পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয়: একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব

 

পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয়: একটি নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 
 

আল্লাহ তায়ালা মানুষের জীবনকে সুন্দরভাবে চলমান রাখার জন্য অগণিত নিয়ামত দান করেছেন। পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস—এই তিনটি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য সম্পদ। এগুলো ছাড়া আজকের আধুনিক সভ্যতার কথা কল্পনাও করা যায় না। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আমরা প্রায়ই এই অমূল্য সম্পদগুলোর প্রতি অবহেলা করি এবং অযথা অপচয় করি। অথচ আমরা ভুলে যাই, এগুলো কেবল আমাদের একার নয়, বরং পুরো দেশের, পুরো জাতির সম্পদ। এর প্রতিটি ফোঁটা, প্রতিটি ইউনিট, প্রতিটি ঘনমিটার গ্যাসের হিসাব আমাদের দিতে হবে আল্লাহর কাছে।

পানি: জীবনের উৎস

পানি ছাড়া পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না। কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন— “আমি পানির মাধ্যমে সমস্ত জীবকে জীবিত করেছি।” (সূরা আম্বিয়া: ৩০)। অথচ আমরা পানি ব্যবহার করি এমনভাবে, যেন এটি শেষ হবার নয়। ওযু করার সময় ট্যাপ খোলা রেখে, বাসন ধোয়ার সময় অযথা পানি ঝরিয়ে, কিংবা দৈনন্দিন জীবনে অযাচিত ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা অপচয় করি। অথচ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওযুর সময় এমনকি প্রবাহমান নদীর তীরেও পানি অপচয় না করার নির্দেশ দিয়েছেন।

আমরা যদি এক মুহূর্ত চিন্তা করি, দেখি গ্রামে অনেক মানুষ আছেন যাদের বাড়িতে এখনো বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। গ্রীষ্মকালে অনেক এলাকা পানির সংকটে ভুগে। সুতরাং আমাদের প্রতিটি ফোঁটা পানির ব্যবহার হিসাবের সাথে হওয়া উচিত। অযথা পানির অপচয় মানে হলো নিজের ভাইয়ের অধিকার নষ্ট করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বঞ্চিত করা।

বিদ্যুৎ: আধুনিক সভ্যতার প্রাণশক্তি

বিদ্যুৎ আজ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিদ্যুৎ ছাড়া শিক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প, ব্যবসা—সবকিছুই থমকে যাবে। অথচ আমরা অযথা বাতি জ্বালিয়ে রাখি, অপ্রয়োজনীয়ভাবে পাখা ও এসি চালাই, চার্জার প্লাগে রেখে দিই। এভাবেই কোটি কোটি টাকা সমমূল্যের বিদ্যুৎ নষ্ট হয় প্রতিদিন। অথচ একদিকে গ্রামে এখনো অনেক মানুষ আছেন যারা বিদ্যুতের আলো পর্যন্ত পান না। শহরে আমরা যে অতিরিক্ত ভোগ করি, তার ফল ভোগ করে দেশের সেই দরিদ্র জনগণ।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সরকারকে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়, যার বড় অংশ আসে জনগণের করের অর্থ থেকে। কাজেই এই বিদ্যুৎ কেবল একটি সুবিধা নয়, এটি একটি আমানত। প্রতিটি ইউনিট ব্যবহারের সাথে জড়িয়ে আছে কোটি মানুষের পরিশ্রম ও দেশের অর্থনীতি। অযথা বিদ্যুৎ অপচয় মানে কেবল নিজের ক্ষতি নয়, বরং দেশের সম্পদের অপচয়।

গ্যাস: রান্না ও শিল্পের মূল শক্তি

বাংলাদেশের গৃহস্থালি জীবন হোক কিংবা শিল্পাঞ্চল—গ্যাস এক অপরিহার্য সম্পদ। কিন্তু আমাদের শহরাঞ্চলে আমরা অসচেতনভাবে গ্যাস অপচয় করি। রান্নার পরও চুলা খোলা রেখে দিই, লিকেজ মেরামত করি না, কিংবা হিটার-গিজার অপ্রয়োজনীয় সময় চালু রাখি। অথচ দেশের বহু অঞ্চলে এখনো মানুষ কাঠ বা মাটির চুলা ব্যবহার করে কষ্ট করছে।

গ্যাস হলো সীমিত সম্পদ। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে দেশের গ্যাসভাণ্ডার নিঃশেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তখন আমাদেরকে বহির্বিশ্ব থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনে আনতে হবে। তাই আজকের প্রতিটি অপচয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনতে পারে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ ও জবাবদিহি

ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, প্রতিটি নিয়ামত আল্লাহর দান এবং এগুলো ব্যবহার করার ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে ইরশাদ করেছেন— “নিশ্চয় অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সূরা ইসরা: ২৭)। তাই পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় করা শুধু অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি একটি ধর্মীয় অপরাধও। কিয়ামতের দিনে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে—কিভাবে আমরা আল্লাহর দেওয়া এই নিয়ামত ব্যবহার করেছি।

অতিরিক্ত ভোগের কারণে যখন অন্যরা বঞ্চিত হয়, তখন এটি তাদের হক নষ্ট করার শামিল। ইসলাম অনুযায়ী অন্যের হক নষ্ট করা একটি গুরুতর গুনাহ। সুতরাং সচেতনভাবে সম্পদের সাশ্রয় করা কেবল সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি ইবাদতেরও অংশ।

উপসংহার

পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস আমাদের জীবনের অপরিহার্য সম্পদ। এগুলো কেবল ভোগ করার বস্তু নয়, বরং এগুলো একটি জাতীয় আমানত। প্রতিটি অপচয়ের হিসাব দিতে হবে কেবল দেশের কাছে নয়, আল্লাহর কাছেও। তাই আমাদের উচিত সর্বোচ্চ সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে এগুলো ব্যবহার করা। অপচয় বন্ধ করে আমরা যেমন অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবো, তেমনি ধর্মীয়ভাবে সওয়াবের ভাগীদার হবো।

আসুন আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
এক ফোঁটা পানি, এক ইউনিট বিদ্যুৎ, এক মুহূর্তের গ্যাসও অযথা নষ্ট করবো না।
কারণ এগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদ, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার এবং আল্লাহর দেওয়া একটি বড় নিয়ামত।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি