কুরবানী ঈদের দিন: করণীয় ও বর্জনীয়
কুরবানী ঈদের দিন: করণীয় ও বর্জনীয়
ভূমিকা
ঈদুল আজহা মুসলমানদের জন্য একটি বিশেষ আনন্দের দিন, তবে এই আনন্দ শুধুই খাওয়া-দাওয়া, ভ্রমণ বা পরস্পরের সাক্ষাৎ নয়—বরং এটি আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের একটি মহান উপলক্ষ। হযরত ইব্রাহীম (আ.) এবং হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর স্মরণীয় ত্যাগের স্মরণে এই দিনটি মুসলিম জাতির হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সমাজে সাম্য, সহানুভূতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের উন্নয়ন ঘটে। সুতরাং ঈদের দিনটিকে কেবল আনন্দের দিন না বানিয়ে বরং ইবাদত, সহানুভূতি এবং সমাজকল্যাণের দিন বানানোই প্রকৃত মুসলিমের পরিচয়।
ঈদের আগের রাত
ঈদুল আজহার রাতকেও ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। হাদীসে এসেছে, “যে ব্যক্তি ঈদের রাত জাগরণ করে ইবাদত করে, তার হৃদয় সেই দিন মৃত হবে না যেদিন অন্য সবার হৃদয় মৃত হবে।” (ইবনে মাজাহ)
- পবিত্রভাবে রাত কাটানো, গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
- ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত, জিকির, দোয়া ও নফল নামাজে ব্যস্ত থাকা।
- আগামী দিনের প্রস্তুতি নেওয়া (পোশাক, গোসলের সামগ্রী, কুরবানীর আয়োজন)।
ঈদের সকাল
ঈদের দিন সূর্যোদয়ের আগে উঠেই গোসল করে, মিসওয়াক করে, উত্তম পোশাক পরিধান করে এবং সম্ভব হলে সুগন্ধি ব্যবহার করে প্রস্তুত হওয়া উত্তম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঈদের দিন এই আমলগুলো করতেন। ঈদের দিন সুবহে সাদিক থেকে নামাজের আগ পর্যন্ত তাকবির বলা সুন্নাত। পুরুষরা উচ্চস্বরে এবং নারীরা নিচু স্বরে বলবে:
اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَاللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ وَللهِ الْحَمْدُ
ঈদের নামাজ
ঈদের নামাজ আদায় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। এটি জামাতে আদায় করতে হয়। ঈদের নামাজে আজান বা ইকামত নেই। নামাজ আদায়ের পর খুতবা শুনা সুন্নাত।
কুরবানী: ঈদের মূল উপহার
সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব। কুরবানী কেবল পশু জবাই নয়, এটি একটি আত্মত্যাগের প্রতীক। হজরত ইব্রাহীম (আ.) যখন তাঁর প্রিয় সন্তান ইসমাঈল (আ.)-কে আল্লাহর আদেশে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত করলেন, তখন থেকেই শুরু হলো এই মহান ইবাদতের ইতিহাস।
- কুরবানীর পশু হতে হবে নির্দোষ ও নির্ধারিত বয়স সম্পন্ন।
- জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহু আকবার’ বলা ফরজ।
- গোশত তিন ভাগে ভাগ করে—একভাগ আত্মীয়স্বজন, একভাগ গরীব-মিসকিন, একভাগ নিজে রাখা উত্তম।
সামাজিক দায়িত্ব
ঈদের আনন্দ যেন গরিব-দুঃখীদের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ে সেটিই ইসলামের দাবি। তাই কুরবানীর গোশত থেকে শুরু করে পোশাক, টাকা-পয়সা, খাবার ইত্যাদি বিতরণের মাধ্যমে সমাজের অবহেলিত শ্রেণিকে স্মরণ করা উচিত। কেবল আত্মীয়-স্বজন বা বন্ধু-বান্ধবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে ঈদের মূল শিক্ষা ভুলে যাওয়া হবে।
পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিধি
অনেক এলাকায় কুরবানীর রক্ত, আবর্জনা, হাড় ও চামড়া রাস্তা-ঘাটে পড়ে থেকে দুর্গন্ধ ও রোগব্যাধির সৃষ্টি করে। এটি সম্পূর্ণ অনুচিত।
- পশু জবাইয়ের নির্ধারিত স্থান নির্বাচন করা।
- পরে সেই স্থান ধুয়ে-পঁছিয়ে পরিষ্কার রাখা।
- আবর্জনা নির্দিষ্ট পাত্রে রেখে পরিষ্কার কর্মীদের সহায়তা করা।
পরিবার ও আত্মীয়তার বন্ধন
ঈদের এই দিনটি পরিবার-পরিজনের সঙ্গে কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এদিন ছেলে-মেয়েদের আনন্দ দেওয়া, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হাসি-আনন্দে সময় কাটানো, এবং আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা আমাদের সমাজকে সুদৃঢ় করে।
ঈদের দিনের কিছু বর্জনীয় কাজ
- ঈদের দিনে রোজা রাখা হারাম।
- ঈদের নামাজের আগে নফল নামাজ পড়া নিরুৎসাহিত।
- গান-বাজনা, মেলা-মশলা, নারীদের অবাধ চলাফেরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- ঈদের দিন কুরবানীর অংশ বিক্রি করা বা কসাইকে পারিশ্রমিক হিসেবে গোশত দেওয়া হারাম।
- অপচয়, লৌকিকতা, ফটোশুট ও সামাজিক মাধ্যমে অহংকারমূলক পোস্ট থেকে বিরত থাকা জরুরি।
উপসংহার
কুরবানী ঈদ কেবল একটি আনন্দের দিন নয়, এটি শিক্ষা, ত্যাগ, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ইসলামী আদর্শ বাস্তবায়নের একটি বিরল সুযোগ। কুরবানীর পশু জবাই যেমন জরুরি, তেমনই আমাদের কামনা-বাসনাকে জবাই করাও জরুরি।
তাই আসুন, এই দিনটিকে সঠিকভাবে পালন করি। আত্মশুদ্ধি, আল্লাহভীতি, সহানুভূতি ও সামাজিক কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করি। যাতে করে এই ঈদ সত্যিকারের ‘আনন্দ উৎসব’ হয়ে ওঠে দুনিয়া ও আখিরাতে মুক্তির সোপান।
Comments
Post a Comment