প্রভাতবেলায় নিভে যাওয়া শিশুরা: অন্তর কাঁদা স্মৃতির কান্না
প্রভাতবেলায় নিভে যাওয়া শিশুরা: অন্তর কাঁদা স্মৃতির কান্না
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
এ যেন কোনো রূপক না, বরং এক বাস্তবতা যা এক মুহূর্তে জলাধারে পরিণত হয়ে ফেটে পড়ে অন্তরের সব কাঁদা স্মৃতি। সেই স্কুলের ক্লাসরুম, সেই ছোট্ট হাসি, সেই শিশুদের খেলার শব্দ—হঠাৎ এক অগ্নির লোলুপ আলোর ঢেউয়ে ঝলসে গেলো সব আর অবশেষে থেমে গেলো সব।
ছোট্ট শিশুরা, যারা হয়তো ফজরের পর প্রভাতার খাবার নিয়ে খুশি ছিল, স্বপ্ন দেখছিলো—তারা আগুনে, ধোঁয়ায়, ওই দগ্ধ ক্লাসে মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেলো।
আজ সেই প্রিয় মুখগুলো চোখে আসে—যারা নির্ভয়ে টিফিন নিয়ে ক্যান্টিনে দৌড় দিচ্ছিলো, কারও হাতে হয়তো ফুলের টুকরো, কারো মুখে হাসির পূর্ণতা—এখন আছে শুধু তাদের বাবার আহাজারি, মায়ের কান্নার প্রতিধ্বনি, আর খণ্ডিত স্বপ্নময় ছবি।
রাতে সেই স্বপ্ন সেই সব বাচ্চাদের চোখে আর আসে না—তারা ভয় পায়, কান্নায় ঢেকে যায়, আর ঘুম আসে না। সকাল হতেই চোখে ধরা দেয় ছোট্ট হাতে পোড়ার গন্ধ, পোশাক ছাড়াই দগ্ধ হয়ে থাকা, বুক ব্যথা, মানুষের হাহাকার।
চোখের পানি ও আত্মার অশ্রু—হাত্টা করে ফিরছে সেই পরিবারের। বাবা কাজেই ছুটছিলেন, মা রান্নায় ব্যস্ত ছিল, আর কিসু মুহূর্তের ব্রেক—থাকলো না। বাসায় ফিরে তারা স্ত্রী ও সন্তানদের মুখ দেখতে পাননি। সেখানে শুধু পড়ে থাকে এক নিঃস্ব অন্তর, এক নিঃসঙ্গ কান্না।
অপরাহ্ণে সেই দগ্ধ ডাক্তারের ধকল, বার্ন ইউনিটের চিৎকার—আহত শিশুর আহাজারিতে শোনা যায় না কোনো শব্দ। শোনা যায় শুধু চোখের অশ্রু, চিকিৎসকের দৃষ্টি এবং পরিবারে বিভীষিকা ছড়ানো শূন্যতা।
এই স্মৃতি—হৃদয় থেকে উঠছে বল্লমভাঙ্গা আহবান—“তোমরা কোথায়, ওরা কোথায়?”
কিন্তু কেউ নেই। না আছে ছড়া নাড়ানো হাত, না আছে বলার মতো কথা, শুধু আছে শূন্যতা, শুধু আছে হারিয়ে যাওয়া শিশুর খালি জুতোর প্রতিচ্ছবি, শুধু আছে শেষ হাসির ছবি, আর হৃদয় ভাঙার অনন্ত আহ্বান।
এই লেখাটা পড়লে হয়তো কোনো একজন—হঠাৎ চোখ ভিজবে। কারণ এর মাঝে আছে শিশুর অজান্তে ছিটকে যাওয়া আগুন; আছে পরিস্থিতি কোনো ভিডিওতে নেই, শুধু হৃদয়বিক্ষিপ্ত দৃশ্য, কান্নাজড়িত কান্নার ভিত্তি এবং মানবতার ক্ষুধার আবাহন।
একটুকরো আলোর আশায় এই কান্নাজড়িত প্রবন্ধ হয়তো একজন মানুষকে দিচ্ছে নিরাশায় বাঁচার সাহস—কারণ প্রতিটি শিশুর অন্তরের সম্পর্ক, প্রতিটি পরিবারের ভুল যন্ত্রণা, প্রতিটি শ্রদ্ধাস্বরূপ অনুভব—এই লেখার কলমে ধরে ফেলেছি՝ যাতে কখনও ভুলে যাওয়া না যায়, যাতে তাদের স্মৃতি ভেসে ওঠে হৃদয়ের প্রতিটি কোণে, এবং যেন কোনো মানুষের কলম থামতে না পারে।
শোককবরে মিশে থাকা সেই শিশুর কান্না, সেই দগ্ধ স্মৃতি, সেই ক্ষতবিক্ষত পরিবারের আহ্বান তুমি স্মরণ রেখো। মানুষ তুমি, তাই ভাবো, কান্না করো, সাহস গড়ো।
Comments
Post a Comment