বৃহস্পতিবারের মধুর আসর

 

বৃহস্পতিবারের মধুর আসর

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 
 

বৃহস্পতিবার আমাদের জীবনে এক বিশেষ রঙ নিয়ে আসে। সারা সপ্তাহ জুড়ে কঠিন পড়াশোনা, ক্লাস, হোমওয়ার্ক আর অধ্যয়নের চাপের মধ্যে যখন আমরা দিন কাটাই, তখন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মন একটু মুক্তি খোঁজে। সেই মুক্তিই আমরা পাই আড্ডায়, হাসিতে, গান-গজলে। যেন পড়াশোনার ভার কমে যায় এবং হৃদয় জুড়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। বৃহস্পতিবার তাই আমাদের কাছে শুধুই একটি দিন নয়, বরং এটি আনন্দ ও সম্পর্কের বন্ধনকে দৃঢ় করার একটি মাধ্যম।

বৃহস্পতিবারের রাতের আড্ডা সাধারণত জমে ওঠে বন্ধুদের নিয়ে। তখন আমরা একে অপরের সান্নিধ্যে হারিয়ে যাই। কথার ঝড় তোলে সবাই, কেউ মজার গল্প বলে, কেউ আবার শোনায় জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতা। তবে সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত আসে যখন গজলের আসর বসে। তখন মনে হয় যেন পুরো পরিবেশটা এক অপূর্ব মায়াবী আবহে ভরে গেছে।

গজল মানেই হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত এক ধরনের শিল্প। আমাদের মাঝে গজলের আসর যখন শুরু হয়, তখন প্রত্যেকের দৃষ্টি চলে যায় সেই শিল্পীর দিকে, যিনি কণ্ঠে সুর তোলে। আমাদের প্রিয় ভাই আবু হানিফ ভাই যেন জন্মগতভাবে একজন শিল্পী। তাঁর কণ্ঠে যখন গজলের সুর বেজে ওঠে, তখন মনে হয় হৃদয়ের সব ক্লান্তি মুছে যায়। তাঁর কণ্ঠ এত মধুর, এত প্রাণভরা যে, চোখ বন্ধ করলেই যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে যাওয়া যায়।

সেই বৃহস্পতিবার রাতে যখন আমরা সবাই মিলে গজলের আসর জমিয়েছিলাম, মনে হচ্ছিল আমরা আর ছাত্র নই, আমরা যেন এক সাহিত্য সভার অতিথি। আবু হানিফ ভাই একের পর এক গজল গাইছিলেন, আর আমরা সবাই তন্ময় হয়ে শুনছিলাম। কারো চোখে অশ্রু, কারো ঠোঁটে মৃদু হাসি— এমন বৈচিত্র্যময় প্রতিক্রিয়া ছিল, যা হৃদয় ছুঁয়ে যায়। তাঁর গানে ছিল না কেবল শব্দ, ছিল অনুভূতি; ছিল আবেগ, যা হৃদয়কে আন্দোলিত করেছিল।

আড্ডার পরিবেশে গজল যেন অন্য রকম এক মাধুর্য এনে দেয়। আমরা যে আসরে বসেছিলাম, সেখানে হাসি, আনন্দ, আবেগ—সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী চিত্র এঁকে দিয়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে সেই মুহূর্তগুলো কাটানো মানে শুধুই আনন্দ নয়, বরং জীবনের এক অমূল্য স্মৃতি। কারণ এগুলোই আমাদের মনে থেকে যাবে সারাজীবন, ক্লান্তি ভরা জীবনে আমাদের অনুপ্রেরণা জোগাবে।

বৃহস্পতিবারের সেই আসর আমাদের শিখিয়েছে—মানুষের জীবনে শুধু দুঃখ-কষ্ট নয়, আনন্দও প্রয়োজন। আনন্দের মুহূর্ত হৃদয়কে সতেজ করে, সম্পর্ককে দৃঢ় করে, আর জীবনের ভারসাম্য রক্ষা করে। যদি কেবল পড়াশোনা নিয়েই ডুবে থাকি, তবে জীবন একঘেয়ে হয়ে যাবে। আর যদি আনন্দকেও জীবন থেকে বাদ দিই, তবে হৃদয়ের শক্তি কমে যাবে। তাই আনন্দের জন্য এই ছোট ছোট আসরগুলো অপরিহার্য।

আবু হানিফ ভাইয়ের কণ্ঠে গজল শুনতে শুনতে আমরা উপলব্ধি করলাম, শিল্প আসলে শুধু সুর নয়, শিল্প হলো হৃদয়ের ভাষা। তাঁর কণ্ঠে যখন সেই সুর ভেসে আসছিল, তখন মনে হচ্ছিল—আমাদের ভেতরের সব দুঃখ কেটে যাচ্ছে। আমাদের মন ভরে যাচ্ছে আনন্দে। সত্যিই, সেই মুহূর্ত ছিল আমাদের জন্য এক অনন্য উপহার।

বৃহস্পতিবার তাই আমাদের জীবনে আনন্দের প্রতীক। বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সেই মধুর সময়, গজলের মায়াবী আবহ, আর আবু হানিফ ভাইয়ের কণ্ঠস্বর আজও আমাদের হৃদয়ে রয়ে গেছে এক সুন্দর স্মৃতি হয়ে। আল্লাহ যেন এ বন্ধন অটুট রাখেন এবং আমাদেরকে আরো অনেক আনন্দঘন মুহূর্ত দান করেন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি