বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানের কর্তব্য
বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানের কর্তব্য
দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পর্কগুলোর একটি হলো বাবা ও সন্তানের সম্পর্ক। বাবা সন্তানের জীবনে এমন এক ছায়া, যার ত্যাগ, কষ্ট, ভালোবাসা এবং অনুগ্রহের তুলনা নেই। কিন্তু এক সময় আসে যখন এই দুনিয়ার অস্থায়ী জীবন শেষ হয় এবং প্রিয় বাবা চলে যান চিরস্থায়ী জীবনের পথে। তখন সন্তানের হৃদয়ে নেমে আসে অশ্রুভরা ঝড়। তবে সেই সময়ে শুধু কাঁদা নয়, বরং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং বাবার জন্য করণীয় কর্তব্য পালন করা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
১. ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর উপর ভরসা
প্রিয়জন হারানোর কষ্ট অপূরণীয়। বিশেষ করে বাবার মৃত্যু সন্তানের জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতা। তবে মুমিনের কর্তব্য হলো ধৈর্য ধারণ করা। কুরআনে আল্লাহ বলেন:
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ • الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ
“সবরকারীদের সুসংবাদ দাও, যারা বিপদে পড়লে বলে: আমরা তো আল্লাহরই এবং আমরা তাঁর দিকেই ফিরে যাব।” (সূরা বাকারা: ১৫৫-১৫৬)
তাই বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানের প্রথম কর্তব্য হলো ধৈর্য ধরা এবং এই বিশ্বাস রাখা যে আল্লাহ যা করেছেন তা হিকমতপূর্ণ।
২. দোয়া করা
একজন মৃত মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো দোয়া। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ
“মানুষ মারা গেলে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়, শুধু তিনটি জারি থাকে: চলমান সদকা, উপকারী ইলম, অথবা নেক সন্তান যে তার জন্য দোয়া করে।” (মুসলিম)
সুতরাং সন্তানের কর্তব্য হলো নিয়মিত বাবার জন্য দোয়া করা—নামাজের পর, তাহাজ্জুদের রাতে, রমজানের সময়, জুমার দিনে।
৩. নেক আমল পাঠানো
দোয়া ছাড়াও সন্তানের আরেকটি কর্তব্য হলো নেক আমল পাঠানো। যেমন—কুরআন তেলাওয়াত করে সওয়াব পাঠানো, সদকা করা, গরীবদের খাবার খাওয়ানো, পানির জন্য নলকূপ খনন করা ইত্যাদি। এভাবে বাবার জন্য সওয়াব পৌঁছে যায় এবং তিনি কবরেও উপকৃত হন।
৪. পিতা-মাতার স্বপ্ন পূরণ করা
বাবা জীবদ্দশায় সন্তানের জন্য অনেক স্বপ্ন দেখেন। তিনি চান তার সন্তান উত্তম মানুষ হোক, দ্বীনের পথে চলুক, মানুষের উপকার করুক। বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানের কর্তব্য হলো সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করার চেষ্টা করা। এতে বাবার আত্মা শান্তি পায়।
৫. বাবার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদের সাথে সুসম্পর্ক রাখা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ مِنْ أَبَرِّ الْبِرِّ صِلَةَ الرَّجُلِ أَهْلَ وُدِّ أَبِيهِ بَعْدَ أَنْ يُوَلِّيَ
“সর্বোত্তম সদাচার হলো, সন্তান তার বাবার মৃত্যুর পর তার বাবার বন্ধুদের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখে।” (মুসলিম)
তাই সন্তানের উচিত বাবার বন্ধুদের সম্মান করা, আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক রাখা। এতে বাবার ইজ্জত অক্ষুণ্ণ থাকে।
৬. পিতার ঋণ শোধ করা
বাবার যদি কারো কাছে ঋণ থেকে থাকে, তবে সেটি শোধ করা সন্তানের অন্যতম কর্তব্য। কারণ ঋণ পরিশোধ না হলে কিয়ামতের দিন কঠিন জবাবদিহি করতে হবে।
৭. পিতার অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করা
বাবার অনেক ইচ্ছা বা কাজ জীবদ্দশায় পূর্ণ না-ও হতে পারে। যেমন—কোনো মসজিদ নির্মাণ, দীনী খেদমত বা কারো সহায়তা করা। সন্তানের উচিত সেই অসমাপ্ত কাজগুলো পূরণ করার চেষ্টা করা।
৮. বাবার জন্য কবর জিয়ারত
কবর জিয়ারত করা সুন্নত। কবর জিয়ারতের মাধ্যমে সন্তানের মনে আখিরাতের কথা জাগ্রত হয় এবং সে বাবার জন্য দোয়া করে। রাসূল ﷺ বলেছেন: زوروا القبور فإنها تذكركم الموت — “কবর জিয়ারত করো, কারণ এটি তোমাদের মৃত্যুর কথা মনে করিয়ে দেয়।” (আবু দাউদ)
৯. নেক সন্তান হওয়া
সন্তানের জীবনের প্রতিটি উত্তম কাজ বাবার জন্যও সওয়াবের কারণ। তাই বাবা মারা যাওয়ার পরও সন্তান যখন নেক পথে থাকে, ইলমে দ্বীন অর্জন করে, সমাজে সৎকাজ করে, তখন বাবার জন্য সওয়াব পৌঁছাতে থাকে।
১০. উপসংহার
বাবা মারা যাওয়ার পর সন্তানের কর্তব্য সীমাহীন। কেবল অশ্রু ঝরানো নয়, বরং বাস্তবিকভাবে এমন কাজ করতে হবে, যা বাবার রূহকে শান্তি দেবে। দোয়া, নেক আমল, সদকা, বাবার স্বপ্ন পূরণ, আত্মীয়-স্বজনকে ভালোবাসা—এসবই সন্তানের দায়িত্ব। বাবার ত্যাগ আর ভালোবাসার প্রতিদান দুনিয়ায় কখনোই শোধ করা যায় না, তবে তার জন্য নিয়মিত দোয়া ও নেক আমলই একমাত্র উপায়। আল্লাহ তাআলা সকল বাবাকে ক্ষমা করুন, তাদের কবর প্রশস্ত করুন এবং জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।
Comments
Post a Comment