মাহদি ভাইয়ের দই — একটি কৃতজ্ঞতার গল্প
মাহদি ভাইয়ের দই — একটি কৃতজ্ঞতার গল্প
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
আলহামদুলিল্লাহ, মাহদি ভাই আমার জন্য বাড়ি থেকে নিজ হাতে দই বানিয়ে এনেছেন — এবং সেই এক টুকরা দই, এক কদম কলা নয়; তা আমার হৃদয়ে আজও মধুর এক সুর জাগায়।
শুক্রবারটি যেন ক্লাস-রুটিনের সাধারণ এক দিনই ছিল — তুমি-আমি, আমরা সকলেই আমাদের গতানুগতিক ব্যস্ততার মধ্যে ভাসছিলাম। প্রথম সাময়িক পরীক্ষার বিরতি শেষে ঢিলেঢালা মন নিয়ে আমি ক্লাসে ফিরেছিলাম; ক্লাসরুমে রোদ-ছায়ার খেলা, খাতা-কলমের মৃদু শব্দ — অনেক কিছুই আগের মতই। কিন্তু মাহদি ভাই এসেছেন তার হাত বুলো করে দই ও কলার টুকরা নিয়ে — এমন সরল, নিঃসন্দেহ ও নিঃস্বার্থ উপহার।
দইটি ছিল কেবল একটি খাবার নয়; তা ছিল দয়া, ছিল আত্মীয়তার নিদর্শন, ছিল মানবিকতার সরল ভাষা। বাটি খুলতেই ছাই-সাদা দই, তার ওপর হালকা কণার মতো ঘনত্ব — যে অনুভূতি ঠোঁটের কাছে আসতেই ও মিষ্টি খামেরা জাগে, তাতে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। কলাগুলো সোনালি, টেকসই, ঠিক দেখলেই বোঝা যায় স্নেহের হাত থেকে বাছাই করা।
আমরা দুজনে — আমি আর তিনি — তারপরে আমার রুটিনের সিটে বসে দই ও কলা খেতে লাগলাম। কোন রকম ভয়-অনুতাপ নেই, কোন ভিকটিম-মুখ নেই; ছিলো নিছক আনন্দ ও কথাবার্তার সরলতা। কেবল খাওয়া নয়, সেই মুহূর্তে আমাদের কথাবার্তা ছিল সম্মিলিত স্মৃতি ও সমব্যথা, পরীক্ষার ক্লান্তি দূর করার এক কোমল আলাপ।
তুমি জানো, মানুষের ছোট্ট কিছুকিছুই বড় অনুপ্রেরণার কারণ হয়ে ওঠে। এক বাটি দই, এক টুকরো কলা — এগুলো সম্মিলিতভাবে যে মনের স্নেহটুকু প্রকাশ করে, তাতে আমার অন্তর লুব্ধ হয়ে ওঠে। মাহদি ভাই এসব করেছেন কোনো প্রলোভনহীন হৃদয় থেকে — কোন স্বার্থ নেই, শুধু ভাই-মহব্বত, সহানুভূতি এবং আদেশে ইলম অনুশীলনের বহিঃপ্রকাশ।
এইরকম ছোটো দানগুলোই মানুষকে মন্দ থেকে রক্ষা করে, সম্পর্ককে মজবুত করে এবং হৃদয়ের বন্ধনকে দৃঢ় করে।
আমি বারবার বলেছি — শুকরিয়া আদায় করে শেষ করা যায় না। বাতের বদৌলতে এভাবে কেউ নিজের হাতে তৈরি করে খাওয়াবে — সেটি যে কত বড় ত্যাগ ও পরোপকার তা বুঝতে পারা সহজ নয়। মাহদি ভাইের এই উদ্যোগ আমার কাছে কেবল খিদে নিবারণকেই পূরণ করেনি; বরং আমাকেও মনে করিয়েছে, দয়ালুতা কাকে বলে, কেমন করে আমরা অন্যের প্রতি সোহরদ রাখি।
তার দান-দয়া, তার অনুপ্রেরণায় আমি একটি শক্ত দৃষ্টি পেলাম: জীবনের ক্ষুদ্র আনন্দগুলোই আসলে সবচেয়ে বড় বরকত বয়ে আনে। পচন-শোকা লক্ষ্যের প্রশান্তিতে নয়; বরং মানুষের হাতে মানুষের জন্য করুণার কৃপায় জীবনী গড়ে ওঠে।
আমার হৃদয়ে এক ধরনের কৃতজ্ঞতা জেগে যায় — কৃতজ্ঞতা মাহদি ভাইয়ের প্রতি, তাঁর পরিবারে, তাঁর প্রতি দোয়া-প্রার্থনা। আমি প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাআলা তাঁর হাতে বরকত দিন, তাঁর জীবনে সহজ জীবন দান করুন, তাঁর পরিবারকে সুখ-স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধিতে রাখুন। কোনো কদর্যতা নেই — শুধু এক নিশ্ছিদ্র আশা যে পার্থিব দায়িত্বের মাঝেও তিনি সন্তুষ্টি ও শান্তি খুঁজে পাবেন।
শুকরিয়া আদায়ের ভাষা কখনোই কুসুমিত নয়; তা এক ধনী অন্তরের প্রকাশ। আমি বুঝতে পারি, মাহদি ভাই যে কষ্ট করে বাড়ি থেকে দই তৈরী করে এনেছেন — সময়, শ্রম, আন্তরিকতা— সবই দিয়েছেন তিনি। সেই নিঃস্বার্থ পরিশ্রম সারা দিনের ক্লান্তির মাঝেও আমাদের কাছে বিশেষ স্নেহের বার্তা পৌঁছে দিল।
আমরা যখন দই খেতে শুরু করলাম, কথার স্বর কমে গেল; কিন্তু চোখের মধ্যে বন্ধুত্ব আরও গভীর হল। দইয়ের মৃদু টকটকে স্বাদ, কলার সুধা— সেগুলো কেবল খাদ্য নন; মনে হল যেন সেটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি ছোট্ বারকত। খাদ্যের বাইরে ছিল কথাবার্তা—আগামী পরীক্ষার ব্যাপারে পরিকল্পনা, বাড়ির খোঁজখবর, হাসি-মজার স্মৃতি—সব মিশে গেলো নিয়ে একটি সহৃদয় সন্ধ্যা তৈরি করল।
আমার এই মুহূর্তগুলো কখনো ভোলা যাবে না। কারণ বন্ধু এমন ছোট্ট কিছু করলে তাতে জীবনে অদৃশ্যভাবে বড় প্রভাব পড়ে। সে যে শুধু আমাদের পেট ভরিয়েছে না, সে আমাদের হৃদয়কেও উষ্ণ করেছে।
এক মুহূর্তে মনে পড়ে যায়—এমন মানুষ থাকতে পারলেই সমাজটা বাঁচে। আমাদের চারপাশে যে জীবনচর্যা চলেছে, সেখানে যদি প্রত্যেকে একটু করে দয়া দেখায়, তাহলে সমাজের মোড় বদলে যাবে। মাহদি ভাইয়ের ঘটনাই এক জীবন্ত উদাহরণ যে কিভাবে ছোট্ট উদ্যোগগুলো বড় ফল বয়ে আনে।
শেষ করছি একটি দোয়া দিয়ে—“হে রব! মাহদি ভাইকে তাঁর নেক কর্মের জন্য পুরস্কার দাও; তার কৃতকর্ম ও মহানুভবতা কবুল করো; তার পরিবারকে সুখ ও শান্তিতে রাখো; তার জীবন ও কাজের মধ্যে বরকত দাও।”
Comments
Post a Comment