উসুলুল ফিকহ | পর্ব ১১:

 

উসুলুল ফিকহ | পর্ব ১১:
ناسخ و منسوخ – ভুলে যাওয়া হুকুম?

উস্তাদ: রায়হান, তুমি জানো কি, কুরআনে এমন বহু আয়াত আছে, যেগুলোর হুকুম একসময় ছিল কিন্তু পরবর্তীতে বাতিল হয়ে গেছে?

রায়হান: হুজুর, মানে কি? আল্লাহর কথা বাতিল হয়?

উস্তাদ: না, কুরআনের কোনো অংশ কখনো বাতিল হয় না, বরং পূর্ববর্তী কোনো হুকুমের পরিবর্তে নতুন হুকুম আসলে সেটিকে বলে النسخ। এটি কেবল হুকুমের ক্ষেত্রে হয়, কুরআনের পাঠ রয়ে যায়। আজ আমরা এ বিষয়ে গভীরভাবে জানবো।

 نسخ-এর সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

النسخ অর্থ: অপসারণ বা পরিবর্তন করা। শরিয়তের পরিভাষায়, পূর্ববর্তী শরঈ হুকুমকে অনুপযোগী ঘোষণা করে নতুন হুকুম প্রবর্তন করাকে النسخ বলা হয়।

“النسخ هو رفع حكم شرعي بدليل شرعي متراخٍ عنه”
– (البرهان للجويني، ج٢، ص: ٢٩٤)

এই আলোচনা এমন একটি বিষয়, যা উসুলুল ফিকহ বোঝার জন্য অপরিহার্য। কারণ, বহু আয়াত ও হাদীস ফিকহি ইস্তنبাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, যদি نَاسِخ ও مَنسُوخ স্পষ্ট না হয়।

কুরআনের দলিল

مَا نَنْسَخْ مِنْ آيَةٍ أَوْ نُنْسِهَا نَأْتِ بِخَيْرٍ مِنْهَا أَوْ مِثْلِهَا (البقرة: 106)
“আমরা যদি কোনো আয়াত রহিত করি বা ভুলিয়ে দিই, তবে তার চেয়ে উত্তম অথবা অনুরূপ আয়াত নিয়ে আসি।”

نسخ-এর ধরনসমূহ

  1. نَسخ الحُكم وبقاء التلاوة – হুকুম রহিত, আয়াত কুরআনে রয়ে গেছে।
  2. نَسخ التلاوة وبقاء الحُكم – তিলাওয়াত রহিত, হুকুম বহাল।
  3. نَسخ الحُكم والتلاوة – উভয় রহিত।

 ইজতিহাদে প্রয়োগ

মুজতাহিদরা অনেক সময় হুকুম নির্ধারণ করতে গিয়ে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান যদি নাসিখ ও মানসুখের জ্ঞান না থাকে।

 ৫টি কুরআনের উদাহরণ

  • آية النجوى: المجادلة: 12 — "রাসূলের সঙ্গে কথার আগে সাদাকা দাও" — পরে নাসিখ: المجادلة: 13।
  • تحويل القبلة: بقره: 144 — কিবলা পরিবর্তন।
  • الوصية للوالدين: بقره: 180 — ওসিয়তের হুকুম, পরে نسخ হয়েছে আয়াত المواريث দ্বারা।
  • الصبر على أذى الكفار: প্রথমে ধৈর্য ধরার নির্দেশ, পরে قتال এর অনুমতি।
  • العدة للمتوفى عنها زوجها: এক বছর, পরে ৪ মাস ১০ দিন (البقرة: 240 & 234)।

 ৫টি হাদীসের উদাহরণ

  • "كنت نهيتكم عن زيارة القبور، ألا فزوروها" – কবর জিয়ারতের প্রথমে নিষেধ, পরে অনুমতি।
  • "نهيتكم عن ادخار لحوم الأضاحي" – পরে অনুমতি।
  • নেশাগ্রস্ত অবস্থায় সালাত পড়া নিষিদ্ধ → পরে মদ পুরোপুরি হারাম।
  • তিন তালাক একত্রে – হাদীসে উল্লেখ: এক তালাক হিসাবে গণ্য হতো, পরে ফতওয়ায় তিন হিসাবে গণ্য।
  • মুতা বিয়ে – প্রথমে অনুমোদিত, পরে নিষিদ্ধ।

 فقهاء-এর মতপার্থক্য

কিছু ইমাম নাসিখ-মানসুখের ব্যাপারে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ:

  • ইমাম শাফিঈ – নাসিখ হওয়ার জন্য সরাসরি দলিল প্রয়োজন।
  • ইমাম মালিক – সাহাবীদের ইজমা দ্বারা নাসিখ মেনে নিয়েছেন অনেক ক্ষেত্রে।

রেফারেন্সসমূহ

  • الإتقان في علوم القرآن – جلال الدين السيوطي، ج٢، ص: ٧٠٥، دار الفكر
  • البرهان في أصول الفقه – إمام الحرمين الجويني، ج٢، ص: ٢٩٤، دار المعارف
  • المستصفى – الغزالي، ج١، ص: ٢٣৮، دار الكتب العلمية
  • الإحكام في أصول الأحكام – ابن حزم، ج٤، ص: ٢١٥، مكتبة السلام

 লিখেছেন: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি