বিরতিতে এলাকায় কীভাবে মেহনত করব

 বিরতিতে এলাকায় কীভাবে মেহনত করব

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইলমের পথে চালিত করেছেন। মাদ্রাসার ব্যস্ত সময় শেষে যখন বিরতি আসে, তখন সেটি কেবল বিশ্রামের সুযোগ নয় বরং এলাকার মানুষের মধ্যে দীনের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য একটি বিশেষ মওকা। তালেবে ইলমের জন্য বিরতির সময় হলো ইলমি মেহনতের বাস্তব প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময়।

কুরআন-হাদীসের আলোকে মেহনতের গুরুত্ব

আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿وَمَنْ أَحْسَنُ قَوْلًا مِمَّنْ دَعَا إِلَى اللَّهِ وَعَمِلَ صَالِحًا وَقَالَ إِنَّنِي مِنَ الْمُسْلِمِينَ﴾
“সে ব্যক্তির কথা আর কার চেয়ে উত্তম হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানায়, সৎকাজ করে এবং বলে আমি মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা ফুসসিলাত: ৩৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً»
“আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।” (বুখারী)

এ থেকে স্পষ্ট যে বিরতিকে শুধু বিশ্রামের সময় না ভেবে, দাওয়াত ও মেহনতের মাধ্যমে উম্মতের উপকারে লাগানো জরুরি।

বিরতিতে মেহনতের উদ্দেশ্য

  • নিজেকে দাওয়াতের বাস্তব প্রশিক্ষণে অভ্যস্ত করা
  • এলাকার মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা
  • মসজিদকেন্দ্রিক পরিবেশ গড়ে তোলা
  • শিশু ও যুবকদের মধ্যে দ্বীনের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা
  • নিজের ইলমকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা

ধাপে ধাপে মেহনতের পরিকল্পনা

১. এলাকার অবস্থা বোঝা

প্রথমেই এলাকায় মানুষের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কে নামাজ পড়ে, কারা নামাজে গাফেল, কারা কুরআন পড়তে জানে না—এসব নোট করতে হবে। এটি রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ। তিনি যখন মদিনায় গেলেন তখন প্রথমেই মানুষের অবস্থা বুঝে নিলেন এবং মসজিদে নববীকে কেন্দ্র করে দ্বীনি পরিবেশ গড়ে তুললেন।

২. মসজিদকেন্দ্রিক কাজ

মসজিদ হলো ইসলামের প্রাণকেন্দ্র। তাই বিরতিতে মেহনতের প্রথম কাজ হবে মসজিদকে জীবন্ত করা।

  • পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে পড়া
  • নামাজের পরে ছোট ছোট বয়ান করা
  • মসজিদে কুরআন তিলাওয়াতের হালকা মাহফিল
  • শিশুদের জন্য নামাজ শিক্ষা ক্লাস

৩. দাওয়াতি সফর

বিরতিতে আকাবিরগণ যেমন করতেন তেমনিভাবে বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাওয়াত দেয়া উচিত। মাওলানা ইলিয়াস কান্ধলভী (রহ.) বলতেন:

“দাওয়াত হলো দ্বীনের পুনর্জীবন।”

তিন জনের ছোট জামাত করে এলাকায় সফর করা যেতে পারে। উদ্দেশ্য হবে মানুষের অন্তরে দ্বীনের ফিকির সৃষ্টি করা।

৪. যুবকদের সাথে বিশেষ সম্পর্ক

এলাকার যুবকদের দ্বীনের দিকে আনার জন্য ক্রীড়া, বই পড়া, দ্বীনি আলোচনা ইত্যাদির মাধ্যমে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারণ যুবকরাই আগামী দিনের নেতৃত্ব দিবে।

৫. মেহনতের সময়সূচি

বিরতিতে মেহনতের জন্য একটি সুন্দর রুটিন প্রয়োজন:

  • ফজর থেকে সূর্যোদয়: কুরআন তিলাওয়াত এবং দাওয়াতি মশওয়ারা
  • সকাল ৯টা: মসজিদে শিশুদের জন্য কুরআন ক্লাস
  • দুপুর: নামাজের পরে সংক্ষিপ্ত বয়ান
  • আসর থেকে মাগরিব: বাড়ি বাড়ি দাওয়াতি সফর
  • মাগরিব থেকে ইশা: হালকা মেহফিল বা তালিম
  • ইশার পর: যুবকদের সাথে আলোচনা ও সম্পর্ক উন্নয়ন

আকাবিরদের দৃষ্টান্ত

হযরত মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)

তিনি জামাতে জামাতে সফর করতেন। বিরতিতে ছাত্রদের তিনি এলাকায় পাঠাতেন যাতে তারা বাস্তবে দাওয়াতি প্রশিক্ষণ নিতে পারে।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)

তিনি বলতেন: “বিরতির সময়কে অবহেলা করা মানে নিজের ইলমের শক্তিকে দুর্বল করে ফেলা।”

মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)

তিনি ছাত্রদের বলতেন: “যেখানে যাও, দ্বীনের আলো ছড়িয়ে দাও। এমনকি একটি কথা হলেও পৌঁছে দাও।”

বাস্তবিক মেহনতের পদ্ধতি

  • শিশুদের জন্য কুরআন শিক্ষা
  • নামাজ শিক্ষা ক্লাস
  • বাড়ি বাড়ি সফর
  • যুবকদের সাথে খেলাধুলার মাধ্যমে সম্পর্ক এবং দ্বীনি দাওয়াত
  • মসজিদে কিতাব পাঠ ও তালিম
  • পরিবারভিত্তিক মজলিস

মেহনতের সময় করণীয় ও বর্জনীয়

করণীয়

  • আদবের সাথে কথা বলা
  • প্রথমে নিজের আমল ঠিক করা
  • মসজিদকে কেন্দ্র বানানো
  • নিয়মিত রুটিন তৈরি করা

বর্জনীয়

  • অতিরিক্ত বিতর্কে না জড়ানো
  • রাজনীতি বা বিভাজনমূলক বিষয় এড়িয়ে চলা
  • কাউকে ছোট না করা

মোটকথা,,,,

বিরতিতে এলাকায় মেহনত করা তালেবে ইলমদের জন্য একটি মহা সুযোগ। যারা এই সময়কে দাওয়াত ও ইলমের পরিবেশ তৈরিতে ব্যবহার করে, তারা নিজেদের চরিত্র ও নেতৃত্বকে বাস্তব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গড়ে তোলে। আকাবিরদের পথ অনুসরণ করলে ইনশাআল্লাহ এই মেহনতের মাধ্যমে সমাজে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে পড়বে।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে বিরতিকে সর্বোত্তমভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দিন এবং দ্বীনের দাওয়াতের প্রকৃত মেহনতের সাহস ও শক্তি দিন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি