পরীক্ষা একটি আমানত: হেফাজতের চাবি হলো মেহনত
পরীক্ষা একটি আমানত: হেফাজতের চাবি হলো মেহনত
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
প্রিয় ভাই,
তুমি আজকের এই গুরুত্বপূর্ণ কথোপকথনে আমার খুব কাছের একজন ভাই হিসেবেই অংশ নিচ্ছো। তোমাকে আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে জানি, এবং জানি তুমি জীবনের কঠিনতম কিন্তু সম্ভাবনাময় এক মঞ্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছো—সে হলো “পরীক্ষা”। এই শব্দটি শুধু একটি ইভেন্ট না, বরং এটি একটি আমানত, এক নিষ্ঠা ও দায়িত্বের নাম। আমি তোমাকে এই প্রবন্ধে কিছু হৃদয় নিংড়ানো কথা বলতে চাই, যেগুলো আমি চাই তুমি হৃদয়ে ধারণ করো, আর নিজের পরীক্ষাকে শুধু একটি তারিখ নয়, বরং একটি পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করো।
পরীক্ষা: কী এবং কেন?
পরীক্ষা একটি মাপকাঠি, যার মাধ্যমে তোমার অধ্যবসায়, মেহনত, সময় ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিকতা যাচাই হয়। এটি কেবল সিলেবাসের মূল্যায়ন নয়, বরং এটি জীবনের প্রস্তুতির একটি বাস্তব রূপ। মহান আল্লাহ বলেন— وَجَعَلْنَا بَعْضَكُمْ لِبَعْضٍ فِتْنَةً
অর্থাৎ আমরা একে অপরকে পরীক্ষার উপকরণ বানিয়েছি। তাহলে পরীক্ষা তো কেবল বই নয়, বরং জীবনব্যাপী এক পরীক্ষা, আর একাডেমিক পরীক্ষা হলো তার প্রস্তুতির সূচনামাত্র।
পরীক্ষা হলো আমানত
তুমি যখন একটি শ্রেণিতে ভর্তি হও, তখন তুমি নিজের জান, সময় এবং শ্রমকে একপ্রকার বন্ধক রাখো—এই প্রতিশ্রুতি দাও যে তুমি নিয়মিত ক্লাসে আসবে, পড়াশোনা করবে, এবং পরিশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষার স্তর অতিক্রম করবে। এই প্রতিশ্রুতি তোমার শিক্ষক, মাদরাসা, বাবা-মা এবং সর্বোপরি আল্লাহর সামনে এক আমানত। পরীক্ষা হলো সেই আমানতের যাচাই। তুমি যদি পরীক্ষাকে অবহেলা করো, তাহলে এক অর্থে তুমি সেই আমানতের হেফাজত করছো না।
সময় হেফাজতের চাবিকাঠি
ভাই, সময় হলো তোমার জীবনের মূলধন। কেবল বই মুখস্থ করে নয়, বরং সময়কে কীভাবে ব্যবহার করো—এটাই তোমার সাফল্যের মূল। পরীক্ষার সময় ফোনে, ফেসবুকে, ইউটিউবে, গেমসে পড়ে থাকা একেবারেই অনুচিত। কেউ কেউ পরীক্ষার আগে না পড়েই আত্মতুষ্টি করে—“আল্লাহ ভরসা”—এই ধরনের কথা বলে দায়িত্ব এড়াতে চায়। অথচ আল্লাহর উপর ভরসা করার অর্থ হলো আগে নিজের দায়িত্ব পালন করা, তারপর তাঁর রহমতের আশায় থাকা।
মেহনত: হেফাজতের মূল চাবি
মেহনত এমন এক চাবি যা দিয়ে তুমি পরীক্ষার প্রতিটি তালা খুলতে পারো। কুরআন বলছে: لَيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَى
— মানুষের জন্য আছে শুধুই তার চেষ্টা। তুমি যদি মন দিয়ে চেষ্টা করো, তাহলে ফলাফল তোমার অনুকূলে আসবে ইনশাআল্লাহ। আর যদি অবহেলা করো, তাহলে তুমি কেবল পরীক্ষাই হারাবে না—হারাবে আত্মবিশ্বাস, মানুষের সম্মান এবং সর্বোপরি আল্লাহর কাছে দায়িত্বশীলতা।
সবাইকে দেখিয়ে দেওয়ার মানসিকতা
ভাই, একথা ভুলে যেও না যে তোমার এই পরিশ্রম কেবল তোমার নয়। তোমার বাবা-মা, শিক্ষক, পরিবার—সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। তারা চায় তুমি ভালো করো, উন্নতি করো, সম্মান পাও। এই সমাজে তুমি যেন ইসলামী শিক্ষার এক আলোকবর্তিকা হয়ে দাঁড়াও—এই স্বপ্ন তারা দেখে। কাজেই তোমার উচিত হবে পরীক্ষায় এমন মেহনত করা, যাতে মানুষ দেখে ফেলে—“হ্যাঁ, এই ছেলেটি কুরআনের আলোয় পথ চলে, পরীক্ষায়ও সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।”
কীভাবে প্রস্তুতি নেবে?
- 📘 একটি সুন্দর রুটিন তৈরি করো (ঘুম, পড়া, বিশ্রাম সব ঠিক করে)।
- 📌 যা পড়েছো তা বারবার পুনরাবৃত্তি করো, একবার পড়ে ভুলে যেয়ো না।
- 🕰️ প্রতিদিন একটা নির্দিষ্ট সময়ে পড়াশোনা করো, ফোন বন্ধ রেখে মনোযোগ দিয়ে।
- 📝 যেসব টপিক দুর্বল, সেগুলো আগে ধরো এবং দরকার হলে সিনিয়র ভাইদের সাহায্য নাও।
- 🧎♂️ নামাযের প্রতি যত্নবান হও, কারণ মনোযোগের চাবিকাঠি হলো তাওহীদ ও ইবাদত।
একটি বাস্তব গল্প
আমি একজন ছাত্রকে চিনি, যিনি সারা বছর পড়াশোনায় খুব দুর্বল ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষার এক মাস আগে সে সিদ্ধান্ত নিলো: “এইবার সবাইকে দেখিয়ে দেব।” সে ফোন বন্ধ করলো, ফজরের পর পড়তে বসলো, মাঝে মাঝে নোট বানাতো, দরকার হলে বোর্ডে নিজেই পড়াতো অন্যদের। ফলাফল? সে শুধু পাস করেনি, বরং শ্রেণির সেরা পাঁচজনের মধ্যে উঠে এল। কীভাবে? মেহনত + হেফাজত = সাফল্য
শেষ কথা: এই সময় আর আসবে না
ভাই, তুমি যদি আজ অবহেলা করো, এই সময় আর ফিরে আসবে না। আগামী বছর নতুন ক্লাস, নতুন চাপ—এই সুযোগের মূল্য এখনই বুঝে নাও। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই, আর পরীক্ষা হলো সেই মেহনত যাচাইয়ের দরজা। সাহস রাখো, ভরসা রাখো আল্লাহর উপর, আর দায়িত্ব পালন করো সম্পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে।
Comments
Post a Comment