আমার পরিচয়
আমার পরিচয়
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
আলহামদুলিল্লাহ, আমার প্রিয় পাঠকবৃন্দ, তোমরা অনেকেই আমার লেখা পড়ে থাকো, এবং অনেকেই তোমাদের মূল্যবান মন্তব্য এবং উৎসাহ দিয়ে থাকো। আমার সাথে যোগাযোগ করো WhatsApp বা মেসেঞ্জারের মাধ্যমে, নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করো, এবং অনেকেই অনুরোধ করেছো এই বিষয়ে একটি বিস্তারিত লেখা লিখতে। বিশেষ করে অনেকেই চেয়েছো, ‘হযরত, আপনার পূর্ণ পরিচয় দিলে আমাদের আরও ভালোভাবে আপনার লেখার সঙ্গে পরিচয় গড়ে উঠবে।’ সেই অনুরোধে আজ আমি আমার জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিয়ে তোমাদের সামনে হাজির হচ্ছি।
আমি মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা, জন্মগ্রহণ করেছি ২০০২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ঢাকা আজিমপুর হাসপাতালে। আমার পিতা ছিলেন মুহাম্মদ মুসলেহ উদ্দিন তারেক এবং মায়ের নাম হাসিনা বেগম। আমার পড়াশোনার শুরুটা ছিল ঘরোয়া পরিবেশে, যেখানে আমার বাবা নিজের হাতে আমাকে পড়াতেন, ছোটদের জন্য যে শিক্ষার সূচনা হয়, সেই সব পাঠ আমাদের প্রথম পাঠশালা ছিল। তাঁর দোয়াতে আমার শিক্ষাজীবন এগিয়ে যায়।
ছয় বছর বয়সে আমি বাংলাদেশ ব্যাংক উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হই। আমার বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে একজন বড় ডাক্তার হিসেবে গড়ে তোলা; সেই উদ্দেশ্যেই তিনি আমার শিক্ষাজীবনের প্রতি গভীর যত্ন নিয়ে আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করতেন। আমি বছর বছর ধীরে ধীরে পরবর্তী শ্রেণীতে উন্নীত হই — সাত বছর বয়সে ‘টু’, আট বছর বয়সে ‘থ্রি’, নয় বছর বয়সে ‘ফোর’, দশ বছর বয়সে ‘ফাইভ’, এগারো বছর বয়সে ‘সিক্স’, বারো বছর বয়সে ‘সেভেন’ এবং তেরো বছর বয়সে ‘এইট’ শ্রেণীতে অধ্যয়ন সম্পন্ন করি।
যাহোক, শিক্ষাজীবনের মাঝখানে জীবনের এক গভীর বেদনার অধ্যায় শুরু হয়। ২০০৮ সালে আমার প্রিয় বাবা পৃথিবীর মায়ের কাছে স্বাগত জানান। তিনি কিছুদিন যাবৎ অসুস্থ ছিলেন। তিনি জীবনে দুইটি চাকরি একসঙ্গে সামলাতেন—একটি ব্যাংকে, আরেকটি পুলিশের ক্যাশিয়ার হিসেবে। সাধারণত এমন কঠিন পরিশ্রম সবার পক্ষে সামলানো কঠিন। তবু, বাবার এই পরিশ্রমে আমাদের পরিবারে কখনো দারিদ্র্যের ছায়া পড়েনি। আলহামদুল্লাহ, তাঁর এই আত্মত্যাগের জন্য আজও আমি কৃতজ্ঞ।
গভীর শোকের অধ্যায় ছিল আমার জীবনের। তিনি যখন আমাদের ছেড়ে চলে যান, তখন তার শরীর দুর্বল ছিল, দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছিলেন। হার্ট অ্যাটাকের কারণে তিনি হঠাৎ আমাদের থেকে সরে গিয়েছিলেন।তিনি মারা যান। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।তাঁর কবর দেওয়া হয় কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম থানার আব্দুল্লাহপুর গ্রামে, তার নিজস্ব গৃহে। সেই সময় আমার ছোট বেলার মন বোঝতেও পারত না, বাবার অবর্তমানে জীবন কেমন হবে। আমাদের সংসারে তখন শুধু আমার আম্মু আর আমি ছিলাম।শৈশবের অন্ধকারে, যখন আমি সবচেয়ে বেশী বিনোদন চাইছিলাম, তখন আমার মামা মুহাম্মদ হামিদুল ইসলাম, যিনি মূলত দিনাজপুরের বাসিন্দা, আমাদের একা ফেলে যাননি। তিনি আমাদের সাথে ঢাকায় থেকে এক বিশাল নিরাপত্তার ঢাল হয়ে দাঁড়ালেন। দুই বছর ধরে ঢাকায় থেকে তিনি আমাদের যত্ন নিলেন, আম্মুর সাথে আমাদের এই যন্ত্রণাদায়ক সময়ে একান্ত সঙ্গী হলেন।
তারপর যখন তার নিজস্ব জীবনের ব্যস্ততা এবং পরিবারের অন্য দায়িত্বের কারণে তাকে ফিরতি যাত্রা করতে হলো, তখন তিনি আমাদের নিয়ে বাড়ির সব মালপত্র একত্রিত করে ঢাকা থেকে দিনাজপুরের পথে রওনা দিলেন। সেখানে, বীরগঞ্জ থানার সাতখামার গ্রামে আমার নানুর বাড়িতে আমাদের নতুন ঠিকানা হলো।
নানুর বাড়িতে, আমাকে ইংলিশ মিডিয়াম কিন্ডারগার্টেন স্কুলে ভর্তি করা হয়, যেটি এখন গোলাপগঞ্জে অবস্থিত। ক্লাস থ্রিতে পড়াশোনা শুরু। পরবর্তী সময়ে আমার আম্মু তাঁর ফুফুর বাড়ি ঠাকুরগাঁও চলে যান এবং সেখানে থাকতেন। কিন্তু আমার আর আম্মুর মধ্যে একটা অদ্ভুত বন্ধন ছিল, যা একে অপর ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে দেয় না। তাই কয়েক মাস পর আমার মামা আমাকে ঠাকুরগাঁও নিয়ে যান, যেখানে আম্মুর ফুফুর বাড়িতে আমাদের বসবাস শুরু হয়।
প্রায়ই মামার বাড়িতেও যেতাম, দেখা-সাক্ষাৎ করতাম। ঠাকুরগাঁওয়ে আমার আম্মুর ফুপু ছিলেন ১০৬ নং ছিটচিলারং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হেডমাস্টার। তিনি আমাকে সেই বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিলেন। তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ, নেক এবং ইসলামের আহকাম মেনে চলতেন কঠোরভাবে। সবসময় পড়াশোনায় অনুপ্রাণিত করতেন, এবং পর্দার ব্যাপারে কঠোর ছিলেন।
এই স্কুলে আমি ক্লাস থ্রি থেকে আট পর্যন্ত পড়াশোনা করি। সেখানকার স্মৃতি আজও হৃদয়ে গভীরভাবে জায়গা করে রেখেছে।
একদিন হঠাৎ রমজান মাসে, বগুড়া থেকে একজন হাফেজ সাহেব আমাদের এলাকার মসজিদে তারাবি পড়াতে এলেন। তিনি আমাদের অনেক নসিহত করতেন। ছোট ছেলেরা আমরা সব সময় তাঁর পাশে বসে থাকতাম, তার থেকে মধুর কোরআন তেলাওয়াত শুনতাম। তাঁর নরম কণ্ঠে কোরআনের আয়াতগুলো যেন আমাদের অন্তরে আলোকিত করত। তিনি আমাদের মাঝে ইসলামিক জ্ঞান ও নৈতিকতা ছড়াতেন এবং মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার গুরুত্ব বারবার বুঝাতেন।
