বিরতিতে কিতাব মুতালাআর পদ্ধতি এবং আকাবিরগণের পন্থা

 বিরতিতে কিতাব মুতালাআর পদ্ধতি এবং আকাবিরগণের পন্থা

মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি 

আলহামদুলিল্লাহ, তালেবে ইলমের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো কিতাব মুতালাআ। মাদ্রাসায় নিয়মিত পাঠ্যক্রমের বাইরে যখন বিরতি আসে, তখন এটি শুধুমাত্র বিশ্রামের সুযোগ নয়; বরং ইলমে অগ্রসর হওয়ার একটি সুবর্ণ সময়। আকাবিরগণ এই সময়কে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করতেন। তাদের জীবনধারা থেকে আমরা শিখতে পারি কিভাবে বিরতিতে ইলমের সমৃদ্ধি সম্ভব।

মুতালাআর গুরুত্ব

কিতাব মুতালাআ শুধু পড়া নয়; বরং এটি ইলমের আসল প্রাণ। ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেছেন:

“যে ব্যক্তি মুতালাআর স্বাদ গ্রহণ করেনি, সে ইলমের আসল মধুরতা পায়নি।”

কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেছেন:

﴿قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ﴾
“বলুন, যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান?” (সূরা যুমার: ৯)

বিরতিতে মুতালাআর সঠিক পদ্ধতি

১. নিয়ত ঠিক করা

মুতালাআ শুরুর আগে নিয়ত করতে হবে যে এটি শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। ইমাম গাজালী (রহ.) বলেন:

“ইলম এমন একটি আমল যা শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য শিখতে হয়, অন্যথায় তা কেবল জ্ঞান প্রদর্শনের উপকরণ হয়ে যায়।” (ইহইয়াউল উলুম)

২. সময়ের সঠিক ব্যবহার

বিরতিতে সময় ভাগ করা অত্যন্ত জরুরি:

  • সকালে – মস্তিষ্ক সতেজ অবস্থায় কঠিন কিতাব যেমন: হিদায়া, কাফিয়া
  • বিকালে – হালকা কিতাব যেমন: মিশকাত, নাহু
  • রাতে – পুনরাবৃত্তি এবং নোট তৈরী

৩. মুতালাআর ধাপ

একটি কিতাব মুতালাআ করার সময় নিম্নোক্ত ধাপ অনুসরণ করা উচিত:

  • প্রথমে দ্রুত একবার পড়ে নেয়া (মোটামুটি ধারণা নেওয়া)
  • দ্বিতীয়বার গভীরভাবে পড়া এবং কঠিন অংশ চিহ্নিত করা
  • নোট ও মার্জিনে গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট লেখা
  • উস্তাদ বা সিনিয়রদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে অস্পষ্ট অংশ পরিষ্কার করা

৪. পুনরাবৃত্তি

ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.) বলেন:

“আমি এক মাসে একটি কিতাব দশবার পড়েছি, তবুও মনে হয় যেন আরো একবার পড়া দরকার।”

এ থেকেই বোঝা যায় পুনরাবৃত্তি ছাড়া ইলম হৃদয়ে স্থায়ী হয় না।

৫. সাথী নিয়ে মুতালাআ

আকাবিরগণ মুতালাআ প্রায়শই সহপাঠীর সাথে করতেন। এতে আলোচনার মাধ্যমে জটিল মাসআলা সহজ হয়ে যেত।

আকাবিরগণের পন্থা

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)

তিনি রাতে দীর্ঘ সময় মুতালাআ করতেন। তাঁর ছাত্ররা বলেন যে তিনি কখনো কখনো ফজর পর্যন্ত আলোচনায় ব্যস্ত থাকতেন।

ইমাম বুখারী (রহ.)

ইমাম বুখারী (রহ.) প্রতিটি হাদীস মুখস্থ করার আগে ওযু করতেন এবং দুই রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করতেন।

শাহ ওলিউল্লাহ দেহলভী (রহ.)

তিনি বিরতিতে ইলমি সফর করতেন এবং বড়দের সাথে মজলিসে বসে গভীর গবেষণা করতেন।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)

তিনি বলতেন: “বিরতি হলো ইলমকে পাকাপোক্ত করার সর্বোত্তম সময়।”

বিরতিতে মুতালাআর জন্য পরিকল্পনা

  • ফজর থেকে সূর্যোদয়: কুরআন তিলাওয়াত
  • সকাল ৮-১১: হিদায়া, কাফিয়া
  • দুপুর ২-৪: মিশকাত, নাহু
  • আসর ৫-৬: পুনরাবৃত্তি
  • মাগরিব ৭-৮: যিকির ও নোট আপডেট
  • ইশা ৯-১০: আলোচনাসভা

মুতালাআর কিছু বাস্তব টিপস

  • একই সময়ে একাধিক কিতাব শুরু না করা
  • মার্জিনে সংক্ষিপ্ত নোট লেখা
  • প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ পৃষ্ঠা মুতালাআ করা
  • দোয়া ও ইস্তিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য চাওয়া

মোদ্দা কথা,,,,

বিরতি হলো ইলমকে দৃঢ় করার সুবর্ণ সুযোগ। আকাবিরগণ যেভাবে এই সময়কে কাজে লাগিয়েছেন, তালেবে ইলমদেরও উচিত সেই পদ্ধতি অনুসরণ করা। কিতাব মুতালাআ শুধু মুখস্থ করার জন্য নয়; বরং গভীরভাবে বুঝে আমল করার জন্য।

হে আল্লাহ! আমাদেরকে আকাবিরগণের পদ্ধতিতে ইলম অর্জনের তাওফিক দান করুন এবং বিরতির সময়কে ইলম ও আমলে ভরপুর করে দিন। আমীন।

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি