পরীক্ষা: সময়ের হেফাজত, সফলতার চাবিকাঠি
পরীক্ষা: সময়ের হেফাজত, সফলতার চাবিকাঠি
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা দ্বীনের দ্বীপ্তি
প্রিয় ভাই, তুমি তো জানোই, আমরা ইলমের ময়দানে রয়েছি। এই পথ কেবল মুখে বুলি আউড়ানোর নয়, বরং একনিষ্ঠ পরিশ্রম, তাকওয়া ও ধৈর্যের অনুপম পরীক্ষাগুলোর ময়দান। এই পরীক্ষাগুলো কেবল প্রশ্নপত্রের নয়, বরং আমাদের নিয়্যাত, মনোযোগ, দায়িত্ববোধ এবং সময় ব্যবস্থাপনারও পরীক্ষা। আজ আমি তোমার সঙ্গে হৃদয় নিংড়ানো কিছু কথা ভাগ করে নিতে চাই, যা হয়তো তোমার চলার পথে একটুখানি আলোর রেখা হতে পারে।
দেখো ভাই, পরীক্ষার সময়কে হালকা করে দেখা এক তালিবুল ইলমের জন্য কতটা দুঃখজনক, সেটা তুমি উপলব্ধি করতে পারো কি? আমরা যারা দ্বীনের ইলম অর্জন করছি, আমাদের চলা-ফেরা, বসা-উঠা, পড়া-লেখা—সবই আমানত। এই আমানতের হিসাব তো একদিন দিতে হবে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বলেন, "وَقِفُوهُمْ ۖ إِنَّهُم مَّسْئُولُونَ" — “তাদের থামাও, নিশ্চয়ই তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা ছাফফাত: ২৪)
তুমি যদি আজকে অবহেলা করে সময় কাটাও, আগামীকাল সেই সময় হয়তো তোমাকে আর পাওয়া যাবে না। পরীক্ষার সময়টা আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ সুযোগ, যেখানে তুমি নিজের চেষ্টা ও সততার দ্বারা প্রমাণ করতে পারো—তুমি সত্যিই ইলম চাও। শুধু ক্লাসে বসে থাকা নয়, বরং সেই ইলমের মর্যাদা রক্ষা করা। আর একথা ভুলে যেও না, পরীক্ষার খাতায় তোমার অগ্রগতি বা পিছিয়ে পড়া কেবল নম্বরের বিষয় নয়, বরং তোমার পরিশ্রম, সততা, এবং সঠিক পরিকল্পনারও প্রতিচ্ছবি।
অনেকেই বলে থাকে, “পড়া অনেক বেশি, মনে থাকে না, পড়তে ইচ্ছা করে না।” ভাই, এইসব হচ্ছে নফসের ধোঁকা। আমরা যদি একটু সাহস করি, একটু পরিকল্পনা করি, তাহলে দেখা যাবে—এই ‘মনে না থাকা’র অন্ধকার কেটে যাবে, ইনশাআল্লাহ। আমাদের পূর্বসূরি ওলামায়ে কেরাম কীভাবে যুগ যুগ ধরে হাজার হাজার হাদীস মুখস্থ করে রাখতেন? তাঁরা তো আমাদের মতো স্মার্টফোন ব্যবহার করতেন না, তবুও তাদের সাফল্যের চাবিকাঠি ছিল—ইখলাস, ইন্তেজাম আর মেহনত।
তুমি নিশ্চয়ই জানো, সাহাবাদের মধ্যে কতজন অল্প সময়ে ইলম শিখে অগ্রগামী হয়েছেন। আর আমরা তো এত সুযোগ-সুবিধা পেয়েও পিছিয়ে পড়ি কেবল গাফলতির কারণে। সময় হলো একটি ছুরি, তুমি যদি এটা দিয়ে ইলমের ফল কেটে খাও, তাহলে তা উপকারী। আর যদি অবহেলায় কাটাও, তাহলে সে ছুরিই একদিন তোমাকে কেটে ফেলবে।
পরীক্ষার পূর্বে প্রস্তুতির জন্য কয়েকটি পয়েন্ট আমি বলছি, যা তুমি ইনশাআল্লাহ অনুসরণ করলে উপকার পাবে:
- ১. নিয়মিত ও নির্দিষ্ট পরিকল্পনায় পড়া শুরু করো। প্রতিদিনের সময় ভাগ করে লেখাগুলো ছোট ছোট টুকরোতে ভাগ করো। যেমন—সকাল ৯টা থেকে ১০টা: হিদায়াহ্, ১০:১৫ থেকে ১১:১৫: কাফিয়া ইত্যাদি।
- ২. বুঝে পড়ার চেষ্টা করো। মুখস্থ করার আগে বিষয়বস্তু বুঝতে চেষ্টা করো। মনে রাখবে, বুঝে পড়া সহজে ভুলে যায় না।
- ৩. লিখে লিখে পড়ো। মনে না থাকলে একবার লেখো, আবার পড়ো। এতে অনেক ভালো ফলাফল হয়।
- ৪. ছোট ছোট রিভিশনের মাধ্যমে আগের পড়া ঝালাই করো।
- ৫. পরীক্ষাকে ইবাদতের একটি অংশ মনে করো। সৎ নিয়ত নিয়ে, খুশু ও খুযুর নিয়ে মেহনত করো।
ভাই, অনেক সময় আমরা “সবার তো এমনই হয়” এই বলে নিজেদের ব্যর্থতা ঢেকে ফেলি। কিন্তু ভুলে যেও না, কিয়ামতের দিন “সবাই করেছে” বলে নিজের ভুলের দায় এড়ানো যাবে না। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককেই আলাদা হিসাবের জন্য ডাকবেন। কাজেই তুমি নিজের দায়িত্বকে গুরুত্ব দাও।
পরীক্ষার খাতায় তুমি যদি নকল না করে, সৎভাবে নিজের পড়া লিখে আসো—even যদি নম্বর কম হয়, তবুও সেটাই তোমার জন্য বরকতের দরজা খুলে দিতে পারে। হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য কিছু ছেড়ে দেয়, আল্লাহ তার জন্য উত্তম কিছু রাখেন।”
তোমার প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ। পড়ার মাঝে দোয়া করো, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ো, পরীক্ষা শুরুর আগে ও পরে দুই রাকাআত নামাজ পড়ে দোয়া করো। তুমি দেখবে, আল্লাহর সাহায্য এমনভাবে আসবে, যা কল্পনাও করতে পারো না।
শেষের দিকে একটা কথাই বলি ভাই, পরীক্ষাকে ছোট মনে করো না। এটা ইলমের পথে তোমার দৃঢ়তা ও দায়িত্ববোধের একটি ময়দান। এখানে তুমি যদি সাহস, মেহনত ও ইখলাসের সাথে কাজ করো, তবে ইনশাআল্লাহ সফলতা তোমার পায়ের নিচে এসে দাঁড়াবে। আমি দোয়া করি, আল্লাহ যেন তোমাকে এবং আমাদের সকলকে পরীক্ষার এই ময়দানে সফলতা দান করেন।
— মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা,
একজন তালিবে ইলম
Comments
Post a Comment