আশুরার শিক্ষা: এক তরুণের জাগরণ

 আশুরার শিক্ষা: এক তরুণের জাগরণ

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

বসন্তের হালকা বাতাসে দুলছে গাছের পাতা। আশুরার দিনের সকালে ঘুম ভেঙে যায় জুবায়েরের। একুশ বছরের এই তরুণ এতদিন আশুরার গুরুত্ব সম্পর্কে জানলেও, কখনো হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেনি। কিন্তু এই বছর সবকিছু যেন অন্যরকম। আজ ১০ই মুহাররম। সকালেই সে ওযু করে নামাজ পড়ে মায়ের সামনে বসে। মা বললেন, “বাবা, আজ শুধু রোযা রাখলেই হবে না। আশুরার ইতিহাসটা একবার মনে মনে ঝালাই করো।”

পুরনো ভুলের গ্লানি

জুবায়ের মনে পড়ে গেল তার কিশোর বয়সের আশুরা উদযাপনগুলো। ছেলেবেলায় পাড়ায় মাতম হতো, কেউ কেউ শোকের মিছিল বের করত। তখন সেও বন্ধুদের সঙ্গে হইহুল্লোড়ে ব্যস্ত থাকত। আজ বুঝতে পারে, ওসব কিছুই রাসূল ﷺ এর শিক্ষা নয়। আজ সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে—বাকি জীবন আর এসব কাজ করবে না।

এক অজানা মানুষ

মসজিদে যায় জুবায়ের। ইমাম সাহেব আজ খুব অনুপ্রেরণাদায়ক আলোচনা করছেন। তিনি বললেন: “রাসূল ﷺ বলেছিলেন, ‘এই দিনে মূসা আলাইহিসসালামকে আল্লাহ তাআলা ফেরাঊনের হাত থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।’ এই দিনটি আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের দিন।” জুবায়ের গভীরভাবে শুনে যাচ্ছিল। নামাজ শেষে মসজিদের কোণায় এক বৃদ্ধ চুপ করে বসেছিলেন। জুবায়ের তাঁর পাশে গিয়ে বসল।

বৃদ্ধ লোকটি বললেন, “তুমি কি জানো, আশুরা কেবল কান্নার দিন নয়; এটি আত্মশুদ্ধির দিন, নফসকে জয় করার দিন। আমি একদিন মাতম করতাম, এখন কান্না করি নিজের গুনাহের জন্য।”

এই কথা যেন জুবায়েরের হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দিল। তার নিজের ভেতরেই যেন এক আলো জ্বলে উঠল।

পিতা ও পুত্রের কথোপকথন

বাড়ি ফিরে এসে সে বাবার কাছে বসল। বাবা বললেন, “জুবায়ের, কারবালা শুধু ট্র্যাজেডি নয়। সেটা ছিল সত্যের পথে অবিচল থাকার প্রতীক। হুসাইন (রাঃ) তাঁর জীবন দিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য।”

জুবায়ের জিজ্ঞেস করল, “তাহলে বাবা, আমাদের জন্য আশুরার শিক্ষা কী?”

বাবা বললেন, “আমাদের শিক্ষা হলো—সত্যকে গ্রহণ করা, অন্যায়কে ঘৃণা করা, বিদআত থেকে বাঁচা এবং এই দিনে বেশি বেশি ইবাদত করা। সাহাবায়ে কেরাম এই দিনে রোযা রাখতেন, দান করতেন এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করতেন।”

একটি অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন

জুবায়ের এবার নিজ ঘরে এসে ‘আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া’ কিতাব খুলে পড়তে শুরু করে। হযরত হুসাইন (রাঃ)-এর কুফার পথে যাত্রা, ইয়াজিদের চক্রান্ত, সাহাবিদের নিরবতা—সবই যেন তার চোখে জল এনে দেয়। তখন সে সিদ্ধান্ত নেয়:

  • সত্যকে কখনো গোপন করবে না।
  • বিদআত ও অন্ধঅনুকরণ থেকে দূরে থাকবে।
  • আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা রাখবে কিন্তু গোমরাহদের মতো নয়।
  • আশুরার দিন দোয়া, ইস্তিগফার, সালাত ও সদকার মাধ্যমে অতিবাহিত করবে।

আত্মশুদ্ধির এক রাত

রাত গভীর হয়। সে তাহাজ্জুদের জন্য উঠে দাঁড়ায়। অশ্রুসিক্ত চোখে সে বলছে, “হে আল্লাহ! হুসাইন (রাঃ)-এর ত্যাগ যেন আমার অন্তরে প্রেরণা জোগায়। আমি যেন ইসলামকে বুঝে পালন করতে পারি। আমি যেন কুরআনের আলোয় চলতে পারি।”

এইভাবে এক আশুরা, এক তরুণের জীবনকে বদলে দিল। সে কেবল রোযা রাখেনি, বরং আত্মাকে রোযা রেখেছে—পাপ থেকে, বিদআত থেকে, আলস্য ও অজ্ঞতা থেকে।

শেষ কথা,,,

আশুরা শুধু ইতিহাস নয়, তা শিক্ষা ও হিদায়াতের মিনার। সেই মিনার দেখে আমরা যেন নিজের পথ খুঁজে পাই। জুবায়েরের মতো আমরাও যেন বলতে পারি—“এই আশুরায় আমি বদলে গেছি।”

✍️ লিখেছেন: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি