ইলমের গভীরতা ও কিতাব মুতালায় মনোযোগ
ইলমের গভীরতা ও কিতাব মুতালায় মনোযোগ
দ্বীনের ইলম এমন এক সম্পদ যা মানুষের অন্তরকে প্রশান্তি দেয়, আখেরাতের পথ আলোকিত করে এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দেয়। ইলমের গভীরতা অর্জনের জন্য কিতাব মুতালাআ অপরিহার্য। কেবল ক্লাসে শুনে থাকা যথেষ্ট নয়, বরং মুতালাআর মাধ্যমে জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয় এবং ছাত্রের মধ্যে ইস্তিনবাত ও ইস্তিদলালের ক্ষমতা জন্ম নেয়। আকাবীর উলামায়ে কেরাম এই পথে আমাদের জন্য উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। তাদের কঠোর মেহনত, ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের ফলেই আমরা আজ অসংখ্য কিতাবের ভাণ্ডার পেয়েছি।
কিতাব মুতালাআর গুরুত্ব
ইলমে অগ্রসর হতে হলে অবশ্যই প্রতিটি ছাত্রকে কিতাবের সাথে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। মুতালাআ মানুষকে কিতাবের ভেতরের সূক্ষ্মতা বোঝায়, নতুন নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করে এবং জবাব খুঁজতে উদ্বুদ্ধ করে। যেসব আকাবীর ইলমের আকাশে নক্ষত্র হয়ে আভা ছড়িয়েছেন, তারা কেউই মুতালাআ ছাড়া বড় হতে পারেননি। কিতাব মুতালাআ হলো ইলমের প্রাণ।
আকাবীরদের চারটি বড় ঘটনা
আকাবীর উলামাদের জীবনীতে অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এখানে আমরা চারটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আলোচনা করবো, যা প্রমাণ করে তারা ইলম অর্জনের জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন।
১. ইমাম আবু হানিফা رحمه الله
ইমাম আবু হানিফা (رحمه الله) রাতের অধিকাংশ সময় কিতাব মুতালাআ ও ইবাদতে কাটাতেন। তিনি কুফার বাজারে কাপড়ের ব্যবসা করতেন, কিন্তু ব্যবসার সময়ও তার মনে ইলম ঘুরপাক খেত। তিনি রাতের পর রাত জেগে ফিকহের মাসআলা লিখতেন ও গবেষণা করতেন। তার ছাত্ররা বলেছেন, তিনি কখনো মুতালাআ ছাড়া রাত কাটাননি। তার ইলমের ফলস্বরূপ তিনি الفقه الأكبر, المسند সহ অসংখ্য কিতাব রেখে গেছেন।
২. ইমাম বুখারী رحمه الله
ইমাম বুখারী (رحمه الله) এর মুতালাআ ও তাদকীক এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি এক লক্ষেরও বেশি হাদীস মুখস্থ করেছিলেন। তার প্রসিদ্ধ কিতাব الجامع الصحيح (সহীহ বুখারী) তিনি ষোল বছরের পরিশ্রমের পর রচনা করেন। হাদীসের সনদ যাচাই করতে তিনি কখনো কখনো শত শত মাইল ভ্রমণ করেছেন। একটি ঘটনার বর্ণনা আছে যে, তিনি রাতে ঘুম থেকে উঠে চল্লিশবার পর্যন্ত প্রদীপ জ্বালাতেন শুধুমাত্র ইলহাম হওয়া একটি হাদীসের ইবারত লিখে রাখার জন্য।
৩. ইমাম নববী رحمه الله
ইমাম নববী (رحمه الله) এর জীবনের একটি বড় ঘটনা হলো—তিনি দিনে বারোটি ভিন্ন ভিন্ন দরসে অংশ নিতেন। এরপর বাড়ি ফিরে প্রত্যেক দরসের কিতাব মুতালাআ করতেন এবং পুনরায় লিখতেন। তার ইলমে গভীরতার ফলস্বরূপ তিনি رياض الصالحين, الأربعون النووية, এবং شرح صحيح مسلم এর মতো কালজয়ী কিতাব রচনা করেছেন। মৃত্যুর আগে মাত্র ৪৫ বছর বেঁচে থেকেও তিনি উম্মাহকে অসাধারণ ইলমের ধনভাণ্ডার দিয়ে গেছেন।
৪. শাহ ولي الله دهلوي رحمه الله
শাহ ولي الله دهلوي (رحمه الله) উপমহাদেশে ইলমের পুনর্জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি আরব ও হিজাজ সফর করেন কিতাব মুতালাআ ও ইলম অর্জনের জন্য। তিনি ৫০টিরও বেশি কিতাব রচনা করেন। এর মধ্যে حجة الله البالغة তার শ্রেষ্ঠ রচনাগুলির একটি। এখানে তিনি ইসলামের প্রতিটি আমলের হিকমত ব্যাখ্যা করেছেন। তার এই মেহনতের ফলে ইলমে দ্বীন উপমহাদেশে নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।
বড় বড় খণ্ডে কিতাব রচনা
আকাবীর উলামায়ে কেরাম শুধু ছোট রিসালা লেখেননি; বরং বহু খণ্ডে বিস্তৃত মহাকাব্যসম কিতাবও রচনা করেছেন। যেমন:
- تفسير الطبري – ইমাম তাবারী (رحمه الله) রচিত তাফসীর, বহু খণ্ডে সংকলিত।
- فتح الباري – ইমাম ইবন হাজার আসকালানী (رحمه الله) এর সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যা, ১৩ খণ্ড।
- المبسوط – ইমাম সারাখসী (رحمه الله) এর ফিকহ শাস্ত্রের এক অনন্য কিতাব, বহু খণ্ড।
- التمهيد – ইমাম ইবন আবদিল বার (رحمه الله) এর হাদীস ও ফিকহ সমন্বিত কিতাব।
এসব কিতাব আজও মাদারিস ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য এবং গবেষণার মূল উৎস। এগুলো প্রমাণ করে আকাবীররা ইলমের জন্য কী পরিমাণ সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন।
উপসংহার
ইলমের গভীরতা অর্জন কেবল দারসের মাধ্যমে সম্ভব নয়; বরং মুতালাআ, মেহনত ও ধৈর্যের মাধ্যমেই তা অর্জন করা যায়। আকাবীর উলামাদের জীবনের ঘটনাগুলো আমাদের শিখায়— কষ্ট ও পরিশ্রম ছাড়া ইলমের বরকত লাভ করা যায় না। তারা যে বিশাল বিশাল কিতাব রচনা করে গেছেন, তা আমাদের জন্য পথনির্দেশক ও প্রেরণা। আজকের তালিবুল ইলম যদি সত্যিকার অর্থে ইলমে গভীরতা অর্জন করতে চায়, তবে তাকে অবশ্যই কিতাব মুতালাআয় মনোযোগী হতে হবে এবং আকাবীরদের মতোই মেহনত ও ধৈর্যের পথ অবলম্বন করতে হবে।
Comments
Post a Comment