একজন মুহাক্কিক তালিবে ইলমের দিনলিপি
একজন মুহাক্কিক তালিবে ইলমের দিনলিপি
✍ মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
আমি একজন তালিবে ইলম। কিন্তু শুধু একজন সাধারণ ছাত্র হয়ে নয়—আমি চাই মুহাক্কিক তালিবে ইলম হতে, সেই ইলমপিপাসু ব্যক্তি যিনি কিতাবের গভীরে প্রবেশ করেন, যিনি কেবল পড়ে না, বুঝেন; কেবল মুখস্থ করেন না, বরং চিন্তা করেন। আমি নিজেকে গড়ে তুলছি ধীরে ধীরে এমন এক অভিযাত্রায়, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ইলমে পরিণত হচ্ছে আমল ও আলোকের রূপে।
সকাল শুরু হয় দুআ দিয়ে
প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই ঘুম থেকে উঠি। তাহাজ্জুদের দু’ফোটা অশ্রু, সুবহানাল্লাহ, একটু ইস্তিগফার—তারপর এক কাপ চা আর সামনে খোলা থাকে কোনো হাদীসের কিতাব, কখনো রিয়াযুস সালিহীন, কখনো শরহে মেশকাত। আমার সকাল শুরু হয় ইলমের দোয়া দিয়ে:
اللهم انفعني بما علمتني، وعلمني ما ينفعني، وزدني علماً
— (তিরমিযী: ৩৫৯৯)
দরস ও দরসের মাঝে চলাফেরা
দিনের প্রথম দরসে প্রবেশ করি নিজের মধ্যে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে—আমি শুধু পড়বো না, বুঝবো, লিখে রাখবো, এবং পরে রেফারেন্সসহ গবেষণা করবো। মাদ্রাসার ক্লাসে কাফিয়া, হেদায়া, তাফসীর জালালাইন — প্রতিটি কিতাব যেন আমার হৃদয়ে ছাপ ফেলে যায়।
ওস্তাদের প্রশ্নে উত্তর দেই আত্মবিশ্বাস নিয়ে। বুঝে না বুঝে মাথা নাড়াই না, না বুঝলে আবার জিজ্ঞেস করি। কারণ মুহাক্কিক হওয়ার মানে হচ্ছে: জানার আগ্রহে অজানা প্রশ্ন করাই।
বিরতিতে কিতাব নিয়ে বসা
অনেকে যখন হোস্টেলের ছাদে গল্পে মেতে থাকে, আমি তখন লাইব্রেরিতে চলে যাই। ফাতহুল বারি, আল-ইবানা, মুয়াত্তা — এসব বইয়ের পাতায় আমি একেকটা জগত আবিষ্কার করি। কেউ দেখে বলে: "তুমি তো একদম কিতাবের পোকা!" আমি হাসি, কারণ এটাই আমার গর্ব।
قال الإمام أحمد رحمه الله: "مع المحبرة إلى المقبرة"
— سير أعلام النبلاء (١١/٢٩٦)
ইমাম আহমদ বলতেন: “দোয়াত থাকবে আমার কবর পর্যন্ত।” এই কথাটাই যেন আমার প্রেরণা।
রাতের বেলা কিতাবের সাথে নির্জনতা
আমি রাতকে বানিয়েছি আমার গবেষণার সময়। যখন সারা মাদ্রাসা ঘুমায়, আমি তখন এক কোণে বসে আল-মাজমু' কিংবা ইলালুত তিরমিযী খুলে বসি। আমি কিতাব পড়ি, তার হাওলা খুঁজি, কাহিনী বা ঘটনা নয়—ফিকহী ইখতেলাফ, উসূলের ব্যাখ্যা, মুহাদ্দিস ও ফুকাহার মতামত বোঝার চেষ্টা করি।
আমি কিতাব খুঁজি, আলো খুঁজি
আমার কাছে কিতাব মানে শুধু সিলেবাস নয়—কিতাব মানে আলো। যখন তাদরীবুর রাওয়ী পড়ি, তখন মনে হয়, আমি একজন রাবির মুজাহিদ। যখন আল-মুহাল্লা পড়ি, তখন মনে হয় ইমাম ইবনু হাযম যেন আমার সঙ্গে তর্কে লিপ্ত।
قال ابن جماعة رحمه الله: "ينبغي لطالب العلم أن يكون له ورد من المطالعة في كتب العلم كل يوم"
— تذكرة السامع والمتكلم (ص: ٦٨)
আমি মুহাক্কিক হতে চাই, মুখস্থকারী নয়
মুখস্থ করাও দরকার, কিন্তু তার চেয়ে বড় দরকার বুঝে গ্রহণ করা। তাই আমি যখন হাদীস পড়ি, তার ব্যাখ্যা পড়ি, ফিকহে তুলনা করি, এবং সালাফদের মতের আলোকে বুঝি।
একজন মুহাক্কিক কেবল তথ্য জড়ায় না, বরং তথ্য বিশ্লেষণ করে। আমি তা-ই হতে চাই।
ইলমী সফর ও সাক্ষাৎ
সুযোগ পেলেই বড় বড় আলেমদের কাছে গিয়ে বসি। তাঁদের থেকে ইজাযা নিই, প্রশ্ন করি। হাটে-ঘাটে নয়, বরং দরসের মজলিসে গিয়ে মিশে যাই। আমি চাই, তাদের সান্নিধ্য আমার অন্তরকে শুদ্ধ করুক।
قال ابن المبارك رحمه الله: "لو قيل لي متّ غداً، ما قدرت أن أزيد شيئًا من العمل"
— سير أعلام النبلاء (٨/٤٢٠)
পরিশেষে বলতে চাই
হে প্রিয় পাঠক, আমি এখনো পথের শুরুতে। তবে আমি চেষ্টা করছি—একজন মুহাক্কিক তালিবে ইলম হওয়ার, যে দিনরাত কিতাবের আলোয় নিজেকে গড়ে তোলে। যিনি শুধু পাস করার জন্য পড়েন না, বরং উম্মাহর সামনে আলো হয়ে দাঁড়াবার জন্য পড়েন।
আমার অনুরোধ, তোমরাও এ পথে আসো—কিতাবের বন্ধু হও, উস্তাদের অনুগত হও, দোয়ায় নিজেকে ভাসিয়ে দাও। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মুহাক্কিক, মুখলিস, আমলদার তালিবে ইলম বানান। আমিন।
✍ মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
Comments
Post a Comment