মোবাইল ব্যবহারের সঠিকতা ও অপব্যবহার ইসলামের আলোকে
মোবাইল ব্যবহারের সঠিকতা ও অপব্যবহার ইসলামের আলোকে
প্রযুক্তির যুগে মোবাইল ফোন মানুষের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, দাওয়াহ—সব ক্ষেত্রেই মোবাইল অপরিহার্য। তবে এই মোবাইল ব্যবহারের দুটি দিক রয়েছে—একটি হলো কল্যাণকর ব্যবহার, আরেকটি হলো অপব্যবহার। আজকের সমাজে মোবাইল যেখানে প্রয়োজনীয় একটি উপকরণ, সেখানে এর মাধ্যমে অনেকেই নিজের জীবন ধ্বংস করছে। ইসলামের আলোকে মোবাইল ব্যবহারের সঠিক দিকনির্দেশনা জানা তাই অত্যন্ত জরুরি।
মোবাইল ব্যবহারের আসল উদ্দেশ্য
মোবাইল মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছে। দূরে থাকা মানুষের সাথে মুহূর্তেই যোগাযোগ করা, ব্যবসা-বাণিজ্যের তথ্য আদান-প্রদান, শিক্ষা গ্রহণ, চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া কিংবা ইলমি দাওয়াহ প্রচার করা— এসবই মোবাইল ব্যবহারের সঠিক উদ্দেশ্য। সুতরাং মোবাইলকে ব্যবহার করতে হবে প্রয়োজনের জন্য, অহেতুক সময় নষ্ট করার জন্য নয়।
ইসলাম আমাদের শিখিয়েছে, আল্লাহর দেওয়া প্রতিটি নিয়ামত সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। হাদিসে এসেছে— “কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের পা তার রবের সামনে থেকে সরবে না, যতক্ষণ না পাঁচটি বিষয়ে প্রশ্ন করা হবে— জীবন কিভাবে কাটিয়েছ, যৌবন কোথায় ব্যয় করেছ, সম্পদ কোথায় থেকে আয় করেছ, কোথায় ব্যয় করেছ এবং অর্জিত জ্ঞান অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছ।” (তিরমিজি শরীফ)। সুতরাং মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রেও প্রশ্ন হবে—আমরা কোথায় ব্যবহার করেছি এবং কতটুকু কল্যাণ অর্জন করেছি।
অপব্যবহার: গুনাহ ও ধ্বংসের কারণ
আজকের যুগে মোবাইলের সবচেয়ে বড় অপব্যবহার হলো ছবি, ভিডিও, মুভি, নাটক, গান ও খেলার মধ্যে সময় নষ্ট করা। মানুষ ঘন্টার পর ঘন্টা ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক, গেমস ও অশ্লীল কনটেন্টে সময় নষ্ট করে। অথচ এ সময় দিয়ে ইলম শেখা, কিতাব পড়া বা ইবাদতে ব্যয় করলে আখিরাতের পুঁজি জমা হতো।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন— “আর যারা অর্থহীন ও অনর্থক কাজে সময় নষ্ট করে না।” (সূরা মু’মিনুন: ৩)। নবী করিম ﷺ বলেছেন— “মানুষের ইসলামের সৌন্দর্যের একটি দিক হলো যে, সে তার জন্য অপ্রয়োজনীয় জিনিস ছেড়ে দেয়।” (তিরমিজি)। তাই নাটক, মুভি, গান, গেমস ও অশ্লীল ছবি দেখা শুধু সময়ের অপচয় নয়, এটি গুনাহেরও কারণ। এসবের মাধ্যমে দৃষ্টি নষ্ট হয়, অন্তরে গুনাহ জন্মায়, ইবাদতে অলসতা আসে এবং আখিরাতের জন্য ধ্বংস ডেকে আনে।
মোবাইল: আমানত নাকি ফিতনা?
ইসলাম মোবাইলকে সরাসরি নিষিদ্ধ করেনি। বরং এটি মানুষের হাতে আমানত হিসেবে এসেছে। যে সঠিকভাবে ব্যবহার করবে, সে উপকৃত হবে; আর যে অপব্যবহার করবে, সে ফিতনার শিকার হবে। যেমন—কুরআন তেলাওয়াত, হাদিস পড়া, ফিকহের কিতাব অধ্যয়ন, ইলমি দরস শোনা, দাওয়াহ প্রচার করা—এসব কাজে মোবাইল ব্যবহার করলে তা নেকির কাজ। আর যদি গান, নাটক, মুভি, খেলা ও অশ্লীলতায় ব্যবহার করা হয়, তবে তা গুনাহ।
আল্লাহ তায়ালা কুরআনে সতর্ক করে বলেছেন— “তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।” (সূরা নূর: ২১)। শয়তান মানুষকে মোবাইলের মাধ্যমে সময় নষ্টের ফাঁদে ফেলে দেয়। একবার নাটক, একবার গান, একবার ভিডিও—এভাবেই ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যায়, অথচ নামাজ, কুরআন, দোয়া, জিকির—সব কিছু অবহেলিত হয়। তাই সচেতন থাকতে হবে।
ইলম শিক্ষা ও কিতাবপাঠে মোবাইল
মোবাইলের অন্যতম কল্যাণকর ব্যবহার হলো ইলম অর্জন করা। বর্তমানে অসংখ্য ইসলামিক কিতাব, তাফসির, হাদিস, ফিকহ, ইতিহাসের গ্রন্থ মোবাইল অ্যাপ ও পিডিএফ আকারে সহজলভ্য। শিক্ষার্থীরা সহজেই দরসের কিতাব পড়তে পারে, নোট তৈরি করতে পারে, লেখালেখি জমা দিতে পারে এবং আলেমদের বয়ান শুনতে পারে।
একজন তালিবুল ইলম যদি মোবাইল ব্যবহার করে নিজের লেখা, মাকালা, গবেষণা কিংবা দাওয়াহ সংক্রান্ত কাজ সংরক্ষণ করে, তবে এটি জরুরত এবং ইলমি খেদমতের অন্তর্ভুক্ত। এভাবে মোবাইল ব্যবহার করলে আল্লাহর কাছে সওয়াবও পাওয়া যাবে। তবে সতর্ক থাকতে হবে যেন মোবাইল ব্যবহারে অহেতুক সময় নষ্ট না হয় এবং অপব্যবহার না ঘটে।
ইসলামী দৃষ্টিকোণে ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার
ইসলাম কখনোই প্রয়োজনীয় জিনিস ব্যবহারে বাধা দেয় না। তবে ইসলামের শিক্ষা হলো, প্রতিটি কাজে ভারসাম্য থাকতে হবে। মোবাইলের ক্ষেত্রেও তাই।
- শুধু প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করা।
- ইলম, দাওয়াহ ও কল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা।
- অশ্লীল ও গুনাহর কনটেন্ট থেকে দূরে থাকা।
- অতিরিক্ত সময় নষ্ট না করা।
- প্রতিদিন কিছু সময় কিতাব হাতে পড়া, যেন মোবাইল নির্ভরতা না বাড়ে।
ইসলাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছে—মধ্যপন্থা অবলম্বন করা। মোবাইলের সঠিক ব্যবহার আমাদের কল্যাণ বয়ে আনবে, আর অপব্যবহার ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন— “এভাবেই আমি তোমাদেরকে মধ্যপন্থী উম্মত বানিয়েছি।” (সূরা বাকারা: ১৪৩)।
উপসংহার
মোবাইল একটি প্রয়োজনীয় মাধ্যম, কিন্তু এটি কখনো জীবন নয়। আজ আমরা যদি মোবাইলকে শুধু বিনোদনের যন্ত্র মনে করি, তবে আমরা প্রতিদিনের অমূল্য সময় নষ্ট করছি এবং গুনাহের বোঝা বাড়াচ্ছি। অন্যদিকে, যদি মোবাইলকে ইলম শিক্ষা, দাওয়াহ, কিতাবপাঠ, লেখা জমা করা ও ইলমি খেদমতের কাজে ব্যবহার করি, তবে এটি আমাদের আখিরাতের পুঁজি হবে।
আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—
মোবাইল ব্যবহার করবো শুধু প্রয়োজন ও কল্যাণের জন্য।
গান, মুভি, নাটক, খেলা ও অশ্লীল জিনিস থেকে দূরে থাকবো।
আর মোবাইলকে বানাবো ইলম ও আমলের খেদমতের মাধ্যম।
এভাবেই মোবাইল হবে আমাদের জন্য নিয়ামত, গুনাহ ও ধ্বংস নয়।
Comments
Post a Comment