সে সময় আমার হৃদয়ে এক অদ্ভুত আকর্ষণ জন্ম নিল। আমি বাসায় ফিরে এসে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ঘোষণা করলাম, আমি মাদ্রাসায় ভর্তি হব, আর স্কুলে যাব না। এই কথা শুনে আমার আম্মু তাঁর ফুফুকে জানালেন, “মুনীর তো মাদ্রাসায় ভর্তি হতে চায়।” এই খুশির খবর পেয়ে আমার আম্মুর ফুপু আনন্দে আত্মহারা হলেন এবং আমাকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানোর উদ্যোগ নিলেন।
দ্রুতই আমার ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু হলো। আমার আম্মুর ফুপুর বড় ছেলে ঢাকায় থাকতেন এবং তার পরিচয় ছিল আমার এক ওস্তাদের সঙ্গে। উক্ত ওস্তাদের সুপারিশে আমি ঢাকায় আসার ব্যবস্থা হল। মামা সেই রাতেই ঢাকা থেকে ঠাকুরগাঁও ফিরে গেলেন। পরের দিন আমি আমার সকল প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আম্মুর কাছে বিদায় নেওয়ার সময় আমার চোখে অশ্রু ঝরে পড়েছিল। আমার আম্মুর ফুপুর ছোট ছেলেও আমার সঙ্গে মাদ্রাসায় ভর্তি হলো।
আমরা আসলাম সাভারের মারকাজুল ইলমি ওয়াদ দাওয়াহ বাংলাদেশ মাদ্রাসায়। আলহামদুলিল্লাহ, সেখানে এসে প্রথমে আমি মক্তবে ভর্তি হলাম। এটা ছিল ২০১৪ সালের কথা। এক বছরের মধ্যে মক্তবে এবং নাজারা শেষ করলাম। নাজারা শেষ করার পর আমার পরীক্ষাও হলো, পরীক্ষা ছিল যে আমি কি হিফজ খানায় ভর্তি হতে পারবো কিনা। কারণ তখন আমার বয়স একটু বেশি হয়ে গিয়েছিল, আর সাধারণত হিফজখানায় বড় ছাত্রদের ভর্তি করা হয় না।
মাদ্রাসার বড় হুজুর ছিলেন গাজীপুরী হুজুর, আর নাজেমে তালিমাত ছিলেন মুফতি শরিফুল ইসলাম জুরাইন হুজুর। গাজীপুরী হুজুর আমাদের পরীক্ষা নিলেন এবং বললেন যে আমি হিফজখানায় উঠতে পারবো না কারণ আমার বয়স বেশি। তিনি পরামর্শ দিলেন আমাকে কিতাব খানায় ভর্তি করা হোক।
কিন্তু পরবর্তীতে আমার মক্তবের ওস্তাদ হযরত মাওলানা কারী সাহেব হুজুর এবং হেফজখানার প্রধান হাফেজ ইব্রাহিম সাহেব হুজুর (যাঁকে আমরা “হাফেজ সাহেব হুজুর” বলে ডাকি) উভয়েই আমার ব্যাপারে সুপারিশ করলেন। তাঁরা বললেন, “আমরা তার পূর্ণ দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছি, আপনি তাকে হেফজখানায় ভর্তি করিয়ে দিন, সে অবশ্যই পারবে।” ইনশাআল্লাহ।
অতঃপর আমি হিফজখানায় ভর্তি হলাম। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিন বছর আমি হিফজখানায় ছিলাম, যার মধ্যে দুই বছর ছিল সবকের বছর । দুই বছরে শেষ করলাম সবক। এবং হাফেজ হলাম।এক বছর ছিল শুনানি। এই সময়কালে আমি অনেক সুনাম এবং প্রশংসার সঙ্গে হেফজ সম্পন্ন করতে পেরেছি।শুনানির বছর যখন চলছে, তখন আমি বিনা বাটে সবিনায় বিনা লোকমায় অর্থাৎ প্রচুর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পুরা কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করেছি। আলহামদুলিল্লাহ ।মাদ্রাসার পক্ষ থেকে আমাকে পুরস্কার প্রদান করা হয় এবং বিভিন্ন প্রশ্নোত্তর প্রতিযোগিতায়ও আমি পুরস্কৃত হই। সর্বশেষ বেফাক পরীক্ষায় আমি মুমতাজ গ্রেড পেয়ে আলহামদুলিল্লাহ সাফল্যের দ্বার উন্মোচিত করেছিলাম।
এরপর ২০১৮ সালে আমি ভর্তি হলাম মিজান জামাতে, এবং ধীরে ধীরে নাহবেমির ও হেদায়াতুন্নাহ-এর পাঠ সম্পন্ন করলাম। এসময়ই শুরু হয়েছিল করোনা মহামারি। তার পর কাফিয়া শরহে বেকায়াতে উঠলাম এবং শরহে বেকায়াতে বেফাক পরীক্ষায় মুমতাজ হয়েছি। এরপর জালালাইন-এর পাঠ শেষ করলাম।
এক মাদ্রাসায় প্রায় ১২ বছর কাটানোর পর, যেহেতু জালালাইনের পর ওই মাদ্রাসায় আর সামনের জামাত নেই, তাই আমাকে ফারেগ হতে হয়। এরপর আমি ভর্তি হলাম আল্লামা হাসান জামিল সাহেব হুজুরের মাদ্রাসা জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম রুপগঞ্জ-এর মেশকাত জামাতে। আলহামদুলিল্লাহ, কিতাবখানায় থাকার সময় আমার লেখালেখির প্রতি গভীর নেশা তৈরি হয়েছিল। যার ফলে প্রতিটি কিতাবের আলোচনা আমি দরসে লিখে ফেলতাম।
আরবি ও বাংলায় বিভিন্ন মাকালা লিখেছি। মানতেক বিষয়ক একটি কিতাব লিখেছি, যার শিরোনাম مفتاح المنطق। ছাত্রদের তামরিনের জন্য مفتاح العربيه নামক একটি গ্রন্থও রচনা করেছি। বর্তমানে ফিকহ বিষয়ক লেখালেখি করছি এবং কাফিয়া, হেদায়াতুন্নাহসহ অন্যান্য কিতাবের আদোপান্ত তাকরীর লিখেছি। লেখালেখির কাজ এখনও চলমান রয়েছে। ইনশাআল্লাহ, সামনে আরও অগ্রসর হতে চাই এবং বিভিন্ন বিষয়ে কিতাব রচনা করব। আল্লাহ তৌফিক দান করুন।
আমি সংক্ষিপ্ত আকারে আমার এই জীবনী উল্লেখ করলাম। বিস্তারিত জীবনী, জন্মের শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত, লেখার কাজ চলছে এবং শীঘ্রই পুরো জীবনী প্রকাশ পাবে। কারণ আমার এই ক্ষুদ্র জীবনে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে যেগুলো কলম ও কাগজে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। অনেক শিক্ষণীয় বিষয় এতে রয়েছে। আল্লাহর কৃপায় আমার জীবন অনেক কিছু উপহার দিয়েছে, তাই ইলমের আমানত হিসেবে আমাকে এই পথ ধরে এগিয়ে যেতে হবে।
আলহামদুলিল্লাহ, মারকাজুল ইলমি তে থাকা অবস্থায় চাঁদপুরী হুজুরের পরামর্শে আমি প্রত্যেক বছরের রোজনামচা তৈরি করেছি। বিশেষ করে কিতাবখানায় থাকা সময়ের প্রত্যেকটি বছরের রোজনামচা আমার কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এমনকি দুই বছরের রোজনামচা তো কম্পোজ হয়ে গিয়েছে । আলহামদুলিল্লাহ।।আমি সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তোমাদের সামনে উল্লেখ করলাম।তোমরা আমার জন্য দোয়া করবে।যাতে আমার মনের নেক আশা আল্লাহ কবুল করেন।বাবা মারা যাওয়া সন্তান হিসেবে আল্লাহর সাহায্য যেন প্রতি মূহুর্তে থাকে।বিশেষত আমার লেখালেখির কাজ যেন খুব দ্রুত আগাতে থাকে। এজন্য খুব দোয়া করবে।আমীন ।যারা আমীন বলবে আল্লাহ তার মনের আশাকেও কবুল করুন আমীন ।।
Comments
Post a Comment