নিজের জীবনকে সুন্দর করা ও যোগ্যতা অর্জন

 নিজের জীবনকে সুন্দর করা ও যোগ্যতা অর্জন

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান দিক হল তার নিজেকে গড়ে তোলা এবং জীবনকে সুন্দর করা। জীবনের সৌন্দর্য (beauty) আসে কেবল ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক জিনিস দিয়ে নয়। বরং আসে নিজের মন, চরিত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং নৈতিক মানদণ্ড দিয়ে।

প্রথমে, নিজের জীবনকে সুন্দর করার অর্থ হলো নিজের মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে গুছিয়ে তোলা। একজন মানুষ যদি তার দৈনন্দিন কাজ, সময় ব্যবহার এবং আচরণ ঠিকঠাক ভাবে পরিচালনা করতে শিখে, তাহলে তার জীবন স্বাভাবিকভাবেই সুন্দর হয়ে ওঠে।

একজন শিক্ষার্থী যদি প্রতিদিন নিয়মিত পড়াশোনা করে, নিজের দক্ষতা (skills) বাড়ায় এবং নিজের সময়কে সঠিকভাবে ব্যবহার করে, সে একদিন সফল হবে। যেমন, সকাল বেলার সময়কে কাজে লাগানো, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা—এগুলো ছোট ছোট কাজ কিন্তু জীবনের মান উন্নয়নে অনেক বড় ভূমিকা রাখে।


যোগ্যতা অর্জন মানে শুধুই পড়াশোনা বা চাকরির জন্য প্রস্তুতি নয়। এটি মানে হলো নিজের মনের শক্তি, ধৈর্য, মনোবল এবং চরিত্র গঠন করা। যোগ্যতা অর্জন করার জন্য একজন মানুষকে শিখতে হবে নতুন কিছু, চেষ্টা করতে হবে নতুন দক্ষতা, এবং ব্যর্থতাকে মানিয়ে নিতে হবে।


যারা জীবনে যোগ্য হতে চায়, তারা জানে যে সময় নষ্ট করা = জীবন নষ্ট করা। তাই তারা প্রতিদিন নিজের জন্য কিছু সময় আলাদা করে রাখে। তারা বই পড়ে, অনলাইন কোর্স করে, বিভিন্ন কাজে হাত বাড়ায় এবং নিজের অভিজ্ঞতা বাড়ায়। এই অভ্যাসই একজনকে শক্তিশালী ও যোগ্য মানুষ বানায়।


নিজেকে গুছিয়ে তোলা মানে হলো নিজের আচরণ, চিন্তাভাবনা এবং লক্ষ্যকে এক দিকনির্দেশে নিয়ে যাওয়া। উদাহরণস্বরূপ, একজন যদি প্রতিদিন সকালে উঠে নিজেকে প্রস্তুত করে, দিনের জন্য পরিকল্পনা করে এবং নিজেকে ইতিবাচক (positive) রাখে, তার মনশক্তি বৃদ্ধি পায়। আর ইতিবাচক মনশক্তিই জীবনকে সুন্দর করে।


সুন্দর জীবন তৈরি করতে মানসিক প্রশান্তি (peace of mind) খুব জরুরি। যদি আমরা নিজের মনের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে পারি, তাহলে আমাদের জীবন সুখকর হবে। এজন্য প্রয়োজন ধ্যান, দোয়া, বা শুধু নিজের মধ্যে শৃঙ্খলা (discipline) গড়ে তোলা।


নিজেকে সুন্দর এবং যোগ্য করতে আমাদের সৎ কাজের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সৎ কাজ মানে হলো মানুষের প্রতি সদয় আচরণ, নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখা, এবং অন্যের জন্য কিছু করা। যখন আমরা অন্যকে সাহায্য করি, আমাদের হৃদয় আনন্দ অনুভব করে। এই আনন্দই জীবনের সৌন্দর্য।


