দশই মহরম: গুরুত্ব, ইতিহাস, বেদআত ও ফজিলত

 দশই মহরম: গুরুত্ব, ইতিহাস, বেদআত ও ফজিলত

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

আমি মুহররমের ২ তারিখ থেকে এই ব্যাপারে লম্বা অধ্যয়ন ও মুতালাআ শুরু করেছি। পবিত্র মাস মুহররম ও বিশেষত দশই মুহররম নিয়ে আমার বহুদিনের ইচ্ছা ছিল কিছু লেখালেখি করার। কিন্তু গত বছর পর্যন্ত আমি যথেষ্ট সময় ও সুযোগ পায়নি। এই বছর আমি নিয়ত করেছি দশই মহররম সম্পর্কে বিস্তারিত পড়াশোনা করব এবং ফজিলত, ইতিহাস, বেদআত ও প্রথা নিয়ে সঠিক ও গভীর জ্ঞান অর্জন করব।

মুহররম মাস নিয়ে বিভিন্ন বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি প্রচলিত রয়েছে সমাজে। অনেক কিছুই আমার মনে সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল যে আসলেই এগুলো বাড়াবাড়ি নাকি বৈধ এবং ছেড়ে দেওয়া যায় নাকি। অধ্যয়নের মাধ্যমে আমি দেখেছি সত্য অনেকটাই ভিন্ন। অনেক খুঁটিনাটি তথ্য, দলিল ও সূত্রের আলোকে আমি বুঝতে পেরেছি সমাজের মধ্যে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা ও বেদআত রয়েছে যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর পরিপন্থী। এই আলোচনায় আমি বিশদে তা তুলে ধরব।

পাঠ্যকিতাবসমূহ এবং মুসান্নিফ ও প্রকাশকের নামসহ উল্লেখ

আমি নিম্নোক্ত কিতাবসমূহ থেকে বিষয়টি মুতালাআ করেছি এবং আলোচনা তৈরির জন্য গ্রহণযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করেছি:

  • তাফসীর ইবন কাসীর (تفسير ابن كثير) - মুসান্নিফ: ইবন কাসীর - প্রকাশক: دار إحياء التراث العربي, কায়রো। (খন্ড নাম্বার ১, পৃষ্ঠা ১৫০-১৭৫)
  • সীরাতুন নবী ﷺ - ইবনিশারিয়াহ (السيرة النبوية لابن هشام) - মুসান্নিফ: ইবনে হিশাম - প্রকাশক: دار الكتب العلمية, রিয়াদ। (খন্ড নাম্বার ২, পৃষ্ঠা ৪৫০-৪৭৫)
  • আল-আদাব আল-মুফরাদ (الأدب المفرد) - মুসান্নিফ: ইমাম বুখারী - প্রকাশক: دار الفكر, বৈরুত। (পৃষ্ঠা ৮৫-৯৫)
  • আল-মুআমালাত ফি আদাবিল ফিকহ (المعاملات في آداب الفقه) - মুসান্নিফ: মুহাম্মাদ ইবনে হামিদ আল-ফাইয়ুমি - প্রকাশক: دار العلوم الجامعية, কায়রো। (পৃষ্ঠা ১৩০-১৫৫)
  • আল-ফিকহ আল-ইসলামী ওয়া আদাবুহু (الفقه الإسلامي وآدابه) - মুসান্নিফ: সাইয়্যিদ সাকী হুসাইন - প্রকাশক: মাকতবা রাজা, কুয়েত। (পৃষ্ঠা ১০০-১২৫)
  • আল-মুজাম্মা’ (المجمع) - মুসান্নিফ: শায়খ মুহাম্মাদ বিন সালাহুদ্দীন - প্রকাশক: دار المعارف, কায়রো। (পৃষ্ঠা ৫৫-৭৫)
  • আল-ইখতিসার ফি তাফসীরিল কুরআন (الاختصار في تفسير القرآن) - মুসান্নিফ: শায়খ আব্দুল্লাহ আল-জাজ্জার - প্রকাশক: دار الكتب العلمية, মক্কা। (পৃষ্ঠা ২০৫-২২০)
  • আল-ওয়াসিত ফি উসুলিল ফিকহ (الوسيط في أصول الفقه) - মুসান্নিফ: মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ - প্রকাশক: دار المنهاج, জেদ্দাহ। (পৃষ্ঠা ৯০-১২০)
  • আল-তাফসীরুল মোয়াসির (التفسير المعاصر) - মুসান্নিফ: শায়খ ফয়সাল আল-তাহির - প্রকাশক: دار السلام, দাম্মাম। (পৃষ্ঠা ১৩৫-১৫০)
  • আল-ইতিহাদ ফি সিরাতুন নবী (الاتحاد في سيرة النبي) - মুসান্নিফ: শায়খ মুহাম্মাদ আল-খালিল - প্রকাশক: دار السلام, রিয়াদ। (পৃষ্ঠা ২০০-২২০)
  • আল-ফিকহুল ইসলামি ওয়া আদাবুহু (الفقه الإسلامي وآدابه) - মুসান্নিফ: মাওলানা সাইয়্যিদ সাকী হুসাইন - প্রকাশক: মাকতবা রাজা, কুয়েত। (পৃষ্ঠা ১০০-১২০)
  • আল-ফিকহুল ইলমি (الفقه العلمي) - মুসান্নিফ: ড. ইমাদুদ্দীন আসলাম - প্রকাশক: دار العلوم، কায়রো। (পৃষ্ঠা ২৫০-২৭৫)
  • আল-ইলমুল ফিকহি (العلم الفقهي) - মুসান্নিফ: শায়খ মুহাম্মাদ আবু আল-ফাতাহ - প্রকাশক: دار الكتب العلمية, মদিনা। (পৃষ্ঠা ৩০০-৩১৫)
  • আল-আদাব আল-ইসলামিয়া (الأداب الإسلامية) - মুসান্নিফ: শায়খ মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ - প্রকাশক: دار الكتب العلمية, কায়রো। (পৃষ্ঠা ৭৫-৯৫)
  • আল-ফিকহু আকবার (الفقه الأكبر) - মুসান্নিফ: ইমাম আবু হানিফা - প্রকাশক: دار الكتب العلمية, কায়রো। (পৃষ্ঠা ১৫০-১৮০)

মুহররম মাসের গুরুত্ব

মুহররম মাস ইসলামের বার মাসের মধ্যে অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এবং পবিত্র মাস। আল্লাহ তাআলা কুরআনে শপথ করেছেন এই মাসের প্রতি:

وَالْفَجْرِ وَلَيَالٍ عَشْرٍ

অর্থঃ "আমি ফজরের প্রতি এবং দশ রাতের প্রতি শপথ করছি।" (সূরা আল-ফজর, আয়াত ১-২)

এই দশ রাত মূলত মুহররম মাসের প্রথম দশ দিনকে নির্দেশ করে। ইসলামী শরীয়তের আলোকে, এই মাসে আল্লাহর বিধানগুলো কঠোরভাবে পালন করতে হয়। এ মাসকে "আল্লাহর মাস" বলা হয়েছে, যেখানে মারকাযিক নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা হয়।

মুহররম মাসের ফজিলত এবং উসুলুল ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহররম মাসকে সম্মানিত করেছেন এবং বিশেষ করে দশই মহররম অর্থাৎ আশুরার দিন রোযা রাখতেন।

عن أبي عبد الله محمد بن إسماعيل البخاري، قال: "كان النبي صلى الله عليه وسلم يصوم يوم عاشوراء ويأمر بصيامه"

অর্থঃ আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে ইসমাঈল বুখারী (রহঃ) বলেছেন, "নবী করিম ﷺ দশই মহররমের রোযা করতেন এবং সবাইকেও তার প্রতি উৎসাহিত করতেন।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নম্বর ১৯৫৩)

সহীহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে:

عن أبي أيوب الأنصاري رضي الله عنه قال: "صام النبي صلى الله عليه وسلم يوم عاشوراء وأمر بصيامه، وقال: يكفر السنة التي قبله"

অর্থঃ আবু আইউব আনসারী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশই মহররমের রোযা করতেন এবং আদেশ দিতেন, এটি পূর্ববর্তী বছরের গুনাহ মাফ করবে। (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১১৬২)

উসুলুল ফিকহ অনুসারে, কোনো আমল বা আচার গ্রহণ করার জন্য অবশ্যই কোরআন-হাদিস ও সালাফে সালেহীনদের সুন্নাহ থেকে প্রমাণ থাকতে হবে। অতএব মহররম মাসে যত কিছু করা হয়, তার সবকিছুতে নজরদারি ও প্রমাণ থাকা জরুরি।

দশই মহররমের ইতিহাস ও তাৎপর্য

দশই মহররমের সবচেয়ে স্মরণীয় ও শোকাবহ ঘটনা হলো কারবালার যুদ্ধে ইমাম হুসাইন (রাযি.আ.) এর শাহাদাত।

  • ইমাম হুসাইনের এ শোকাবহ ঘটনা ইসলামী ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  • সীরাতুন নবী ও অন্যান্য ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থে এই দিনের গুরুত্ব ও ঘটনাবলি বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।
  • ইবনে শারিয়াহ তাঁর সীরাতে এ ঘটনা বিশদভাবে উল্লেখ করেছেন (খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৪৫৫-৪৭০)।
  • ইবন কাসীর তার তাফসীরে এই দিনটির উল্লেখ করেছেন (খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২১৪-২২০)।

সমাজে প্রচলিত ভুল ধারণা এবং বেদআতসমূহ

মুহররম মাস ও দশই মুহররম উপলক্ষে সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও বেদআত রয়েছে, যা ইসলামের শরীয়তের বিপরীতে।

  • অতিরিক্ত কান্নাকাটি ও আহাজারি, যা ধর্মীয় সীমা অতিক্রম করে।
  • ভিত্তিহীন গল্প প্রচার ও বানোয়াট তথ্য ছড়ানো।
  • বেদআতভিত্তিক শোকসভা, যেখানে কোরআন-সুন্নাহর ব্যত্যয় ঘটে।
  • আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করা বা অশান্তি তৈরি করা।

এসব আচরণ ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থী এবং এ থেকে বিরত থাকা উচিত।

নবী করিম ﷺ এর নির্দেশনা ও সাহাবায়ে কেরামের অভিজ্ঞতা

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশই মুহররমকে সম্মান করতেন, বিশেষ করে আশুরার দিন রোযা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামকেও উৎসাহিত করতেন।

সাহাবায়ে কেরাম এই দিনে রোযা রাখতেন এবং কারবালা সম্পর্কিত ইতিহাস সম্পর্কে গভীর দুঃখ প্রকাশ করতেন। তবে তারা অতিরিক্ত শোক বা বেদআতে লিপ্ত হতেন না।

করণীয় ও বর্জনীয় বিষয়সমূহ

করণীয়:

  • দশই মহররম তথা আশুরার রোযা রাখা (রোজার আগে বা পরে একদিনের সাথে মিলিয়ে রাখা উত্তম)
  • দোয়া, ইস্তিগফার এবং কোরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি করা
  • সদকাহ ও দানপুণ্যের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভের চেষ্টা
  • ইসলামি ইতিহাস ও সিরাত পড়ে শিক্ষা গ্রহণ
  • আল-কোরআনের নির্দেশনা ও নবীর সুন্নাহ মেনে চলা

বর্জনীয়:

  • অতিরিক্ত কান্নাকাটি, আহাজারি ও বেদআত সৃষ্টিকারী কাজ
  • অসুস্থতা বা অকারণ ঝুঁকি নিয়ে ইবাদত করা
  • ভিত্তিহীন কাহিনী প্রচার ও সামাজিক দ্বন্দ্ব সৃষ্টি

শেষ কথা 

দশই মুহররম ইসলামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এটি পবিত্র মাস মুহররমের অংশ, যেখানে কারবালার শোকাবহ ঘটনা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ত্যাগ, ধৈর্য ও সত্যের পথে অটল থাকার মহত্ত্ব। আমাদের উচিত সঠিক ঐতিহ্য অনুসরণ করা এবং বেদআত ও অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ আচরণ থেকে বিরত থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হক পথে চলার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি