ইমরানের বাবা ও তার স্মৃতিচারণ
ইমরানের বাবা ও তার স্মৃতিচারণ
বাবা — একটি শব্দ, অথচ এর ভেতরে লুকিয়ে আছে পাহাড়সম স্নেহ, ত্যাগ, দয়া আর অশেষ ভালোবাসা। পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের জন্য বাবা হলো সেই ছায়াময় বৃক্ষ, যার ছায়ায় সে শান্তি খুঁজে পায়, নিরাপত্তা অনুভব করে। বাবার মমতা হয়তো কথায় প্রকাশিত হয় না সব সময়, কিন্তু নিঃশব্দে তিনি সন্তানের জন্য নিজেকে উজাড় করে দেন।
আমার বন্ধু ইমরানের বাবা গতকাল আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। إنا لله وإنا إليه راجعون — নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য, এবং তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। এই সংবাদ যখন শুনলাম, তখন মনে হলো ইমরান যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অভিভাবকহীনতার যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে গেছে। চোখ ভিজে গেছে অশ্রুতে। কেবল সেই বুঝতে পারে, যার বাবা আর নেই।
বাবার ভালোবাসা
বাবার ভালোবাসা নিঃশব্দ হলেও সবচেয়ে গভীর। সন্তানের জন্য বাবা নিজের আরাম বিসর্জন দেন, নিজের ঘামের বিনিময়ে রুটি এনে সন্তানের হাতে তুলে দেন। ইমরান প্রায়ই বলত, তার বাবা ছোটবেলা থেকে তাকে কতো কষ্ট করে মানুষ করেছেন। ভোর হতে না হতেই কাজে চলে যেতেন, রাতে দেরিতে ফিরতেন। ঘামে ভেজা মুখ, ক্লান্ত শরীর, অথচ সন্তানের মুখে হাসি দেখলে তিনি সব ভুলে যেতেন।
বাবা হলো সেই ছায়া, যার আড়ালে সন্তান নিরাপদে থাকে। ঝড়-ঝাপটা, দুঃখ-কষ্ট—সবকিছু বাবা নিজের উপর নিয়ে নেন, কিন্তু সন্তানকে শান্তির আচ্ছাদনে রাখেন। ইমরান এখন সেই ছায়া হারিয়ে হাহাকার করছে।
স্মৃতির ভাণ্ডার
বাবা চলে যাওয়ার পর স্মৃতি যেন আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ছোটবেলায় হাত ধরে স্কুলে নিয়ে যাওয়া, পড়াশোনার সময় পাশে বসে থেকে উৎসাহ দেওয়া, নতুন জামা কিনে দেওয়া, বাজার থেকে ফল এনে দেওয়া—এসব স্মৃতি যেন একের পর এক এসে হৃদয় আঘাত করে। ইমরান বলছিল, যখনই সে বাড়ির কোন কোণায় তাকায়, তখনই বাবার মুখ ভেসে ওঠে।
বাবার সেই কোমল দৃষ্টি, মুখের হাসি, কণ্ঠের দৃঢ়তা—সবকিছুই যেন এখন অমূল্য স্মৃতির ভাণ্ডার। তিনি যখন থাকতেন, তখন হয়তো অনেককিছু স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু আজ তিনি নেই, তাই প্রতিটি স্মৃতি হৃদয়ের ভিতর ছুরির মত বিঁধে যাচ্ছে।
অশ্রু ও কষ্ট
বাবার মৃত্যুতে চোখ থেকে অশ্রু ঝরে পড়া স্বাভাবিক। ইমরান কাঁদছিল অবিরাম। সে বলছিল, তার মনে হচ্ছে যেন পৃথিবীটা হঠাৎ খালি হয়ে গেছে। অন্য কারো বাবা যখন তার সন্তানের হাত ধরে বাজারে যায়, অথবা সন্তানকে কোল জড়িয়ে ধরে—তখন তার বুকটা ফেটে যায়। মনে হয়, আহ! যদি আমার বাবাও বেঁচে থাকতেন।
দুনিয়ার জীবনের সত্য হলো মৃত্যু। প্রত্যেককে একদিন চলে যেতে হবে। কিন্তু বাবা হারানোর কষ্ট পৃথিবীর সবচেয়ে তীব্র কষ্টের মধ্যে একটি। বাবার কণ্ঠস্বর মনে পড়ে, ছোটবেলার দুষ্টুমি মনে পড়ে, বাবার পরিশ্রমের দিনগুলো মনে পড়ে—সবকিছুই যেন একে একে হৃদয়ের পর্দায় ভেসে ওঠে।
আল্লাহর প্রতি সমর্পণ
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِএই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বাবা হোক, মা হোক, সন্তান হোক—সবাইকে একদিন আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। ইমরানও বুঝে গেছে, তার বাবা আল্লাহর কাছে ফিরে গেছেন। এখন তার কর্তব্য হলো বাবার জন্য দোয়া করা, সওয়াবের কাজ করে তার রুহের ইসালে সওয়াব করা।
“প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।” (সূরা আল-ইমরান: ১৮৫)
শেষ অনুভূতি
স্মৃতিচারণ আসলে কখনো শেষ হয় না। বাবার মৃত্যু মানে কেবল একজন অভিভাবককে হারানো নয়, বরং জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তিকে হারানো। ইমরানের চোখের অশ্রু তার ভেতরের কষ্টের ভাষা প্রকাশ করছে। তার প্রতিটি স্মৃতি বাবাকে কেন্দ্র করে ঘুরপাক খাচ্ছে। ছোটবেলার গল্প, বাবার স্নেহ, শাসন, ভালোবাসা—সবকিছুই যেন তার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বাবারা আসলেই সন্তানের জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। তারা নিজের জীবনকে কষ্টের মাঝে রাখেন, সন্তানের জীবনকে সুখময় করার জন্য। যখন তারা চলে যান, তখন পৃথিবীটা যেন হঠাৎ শূন্য হয়ে যায়।
আল্লাহ তাআলা ইমরানের বাবাকে জান্নাতুল ফেরদাউসে উচ্চ মর্যাদা দান করুন।
আমীন।
Comments
Post a Comment