একজন ব্যক্তি যখন নিজের জীবনকে সুন্দর এবং যোগ্য করে তোলে, সে শুধুই নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও মূল্যবান হয়ে ওঠে। মানুষ যে সমাজে থাকে, সেই সমাজে তার আচরণ, শিক্ষার মান এবং যোগ্যতা দ্বারা প্রভাব ফেলে। সমাজে প্রশংসিত ব্যক্তি হওয়ার জন্য দরকার নিয়মিত শিক্ষা, ভালো চরিত্র, এবং সদয় আচরণ।


পরিকল্পনা (Planning) একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। জীবনকে সুন্দর করার জন্য আমাদের প্রতিদিন কিছু সময় নিজের লক্ষ্য নির্ধারণে ব্যয় করতে হবে। লক্ষ্য স্থির করে আমরা জানি কোন পথে আমাদের এগোতে হবে। লক্ষ্য ছাড়া জীবন অনেক সময় অগোছালো ও বিভ্রান্তিমূলক হয়।


নিজেকে গুছিয়ে তোলা মানে নিজের আবেগ ও অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণ করা। মানুষ প্রায়ই ক্ষিপ্ত হয়ে, হতাশ হয়ে বা ঈর্ষা থেকে ভুল সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু যোগ্য মানুষ জানে, ধৈর্য ও শান্ত মনই সঠিক সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি। তাই নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে কাজ করা একজনকে জীবন সুন্দর করতে সাহায্য করে।


যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত চর্চা (practice)। যেমন একজন ছাত্র যদি প্রতিদিন নতুন বিষয় পড়ে এবং সমস্যা সমাধান করে, সে বুদ্ধি ও দক্ষতা অর্জন করবে। একজন কর্মী যদি নিজের কাজের প্রতি যত্নশীল হয়, সে দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াবে। নিয়মিত চর্চা আমাদের অভ্যস্ততা গড়ে তোলে এবং জীবনকে সহজ ও সুন্দর করে।


একজন সফল ব্যক্তি জানে, জীবনের সবকিছু একসাথে সম্ভব নয়, তাই তাকে প্রথমে অগ্রাধিকার (priority) নির্ধারণ করতে হয়। কোন কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি অপেক্ষা করতে পারে, এই বোঝা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একবার অগ্রাধিকার ঠিকভাবে নির্ধারণ করলে, জীবন সহজ হয় এবং মন শান্ত থাকে।


সুন্দর জীবন এবং যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন সময় ব্যবস্থাপনা। প্রতিটি মিনিট মূল্যবান। অনিশ্চিত বা অপ্রয়োজনীয় কাজে সময় নষ্ট করলে জীবন অগোছালো হয়ে যায়। তাই প্রতিদিনের কাজের তালিকা (to-do list) তৈরি করা এবং সেই অনুযায়ী কাজ করা একজনকে সফল করে।


অবশেষে, জীবনকে সুন্দর করার মূল চাবিকাঠি হলো আত্মশৃঙ্খলা (self-discipline)। যখন আমরা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখি, সময়মতো কাজ করি, সৎ ও সদয় আচরণ করি, তখন আমাদের জীবন প্রকৃত অর্থে সুন্দর হয়। আমাদের মন শান্ত থাকে, সম্পর্ক ভালো থাকে, এবং আমরা সমাজে যোগ্য ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃত হই।


উপসংহার:

নিজের জীবন সুন্দর করা ও যোগ্যতা অর্জন করা সহজ কাজ নয়। তবে ধৈর্য, নিয়মিত চর্চা, সৎ কাজ, সময় ব্যবস্থাপনা, আত্মশৃঙ্খলা এবং ইতিবাচক চিন্তা নিয়ে আমরা জীবনের সৌন্দর্য এবং পূর্ণতা আনতে পারি। একজন যোগ্য ও সুন্দর জীবন যাপনকারী মানুষ শুধুই নিজের জন্য নয়, সমাজের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস। নিজের জীবনকে গুছিয়ে তোলা মানে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী সুন্দর, শিক্ষিত, যোগ্য এবং নৈতিকভাবে সঠিক জীবনযাপন করা।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি