গল্প ২: ওহীর চিঠি

  গল্প ২: ওহীর চিঠি

 পরিভাষা: أنواع الوحي

রংপুরের এক গাঁয়ে সাহেববাড়ির ইমাম সাহেব ছিলেন মাওলানা মুকিম। তিনি একদিন হুজরায় ছাত্রদের নিয়ে বসে আছেন। হঠাৎ ডাক পড়লো এক চিঠির। খুলে দেখলেন এক কিশোর লিখেছে, “হুজুর, কুরআন কীভাবে আল্লাহর কাছে থেকে রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কাছে পৌঁছেছে? এটা কি সরাসরি শব্দ, না কি স্বপ্নে, না কি কোনো ফেরেশতা নিয়ে এসেছে? আমি ফিকহ শিখতে চাই, কিন্তু বুঝতে পারছি না—এই ওহীর পদ্ধতি জানাটাই কি উসূলের ভিত নয়?”

ইমাম মুকিম তখন চশমা পরে বললেন, “এই প্রশ্নই হচ্ছে أنواع الوحي। আর এই প্রশ্নের উত্তর না জানলে তুমি ফিকহে পা দিতে পারবে না।”

 মূল আলোচনা:

  • وحي মানে: গোপনে, দ্রুতভাবে কোনো বার্তা পৌঁছানো।
  • الوحي কুরআনের উৎস, এবং এটি বিভিন্ন পদ্ধতিতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কাছে পৌঁছেছে।
  • وحي-এর প্রকারভেদ:
    • ১. وحي جلي: প্রত্যক্ষ শব্দ ও উচ্চারণ সহ ওহী (আল-কুরআন)।
    • ২. وحي خفي: হাদীস, ইলহাম, স্বপ্ন ইত্যাদি।
    • ৩. وحي بواسطة جبريل: জিবরাঈল (আ.)–এর মাধ্যমে কুরআন নাযিল হওয়া।
    • ৪. وحي في المنام: নবী ﷺ-এর ঘুমে দেখানো স্বপ্ন।
    • ৫. الإلهام: অন্তর্দৃষ্টি ও অনুপ্রেরণা যা নবীগণ পেতেন।

 মূল উৎস ও দলিল:

وَمَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُكَلِّمَهُ اللَّهُ إِلَّا وَحْيًا أَوْ مِنْ وَرَاءِ حِجَابٍ أَوْ يُرْسِلَ رَسُولًا – الشورى: ٥١

অর্থ: “কোনো মানুষের পক্ষে আল্লাহর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব নয়, কিন্তু ওহীর মাধ্যমে, পর্দার আড়াল থেকে, অথবা কোনো রসূল পাঠিয়ে।”

সূত্র: الإتقان في علوم القرآن, ج ١, ص ٣٧, الإمام جلال الدين السيوطي, دار الفكر

 ১০টি মাসআলা ও তাতে উসূলের প্রয়োগ:

১. কুরআন ছাড়া হাদীস কি দলিল?
✦ ওহীর প্রকারভেদ অনুযায়ী হাদীস وحي خفي হওয়ায় তা শরয়ি দলিল।
২. নবীর স্বপ্ন দলিল কি না?
وحي المنام — রাসূল ﷺ-এর স্বপ্ন ওহী; যেমন কুরবানীর হুকুম। (সূরা সফফাত: 102)
৩. সাহাবাদের ইলহাম কি শরয়ি দলিল?
✦ না। ইলহাম উম্মতের জন্য حجت নয়, কারণ তা وحي নয়।
৪. জিবরাঈলের আগমন ব্যতীত কুরআন কি নাযিল হয়নি?
✦ কুরআনের প্রতিটি আয়াত وحي جلي এবং জিবরাঈলের মাধ্যমেই এসেছে।
৫. রাসূল ﷺ নিজে কোনো আয়াত বানান কি?
✦ না। কারণ وما ينطق عن الهوى (নجم: ৩) — তিনি যা বলেন, তা ওহী।
৬. হাদীসে যেসব কথা এসেছে, সেগুলো কি শব্দসহ ওহী?
✦ না। তা অর্থ সহ ওহী। শব্দগুলো রাসূল ﷺ নিজে বলেছেন।
৭. কুরআনের ভাষা কি জিবরাঈল বদল করতে পারতেন?
✦ না। কারণ কুরআন بلفظه ومعناه আল্লাহর।
৮. ওহী যখন নাযিল হতো, নবী ﷺ কি কষ্ট পেতেন?
✦ হ্যাঁ। হাদীসে আছে, তিনি ঘেমে যেতেন, কখনো উট বসে যেত। (বুখারী, হাদীস ٢)
৯. ওহী বন্ধ হওয়ার পর যে কেউ ওহী দাবি করলে?
✦ সে মিথ্যাবাদী ও কাফের। ওহী খাতাম হয়েছে।
১০. ওহী কি এখনো হয়?
✦ না। নবুওতের সাথেই ওহী শেষ। এখন কেবল إلهام বা ফিরাসাত হতে পারে, তা দলিল নয়।

 সারসংক্ষেপ:

  •  কুরআন ওহীর সর্বোচ্চ রূপ, وحي جلي
  •  রাসূল ﷺ এর স্বপ্নও ওহী, কিন্তু উম্মতের নয়।
  •  হাদীস অর্থসহ ওহী, শব্দ রাসূলের নিজের।
  •  উসূলুল ফিকহে ওহীর ধরন জানলে হুকুম নির্ধারণ সহজ হয়।

✍️ লেখক: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি