ইলমে দ্বীনের গুরুত্ব ও ফজীলত

 

ইলমে দ্বীনের গুরুত্ব ও ফজীলত

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 
 

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনে বহু স্থানে জ্ঞান ও হিকমতের কথা উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইলমকে এমন মর্যাদা দিয়েছেন যে, এর তুলনা অন্য কোনো কিছুর সাথে করা যায় না। দ্বীনের ইলম হল সেই আলো, যা অন্ধকার থেকে মুক্তি দেয়। আল্লাহর পরিচয়, নবী-রাসূলের সীরাত, ইবাদত-বন্দেগি, লেনদেন, আখলাক—সব কিছুর সঠিক দিশা পাওয়া যায় এই ইলমের মাধ্যমে।

ইলমে দ্বীনের গুরুত্ব

ইলমে দ্বীন ছাড়া কোনো মুসলিম পূর্ণাঙ্গ মুসলিম হতে পারে না। কারণ, ইলমই বলে দেয় কোনটা ফরয, কোনটা হারাম, কোনটা মাকরূহ, আর কোনটা মুস্তাহাব। ইলমই মানুষকে জানায়, সঠিক পথে চললে জান্নাত এবং ভুল পথে চললে জাহান্নাম।

রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেনঃ “যে ব্যক্তি জ্ঞান অর্জনের জন্য কোনো পথে বের হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন।” (মুসলিম)

আকাবিরদের মেহনত

আমাদের পূর্বসূরী ওলামায়ে কেরামরা এই ইলম অর্জনের জন্য অকল্পনীয় কষ্ট করেছেন। তারা রাত-দিন মেহনত করেছেন, ক্ষুধা-তৃষ্ণা সহ্য করেছেন, পাহাড়-পর্বত পাড়ি দিয়েছেন, শুধু ইলম সংগ্রহের জন্য।

পাঁচটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা

  1. ইমাম বুখারী (রহ.) ইলম সংগ্রহের জন্য হাজারো মাইল ভ্রমণ করেছেন। এক একটি হাদীস যাচাই করার জন্য কখনো মাসের পর মাস ভ্রমণ করেছেন। তিনি অসংখ্য মুসনদ, মুসান্নাফ ও হাদীসের ইলম সংরক্ষণ করেছেন।
  2. ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) এক হাদীসের জন্য বাগদাদ থেকে ইয়ামান পর্যন্ত সফর করেছেন। জীবনের বড় অংশ ভ্রমণ ও কষ্টে কাটিয়েছেন। এমনকি জেল-জুলুমও সহ্য করেছেন।
  3. ইমাম আবু হানিফা (রহ.) সারা জীবন ইলমে ফিকহের ভিত্তি গড়তে মেহনত করেছেন। অসংখ্য মাসআলা নির্ণয় করেছেন, এবং হাজারো ছাত্র তৈরি করেছেন, যাদের মাধ্যমে ফিকহের আলো সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে গেছে।
  4. ইমাম নববী (রহ.) দিন-রাত ঘুম ভুলে ইলম অর্জন করেছেন। অল্প জীবনে এমন কিতাব রেখে গিয়েছেন, যা কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানরা পড়বে—যেমন "রিয়াজুস সালেহীন" ও "আল-মিনহাজ"।
  5. ইমাম শাফেয়ী (রহ.) ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধা নিয়ে কুরআন হিফয করেছেন। তারপর উস্তাদদের কাছে ফিকহ ও হাদীস শিখে এক অনন্য মুজতাহিদ ইমাম হয়েছেন।

তাদের কিতাবসমূহ

আকাবিররা শুধু মৌখিক শিক্ষা দেননি, বরং হাজারো কিতাব লিখে গিয়েছেন। প্রতিটি বিষয়ে, প্রতিটি ফন-এ, তারা ইলমকে সংরক্ষণ করেছেন।

বিভিন্ন বিষয়ে তাদের অবদান

  • উলুমুল হাদীস: সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুন্নানে আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদ আহমাদ।
  • ফিকহ: আল-মাবসূত, হেদায়া, মুখতারুল ফতাওয়া, আল-উম্ম।
  • আকীদা: আল-আকীদাতুত তাহাউইয়্যা, আল-ইবানাহ।
  • তাফসীর: তাফসীরে তাবারী, তাফসীরে কুরতুবী, তাফসীরে ইবনে কাসীর, জালালাইন।
  • মানতেক ও ফালসাফা: আকল ও লজিক নিয়ে বহু কিতাব।
  • আদব ও সাহিত্য: ইমাম জাহিজের কিতাব, ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’।

ইলমে দ্বীনের ফজীলত

দ্বীনের ইলম অর্জনকারী ব্যক্তি ফেরেশতাদের দোয়া পান, মাছ-পাখি তার জন্য মাগফিরাত চায়। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে উঁচু মর্যাদা দান করবেন। দ্বীনের ইলম মানুষকে দুনিয়ার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোর পথে নিয়ে যায়।

শেষ কথা,,

ইলমে দ্বীন মুসলিম উম্মাহর মূল শক্তি। আকাবিররা আমাদের জন্য অসীম কষ্ট করেছেন, কিতাব লিখে গিয়েছেন, রাত জেগে ইলম সংরক্ষণ করেছেন। আজ আমাদের দায়িত্ব—সেই ইলমকে আঁকড়ে ধরা, তা শেখা এবং মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া। যারা ইলম অর্জন করবে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে সম্মানিত হবে।

— মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি