।

উসুলুল ফিকহের কিতাব

উসুলুল ফিকহ হলো শরীয়তের মূল ভিত্তি বোঝার বিজ্ঞান। এখানে রয়েছে— আল-মুস্তাসফা (ইমাম গাজ্জালী), আল-মুহাসসাল (ফখরুদ্দীন রাজী), আল-মানার (নাসাফী), আল-তালবিস (আল আমিদী), এবং সহজতম কিতাব হিসেবে আল-ওয়াদিহ ফি উসুলুল ফিকহ। এসব কিতাবের মুতালাআ একজন ছাত্রকে শরীয়তের গভীর জ্ঞান অর্জনে সহায়তা করে।

তাফসিরের কিতাব

তাফসিরের জগতে রয়েছে ইমাম তাবারীর জামিউল বায়ান, ইমাম কুরতুবীর আল-জামি লি আহকামিল কুরআন, ইবনে কাসীরের তাফসিরুল কুরআনিল আজীম, এবং আল্লামা জালালুদ্দীনের তাফসিরে জালালাইন। এসব কিতাবের তাআরুফ জানা প্রতিটি তালেবে ইলমের জন্য অপরিহার্য।

হাদিস ও উলুমুল হাদিসের কিতাব

হাদিস হলো ইসলামের মূল উৎস। ইমাম বুখারীর সহীহুল বুখারী, ইমাম মুসলিমের সহীহ মুসলিম, ইমাম আবু দাউদের সুনান আবু দাউদ, নাসাঈ, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ ইত্যাদি গ্রন্থ মুসলিম উম্মাহর জন্য অমূল্য সম্পদ। উলুমুল হাদিসে রয়েছে ইবনে সালাহর মুকাদ্দিমাহ, ইমাম নওয়াবীর তাকরীব, ইবনে হাজারের নুখবাতুল ফিকর। এসব কিতাব ছাত্রদেরকে হাদিস বিজ্ঞানের মৌলিক ধারণা দেয়।

আকাবিরদের পরিশ্রম ও কষ্ট

আকাবির উলামায়ে কেরাম তাদের জীবন কাটিয়েছেন ইলমে দ্বীনের জন্য। তারা ভ্রমণ করেছেন হাজার হাজার মাইল, কষ্ট করেছেন পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে। ইমাম বুখারী এক হাদিস শুনতে মাসের পর মাস সফর করেছেন। ইমাম মালেক মদিনা শরীফে বসে বছরের পর বছর ছাত্রদের হাদিস শিক্ষা দিয়েছেন। এভাবে তারা অসংখ্য কিতাব লিখে গিয়েছেন, অসংখ্য ফনের ভিত্তি তৈরি করেছেন।

বর্তমানের তালেবে ইলমের অবস্থা

আজকের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক ছাত্র মুতালাআর প্রতি উদাসীন। তারা শুধু দরসের নোট মুখস্থ করে, অথচ কিতাব খুলে পড়তে চায় না। মাকতাবা (লাইব্রেরি)তে সময় কাটাতে আগ্রহী নয়। অথচ আকাবিররা দিন-রাত কিতাবের ভেতরে ডুবে থাকতেন। তারা মুতালাআকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিতেন।

তালেবে ইলম যদি মুতালাআ থেকে দূরে থাকে, তবে তার ইলম কখনো পরিপূর্ণ হবে না। সে উস্তাযের কথা শুনে কিছু শিখবে, কিন্তু কিতাবের সাথে বসে থাকলেই তার মন প্রশস্ত হবে, চিন্তা-চেতনা প্রসারিত হবে।

উপসংহার

কিতাব মুতালাআ ইলমের প্রাণ। আর কিতাবের তাআরুফ ইলমের সৌন্দর্য। একজন তালেবে ইলমের উচিত— বিভিন্ন ফনের কিতাব সম্পর্কে ধারণা রাখা, মুসান্নিফের নাম ও ইতিহাস জানা, কিতাবের তাহকীক ও প্রকাশকের খবর রাখা। এতে তার ইলমে গভীরতা আসবে, চিন্তা প্রসারিত হবে, এবং সে প্রকৃত তালিবে ইলম হিসেবে গড়ে উঠবে।

আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় কিতাব মুতালাআ করবো,
কিতাবের তাআরুফ জানবো,
আর আকাবিরদের মতো ইলমে দ্বীনের খেদমত করে জীবন সাজাবো।

দ্বীনি ইলম অর্জনের ক্ষেত্রে কিতাবের পরিচিতি (تعارف الكتب) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। কারণ তালিবে ইলম যদি বিভিন্ন ফনের কিতাব সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা না রাখে, তবে তার জ্ঞান অসম্পূর্ণ থেকে যায়। কিতাবের নাম, মুসান্নিফের নাম, ওফাত, কিতাবের বিষয়বস্তু, এবং কে কে তাহকীক করেছেন—এসব জানা একজন তালিবের জন্য আবশ্যক। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, অনেক তালিবে ইলম মাকতাবা মুতালাআ করতে চায় না। তারা শুধু পড়া শেষ করতেই ব্যস্ত, অথচ ইলমের প্রকৃত স্বাদ কিতাবের মুতালাআ আর কিতাবের পরিচিতি জানার মধ্যেই নিহিত।

ফিকহের কিতাবসমূহ

  • الهداية – মুসান্নিফ: المرغيناني (ওফাত: 593 হিজরি)
  • بدائع الصنائع – মুসান্নিফ: الكاساني (ওফাত: 587 হিজরি)
  • المبسوط – মুসান্নিফ: السرخسي (ওফাত: 483 হিজরি)
  • الاختيار لتعليل المختار – মুসান্নিফ: الموصلي (ওফাত: 683 হিজরি)

উসূলুল ফিকহের কিতাবসমূহ

  • أصول البزدوي – মুসান্নিফ: البزدوي (ওফাত: 482 হিজরি)
  • كشف الأسرار – মুসান্নিফ: البخاري (ওফাত: 730 হিজরি)
  • التوضيح – মুসান্নিফ: صدر الشريعة (ওফাত: 747 হিজরি)
  • نور الأنوار – মুসান্নিফ: الملا جيون (ওফাত: 1130 হিজরি)

তাফসীরের কিতাবসমূহ

  • تفسير الطبري – মুসান্নিফ: محمد بن جرير الطبري (ওফাত: 310 হিজরি)
  • تفسير القرطبي – মুসান্নিফ: القرطبي (ওফাত: 671 হিজরি)
  • تفسير ابن كثير – মুসান্নিফ: ابن كثير (ওফাত: 774 হিজরি)
  • الجلالين – মুসান্নিফ: جلال الدين المحلي (ওফাত: 864 হিজরি) ও جلال الدين السيوطي (ওফাত: 911 হিজরি)

হাদীসের কিতাবসমূহ

  • صحيح البخاري – মুসান্নিফ: الإمام البخاري (ওফাত: 256 হিজরি)
  • صحيح مسلم – মুসান্নিফ: الإمام مسلم (ওফাত: 261 হিজরি)
  • سنن أبي داود – মুসান্নিফ: أبو داود (ওফাত: 275 হিজরি)
  • جامع الترمذي – মুসান্নিফ: الترمذي (ওফাত: 279 হিজরি)

উলুমুল হাদীসের কিতাবসমূহ

  • مقدمة ابن الصلاح – মুসান্নিফ: ابن الصلاح (ওফাত: 643 হিজরি)
  • تدريب الراوي – মুসান্নিফ: السيوطي (ওফাত: 911 হিজরি)
  • فتح المغيث – মুসান্নিফ: السخاوي (ওফাত: 902 হিজরি)
  • نخبة الفكر – মুসান্নিফ: ابن حجر العسقلاني (ওফাত: 852 হিজরি)

শেষ কথা,,,

প্রতিটি তালিবে ইলমের জন্য আবশ্যক যে, সে বিভিন্ন ফনের কিতাবের নাম, মুসান্নিফ এবং তাদের ওফাত সম্পর্কে ধারণা রাখবে। এটি তার ইলমকে সমৃদ্ধ করবে এবং তাকে ইলমে দ্বীনের খেদমতে বেশি উপযোগী করে তুলবে। আজকের ছাত্ররা যদি মুতালাআর প্রতি আগ্রহী হয় এবং কিতাবের পরিচিতি জানার চেষ্টা করে, তবে তাদের জ্ঞান হবে দৃঢ় ও গভীর। অতএব, তালিবে ইলমের উচিত সর্বদা কিতাব পরিচিতি অর্জনে যত্নবান হওয়া।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি