গল্প ৪: তাফসীরের কড়ি ও ফতোয়ার ভুল
গল্প ৪: তাফসীরের কড়ি ও ফতোয়ার ভুল
🔹 আলোচ্য পরিভাষা: تفسير الآيات من غير دليل
একদিন বরিশালের একটি মসজিদের বারান্দায় বসে আলোচনা করছিল কয়েকজন তরুণ তালিবুল ইলম। একজন হঠাৎ করে বলল, “আল্লাহ বলেছেন ‘لَا تَقْرَبُوا الصَّلَاةَ وَأَنْتُمْ سُكَارَى’ — তাই সালাতের কাছেই যেয়ো না।” আরেকজন হেসে বলল, “এটা কি এখনকার জন্য প্রযোজ্য?” তখনই তাদের উস্তাদ এসে বললেন — “এই হলো তাফসীর না বুঝে ফতোয়া দেয়ার সর্বনাশা পরিণতি। কুরআনের হুকুম বুঝতে হলে চাই দলিল ভিত্তিক তাফসীর। না হলে ফিকহি বিধান নির্ধারণে মারাত্মক ভুল হবে।”
যারা تفسیر القرآن করছে অথচ হাদীস, সীরাত, সিয়াক-সাবাক, নাসিখ-মানসুখ, আরবী বালাগাত ও উসুল জানে না, তারা কুরআনের অপব্যাখ্যাকারী হয়ে উঠতে পারে।
মূল আলোচনা:
কুরআন থেকে হুকুম আহরনের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো — تفسیر القرآن بالضوابط। অর্থাৎ কুরআনের ব্যাখ্যা হাদীস, সাহাবার ফিকহ, তাবেয়ীনদের বর্ণনা, আরবী ভাষা ও উসূলুল ফিকহের নিয়ম মেনে করতে হবে। শুধুমাত্র ভাষাগত বিশ্লেষণ বা ব্যক্তিগত যুক্তি দ্বারা তাফসীর করলে শরীয়ত বিচ্যুতি ঘটতে পারে।
কিতাবের হাওয়ালা:
- المستصفى, الإمام الغزالي, ج١، ص:١٣٢، دار الكتب العلمية
- الإتقان في علوم القرآن, السيوطي، ج٢، ص:١٨٠، دار الفكر
১০টি মাসআলা ও তাদের বিশ্লেষণ:
অনুবাদ: “তোমরা সালাতের ধারে-কাছে যেয়ো না, যখন তোমরা মাতাল।”
❖ যারা বলে, ‘নেশা করলে সমস্যা নেই, শুধু নামাজের সময় বর্জন করো’, তারা নাসিখ-মানসুখ জানে না। এই আয়াতটি পরে নাসিখ হয়েছে إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ (المائدة: 90) দ্বারা।
❖ কেউ যদি বলেন ‘আমি যাইনি, শুধু মিশে ছিলাম’, তাহলে সে سِيَاق বুঝেনি। এখানে ‘قُرْب’ মানে সম্ভাব্য সকল মাধ্যম বর্জন।
❖ কেউ যদি মনে করে যে, এই আয়াত অনুমতি দেয় ১০টি স্ত্রী রাখতে, সে تفسير الصحابة জানে না। আয়াতটি ৪-এ সীমাবদ্ধ।
❖ কেউ যদি বলে ‘ভালো আচরণ মানে শুধু আর্থিক ভরণপোষণ’, সে عرف الشرع বুঝে না। ভালো আচরণ মানে আন্তরিকতা, দয়া, সহনশীলতা ইত্যাদি।
❖ কেউ যদি বলেন, “পুরুষ যা খুশি করতে পারে”, সে تفسير بالرأي করছে। সাহাবা বলেছেন: এখানে ‘দায়িত্ব’ বোঝানো হয়েছে।
❖ কেউ যদি এই আয়াতের ভুল অর্থ দিয়ে ফরজ আমল বাতিল করে, তবে সে عموم اللفظ না বুঝে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
❖ কেউ যদি মনে করে এতিমদের সাথে ইনসাফ না হলে বিয়ে করতে হবে—তবে সে سَبَاق বুঝেনি। এ আয়াতের কারণ ও প্রেক্ষাপট জানতে হবে।
❖ কেউ যদি বলে “যেহেতু সহজতা চায়, তাই রোযা না রাখাই ভালো”, তবে সে اقتضاء الحال ভুল করছে।
❖ কেউ যদি বলে “ফজর শুরু মানে আলো স্পষ্ট হওয়া”, তবে সে عرف الشرع অস্বীকার করছে। এখানে সূর্যোদয় না, বরং সুবহে সাদিক বোঝানো হয়েছে।
❖ কেউ যদি বলেন, “মায়ের দুধ বাধ্যতামূলক নয়”, সে اقتضاء না বুঝে ব্যক্তিগত মত দিচ্ছে। হাদীস দ্বারা এই হুকুমের বিশদ ব্যাখ্যা এসেছে।
শেষ কথা,,,,
- কুরআনের তাফসীর করতে হলে উসুলুল ফিকহ, হাদীস, আরবী বালাগাত, নাসিখ-মানসুখ জানা আবশ্যক।
- কুরআনের ভুল ব্যাখ্যার ফলে ফতোয়া ভুল হতে পারে, যা পুরো জাতির জন্য ক্ষতিকর।
- এই কারণে তাফসীরের কড়ি ঠিকভাবে বুঝে ফতোয়া দিতে হয়, যেন ভুল সিদ্ধান্ত না হয়।
✍️ লেখক: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
Comments
Post a Comment