বিরতিতে কীভাবে বাসায় সময় কাটানো উচিত তালেবে ইলম ভাইদের
বিরতিতে কীভাবে বাসায় সময় কাটানো উচিত তালেবে ইলম ভাইদের
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ তাআলার অসীম কৃপায় একজন তালেবে ইলমের জীবন ইলম ও আমলের বরকতময় সফরে ভরপুর। বছরের নির্দিষ্ট সময়ে পরীক্ষার পর যে ছুটি বা বিরতি মেলে, সেটি শুধুই বিশ্রামের সময় নয়; বরং এটি ইলমকে পুনর্বিন্যাস ও আত্মশুদ্ধির এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
বিরতির গুরুত্ব
বিরতির সময় একজন তালেবে ইলমের জন্য এক অমূল্য নেয়ামত। সাধারণত মাদ্রাসার দৈনন্দিন ব্যস্ততা ও ক্লাসের চাপে অনেক ইলমি কাজের জন্য সময় বের হয় না। এই বিরতি ব্যবহার করে তালেবে ইলম তার কিতাব মুতালাআ করতে পারে, কুরআন হিফজ মজবুত করতে পারে এবং পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করতে পারে।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “দুই নেয়ামত আছে যাদের ব্যাপারে অনেক মানুষ প্রতারিত হয়: সুস্থতা এবং অবসর সময়।” (বুখারী, হাদীস: ৬৪১২)
কুরআন ও হাদীস থেকে নির্দেশনা
কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন:
﴿فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَبْ﴾
“অতএব তুমি যখন অবসর পাও তখন ইবাদতে মনোনিবেশ কর এবং তোমার রবের দিকে মন ফিরিয়ে দাও।” (সূরা ইনশিরাহ: ৭-৮)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয় যে অবসর সময় নষ্ট করার জন্য নয়; বরং তা ইবাদত, ইলম ও নফল কাজের জন্য ব্যবহার করতে হবে।
বিরতির সময় করণীয়
১. ইলমি মুতালাআ
বিরতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো পূর্বে পড়া কিতাব পুনরায় মুতালাআ করা। যেমন:
- মিরকাত (মানতেক)
- হিদায়া (ফিকহ)
- জালালাইন (তাফসীর)
- মিশকাত (হাদীস)
বিরতিতে এই কিতাবগুলো বারবার পড়লে মস্তিষ্কে গভীরভাবে ইলম বসে যায়।
২. কুরআন তিলাওয়াত ও মুখস্থ
বিরতিতে কুরআন তিলাওয়াত এবং পূর্বে মুখস্থ অংশগুলো পুনরাবৃত্তি করা জরুরি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“কুরআনের হাফেজ এমন যে, যদি সে কুরআন পুনরাবৃত্তি না করে তবে তা তার মস্তিষ্ক থেকে চলে যায়।” (বুখারী)
৩. উস্তাদদের সাথে যোগাযোগ
বিরতিতে ইলমি প্রশ্ন বা দুর্বল অংশগুলো নিয়ে উস্তাদদের সাথে পরামর্শ করা উচিত। এতে শু‘বা (শাখা) গুলো মজবুত হয় এবং কিতাব বোঝা সহজ হয়।
৪. আমল ও ইবাদত বৃদ্ধি
নফল ইবাদতের মধ্যে নিয়মিত হওয়া, তাহাজ্জুদ, নফল রোযা ও যিকিরে সময় ব্যয় করা উচিত।
৫. পরিবারে সুসম্পর্ক
বিরতিতে পরিবার ও আত্মীয়স্বজনের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা তালেবে ইলমের জন্যও এক প্রকার দাওয়াহ। আল্লাহর রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি রিজিকের প্রশস্ততা ও আয়ু বৃদ্ধির ইচ্ছা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।” (বুখারী)
বিরতির সময় বর্জনীয় বিষয়
- অকারণে সময় নষ্ট করা
- বিভিন্ন বিনোদনে অতিরিক্ত জড়িয়ে পড়া
- গীবত, লাগামছাড়া আলাপ বা অকারণ আড্ডা
- সোশ্যাল মিডিয়ায় অতিরিক্ত সময় ব্যয়
সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে শিক্ষা
সাহাবায়ে কেরাম রা. বিরতিতে অবসর সময়ে ইলম ও ইবাদতে ব্যস্ত থাকতেন। ইমাম আবু হানিফা রহ. ছুটির সময়ে কিতাব মুতালাআ করে নতুন নতুন মাসআলা বের করতেন। ইমাম শাফেয়ী রহ. প্রতিদিন ১০০ বার কুরআন তিলাওয়াত করতেন বিশেষ দিনগুলোতে।
বাস্তব পরিকল্পনা: সময় ব্যবস্থাপনা
একজন তালেবে ইলমের জন্য বিরতির সময় একটি রুটিন হওয়া উচিত:
- ফজর – কুরআন তিলাওয়াত
- সকাল – পূর্ববর্তী কিতাব মুতালাআ
- দুপুর – পরিবারকে সময় দেওয়া
- আসর – পুনরায় পড়াশোনা
- মাগরিব – যিকির ও নফল ইবাদত
- ইশা – নতুন কিতাব মুতালাআ
মোটকথা,,,,
বিরতিকে শুধুমাত্র বিশ্রামের সময় মনে করলে তালেবে ইলম তার জীবনের সেরা সুযোগ হারাবে। বরং এই সময় ব্যবহার করা উচিত আত্মশুদ্ধি, ইলমি উন্নতি এবং পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক তৈরির জন্য।
হে আল্লাহ! তুমি আমাদের বিরতিকে ইলম ও ইবাদতের বরকতময় সময়ে পরিণত করো। আমীন।
Comments
Post a Comment