একটি রাতের সফর, একটি নসীহতের ধারা
একটি রাতের সফর, একটি নসীহতের ধারা
মুহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
রাতের গভীরে, যখন আকাশের তারা একে একে চোখ টিপে জানিয়ে দিচ্ছে তাদের জাগ্রত উপস্থিতি, আমি embark করলাম এক অসাধারণ সফরে। গন্তব্য—নারায়ণগঞ্জ। কিন্তু এই সফরটি শুধু একটি স্থানান্তর ছিল না; বরং এটি হয়ে উঠেছিল আত্মার জাগরণ, অন্তরের আলো এবং হৃদয়ের গভীর এক উপলব্ধির প্রতিচ্ছবি।
মামুন বাস—নামটি শুনেই মনে দ্বিধা
বীরগঞ্জ থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার সময় যখন বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছালাম, তখনই সামনে এল একটি বাস যার গায়ে লেখা—“মামুন বাস”। প্রথমেই মনে মনে দ্বিধা জাগল—এই বাসটা কি লোকাল ধরনের? কেমন সার্ভিস হবে? ভেতরে উঠে কি আবার হিন্দি গান বা বেসুরো চিৎকারে ভরে যাবে বাসটা?
তবে আল্লাহ তাআলার কুদরতের কী অপার প্রকাশ! বাসে উঠেই চোখ খুলে গেল বিস্ময়ে। এত ঝকঝকে, গোছানো এবং পরিপাটি পরিবেশ আমার কল্পনার অনেক উপরে ছিল। আসনগুলো আরামদায়ক, বাতাস চলাচলের সুব্যবস্থা, এবং পুরো বাস জুড়ে এক ধরনের শৃঙ্খলার সুবাস—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা।
যার গতি, তার গুণও অসাধারণ
বাসের গতি দেখে আমি রীতিমতো চমকে গেলাম। এত দ্রুত এবং সুনিপুণ গতিতে বাস ছুটছে, অথচ কোনো আতঙ্ক, কোনো বিশৃঙ্খলা বা ঝাঁকুনি নেই। আমাদের ড্রাইভার ভাই ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, বিচক্ষণ এবং মনোযোগী। তার ড্রাইভিংয়ে যেন একধরনের শিল্প ছিল—শুধু রাস্তা নয়, বরং যাত্রীদের নিরাপত্তা ও শান্তি যেন তার চালনায় অগ্রাধিকার পায়।
আরো বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, তিনি শুধু দক্ষ ড্রাইভারই নন, বরং একজন ধর্মভীরু, বিনয়ী ও হাস্যোজ্জ্বল মানুষ। সারারাত তিনি কোনো যাত্রীর সঙ্গে রূঢ়ভাবে কথা বলেননি, বরং প্রতিটি কথায় ছিল অদ্ভুত সৌজন্য ও কোমলতা।
যেখানে গান নয়, বাজে ওয়াজের সুমিষ্ট সুর
বেশিরভাগ দূরপাল্লার বাসে যে চিত্রটা প্রায় দেখা যায়, তা হলো উচ্চস্বরে বাজছে বেহুদা গান, অশ্লীল সিনেমা বা ভিডিও ক্লিপ। অথচ এই মামুন বাসে, সব কিছুকে ছাপিয়ে বাজছিল এক আশ্চর্য পবিত্র সুর—আমাদের শ্রদ্ধেয় শায়েখ মিজানুর রহমান আজহারী হাফিযাহুল্লাহ-এর মূল্যবান বয়ান।
"যেখানে অন্য বাসে অশ্লীলতা ছড়ায়, সেখানে এই বাসে ছড়িয়েছে নসীহতের সুবাতাস।"
সারারাত চলেছে তার বয়ান। আমি এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করতে পারিনি। মন ছিল মোহিত, আত্মা ছিল জেগে। যেন সেই কথাগুলো কেবল আমার জন্যই বলা হচ্ছে। একেকটি শব্দে ছিল হেদায়েত, একেকটি বাক্যে ছিল জ্ঞানের দীপ্তি।
আজহারী হুজুরের বয়ানের প্রভাব
আজহারী হুজুরের বয়ানের অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, তিনি শুধু বক্তৃতা দেন না—তিনি শিক্ষা দেন। তিনি শব্দে শব্দে ফুটিয়ে তোলেন কুরআনের আলো, সুন্নাহর আহ্বান। তার কথায় পাওয়া যায় আকল, হিকমাহ ও হৃদয় ছোঁয়া আবেদন।
অন্যান্য অনেক বক্তার ওয়াজ হয়তো আবেগতাড়িত, উচ্চকণ্ঠ বা শৈল্পিকভাবে উপস্থাপিত হলেও, আজহারী হুজুরের বয়ানে থাকে তাহক্বীক, থাকে আলেমানাহ। তার বয়ান মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, অন্তরের রোগ চিহ্নিত করে এবং জীবন পরিবর্তনের উপায় বাতলে দেয়।
একটি বাস, একটি দাওয়াহ
মনে মনে ভাবলাম—এটা তো কেবল একটি বাস নয়, বরং এক চলমান দাওয়াহ কেন্দ্র। বাসের প্রতিটি যাত্রী যেন অনিচ্ছায় হলেও এমন এক আলোয় জড়িয়ে পড়েছেন যা তাদের অন্তরকে নাড়া দিতে বাধ্য। কেউ ঘুমোতে পারল না, কিন্তু কেউ বিরক্তও হল না। সবাই নীরবে শুনছিল সেই অমূল্য নসীহত।
এই এক রাতে অন্তত একটিবার হলেও কেউ গুনাহ থেকে ফিরে আসার চিন্তা করেছে—এটাই বা কম কিসে? এমন একটি মহান উদ্যোগ শুধু বাহ্যিক পরিবেশ বদলায় না, বরং বদলায় হৃদয়ের অভ্যন্তরীণ অবস্থা।
দোয়া, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার অশ্রু
আমি চোখের জল ফেলতে ফেলতে আল্লাহর কাছে হাত তুললাম। আমি এই বাসের মালিকের জন্য, ড্রাইভারের জন্য, সুপারভাইজারের জন্য এবং হেলপার ভাইদের জন্য প্রাণভরে দোয়া করলাম।
“হে আল্লাহ! এই বাসের মালিককে তুমি দ্বীনের খেদমতের জন্য কবুল করে নাও। তার রিজিকে বরকত দাও, তার সন্তানদের হিদায়েত দাও, তার পরিবারকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও।”
তাদের এই ছোট্ট কর্ম কিন্তু বড় কাজ। কোনো গান বা ফালতু কিছু না বাজিয়ে, যাত্রীদের গুনাহ থেকে দূরে রেখে, একজনও যদি আল্লাহর দিকে ফিরে আসে—তাহলেই তো সেই সওয়াবের স্রোত চলতে থাকবে কিয়ামত পর্যন্ত।
শেষ কথা—একটি রাত, এক জীবনবদল
আমি জানি না আমার লেখাটি সবাই কিভাবে নেবে। কারো কারো কাছে হয়তো এটাই সাধারণ ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে এই রাতের বাসযাত্রা এক অনন্য জাগরণের নাম। একটি রাত, একটি বাস, একটি বয়ান—আর তাতেই বদলে যেতে পারে একজন মুমিনের দুনিয়া ও আখিরাত।
সবাই তো শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য, আরামদায়ক আসন বা AC খোঁজে। কিন্তু আমি খুঁজছিলাম আত্মিক প্রশান্তি—আর সেটা পেয়েছি মামুন বাসে। সেই রাত্রির কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।
আল্লাহ এই বাস কর্তৃপক্ষকে কবুল করুন। তারা যেন আরও বেশি মানুষের হিদায়াতের মাধ্যম হয়। তাদের এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা যেন সওয়াবের সোনালি পাহাড়ে পরিণত হয়। এবং এমন উদাহরণ দেখে আরও বাসমালিকরা যেন উদ্বুদ্ধ হন, নিজেদের পরিবেশ গুনাহের পরিবর্তে হিদায়তের দিকে ফিরিয়ে নেন।
— মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
Comments
Post a Comment