হে তালেবে ইলম তোমাকে

             হে তালেবে ইলম তোমাকে ৭ম পর্ব

                মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা 

মেছাল আসলে কথা সাফ হয়। তাই ছোট্ট একটা মেছাল দেই। আমরা অনেকসময় বাসে যাতায়াত করি। কখনো বাসে ভিড় থাকে। বাসে ভিড় দেখলে বিরক্ত লাগে কি না? বিরক্ত লাগে। অর্থাৎ অতিরিক্ত মানুষ দেখলে বিরক্ত লাগে। এত মানুষ কোত্থেকে এল? প্রশ্ন হল, অতিরিক্ত মানুষটা কে? অন্যরা, নাকি আমি? নিজের ব্যাপারে কিন্তু যেহেনে আসে না যে, আমি অতিরিক্ত। আমি না থাকলে অন্যরা আরো স্বাচ্ছন্দ্যে থাকতে পারত। নিজের ব্যাপারে এই ভাবনাটাই হল আ‘লা ফিকির। পক্ষান্তরে আমিই মূল; আমি ছাড়া এত মানুষ উঠল কেন- এটা হল স্থূল চিন্তা।

একটা ঘটনা। একজন হুজুর সিএনজিতে যাচ্ছেন। সিএনজিতে সাধারণত পেছনে তিনজন বসে আর সামনে দুইজন। সব জায়গায় তো সামনে বসার ফযীলত নেই। সিএনজিতে পেছনের ফযীলত বেশি। এতে রাহাত ও ইকরাম বেশি হয়। পেছনে জায়গা না থাকলেই সামনে বসা হয়। কখনো এরূপ পরিস্থিতি দাঁড়ায় যে, পেছনের লোক সামনে যেতে হয়। তো এমন একটা হালত তৈরি হল যে, পেছনের একজনকে সরতে হবে। কথার কথা, একজন মুরব্বী আসলেন, যার সামনে বসা কঠিন। তাহলে এখন একজনকে তো সামনে যেতে হবে। কিন্তু কে যাবে? এখানে তো সামনে বসার ফযীলত নেই; তাই কেউ সামনে যেতে চায় না।

তবু একজন গিয়েছেন। যিনি গিয়েছেন তিনি সমঝদারির কাজ করেছেন তাই না? তিনি হলেন সেই হুজুর। তবে তার যেহেনে আসল, আমাকে যদি এরা চিনত তাহলে আমাকে আর সামনে পাঠাত না। তারা তো আর পাঠায়নি; উদ্দেশ্য হল, আমার যাওয়ার প্রয়োজন হত না; বরং তারাই সামনে চলে যেত আর আমাকে ইকরামের সঙ্গে পেছনে বসাত। এই চিন্তাটা স্থূল। সঠিক চিন্তা হল, আমাকে চেনে না- এ কারণেই তো আমি সিএনজিতে জায়গা পেয়েছি। বাস্তবেই যদি এরা আমাকে চিনত যে আমি কী, আমার ভেতরটা কী, তাহলে এতক্ষণ আমার সিএনজিতে বসে থাকারও সুযোগ হত না। এটা হল আ‘লা চিন্তা। এটা যদি প্রথমে না এসে  পরে আসে, তাহলেও আলহামদু লিল্লাহ। এরকম শত জিনিস আছে আমাদের চব্বিশ ঘণ্টার যিন্দেগীতে। একেক সময় একেক পরিস্থিতি আসে; সেগুলোকে আমরা দুইভাবে চিন্তা করতে পারি। একটা হবে স্থূল, আরেকটা হবে গভীর। তবে সব বিষয়েই তালিবে ইলমের ফিকিরটা হতে হবে আ‘লা। সাতহী বা ভাষাভাষা ফিকির হলে চলবে না।

এই যে মানুষ ভবিষ্যত নিয়ে ভাবে- এটাকে আপনি দুইভাবে চিন্তা করতে পারেন। 

এক ভবিষ্যত তো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। আরেক ভবিষ্যত হল মৃত্যুর পর থেকে। ভবিষ্যত নিয়ে ভাবা ভালো; কোনো আপত্তি নেই। এমনকি মওতের আগ পর্যন্ত যে ভবিষ্যত সেটা নিয়েও যদি তরীকামত ভাবে তাতেও আপত্তির কিছু নেই। কিন্তু আমি মওতের পরের যে ভবিষ্যত এবং আসল যে ভবিষ্যত সেটা নিয়ে ভাবলাম না। কুরআন মাজীদে আছে-

وَ لْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَّا قَدَّمَتْ لِغَدٍ.

প্রত্যেকেই ভেবে দেখুক, আগামীকালের জন্য সে কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। -সূরা হাশর (৫৯) : ১৮

আগামী দিনের জন্য ভাবছ, কিন্তু আসল আগামী দিনের জন্য কি ভাবছ? আসল ভবিষ্যতের জন্য ভাবা- এটা আ‘লা চিন্তা। আর ফিকিরটাকে চোখের সামনের ভবিষ্যতের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলাটা হল স্থূল চিন্তা। মোটকথা তালিবে ইলমের ফিকিরটা হতে হবে আ‘লা ফিকির।

আমি যা বলতে চেয়েছি, আশা করি সেটা পরিষ্কার হয়েছে। এটা কি নতুন কথা? পুরনো কথা। তালিবে ইলমের ফিকিরটা আ‘লা হতে হবে। সবকিছুর মধ্যেই এই খেয়ালটা রাখতে হবে। স্থূল কোনো চিন্তা যেন আমার দিল-দেমাগে জায়গা না করতে পারে। আসা-যাওয়া করতে পারে। ওয়াসওয়াসা আসতে পারে। এতে সমস্যা নেই। মানুষ তো দুর্বল। কিন্তু স্থূল চিন্তা দিল-দেমাগে স্থির হয়ে যাবে এটা তালিবে ইলমের শান হতে পারে না। স্থূল চিন্তাকে দূর করতে হবে। তালিবে ইলমের চিন্তায় গভীরতা থাকতে হবে, উৎকর্ষের গুণ থাকতে হবে। এটা হল ফিকরে আরজমান্দ। ফিকরে আরজমান্দওয়ালা ব্যক্তিদের মধ্যে দিলের ব্যাধি থাকে না; আস্তে আস্তে সাফ হয়ে যায়।

অন্য কোনো তালিবে ইলমকে তারাক্কি করতে দেখলে আমার দিল সংকুচিত হবে, নাকি খোশ হবে? খোশ হবে। মুনাফাসাত ভালো জিনিস। কুরআনে আছে-

وَ فِیْ ذٰلِكَ فَلْیَتَنَافَسِ الْمُتَنَافِسُوْنَ.

এ বিষয়ে প্রতিযোগীরা প্রতিযোগিতা করুক। -সূরা তাতফীফ (৮৩) : ২৬

কে কার আগে যাবে, এটার চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সব তালিবে ইলমের মধ্যে এই প্রতিযোগিতামূলক মেহনত থাকা চাই। এটা খুব ভালো। কিন্তু প্রতিযোগিতা হলে কেউ আগে কেউ পরে তো হবেই। কখনো বরাবরও হতে পারে। কিন্তু আমি যদি পিছে পড়ি, তাহলে আমি কি আমার উপর নারাজ হব, না যে তালিবে ইলম এগিয়ে গেছে তার উপর নারাজ হব? আমার উপর নারাজ হব। সে আগে যাওয়ার কারণে আমার মনে কষ্ট লাগলে সেটা স্থূল চিন্তা। আর আ‘লা চিন্তা হল, হায়! আমি পিছে থেকে গেলাম। নিজেকে দোষ দেওয়া আর অন্যের ব্যাপারে খুশি হওয়া যে, মাশাআল্লাহ সে মেহনত করেছে, সে আগে গিয়েছে। মনে কষ্ট আসতে পারে -মানুষ তো- কিন্তু সেটাকে দূর করে ফেলতে হবে। আল্লাহর শোকর আদায় করা। বা-তাকাল্লুফ, মনে চাইছে না তবু বলেন, আলহামদু লিল্লাহ, খুশি হলাম আপনি আগে গিয়েছেন। মনে খুশি হননি তবু বলেন। তাহলে মনের এই দুর্বলতাটা দূর হয়ে যাবে। আর নিজেকে তিরস্কার করে বলবেন যে, আমি পেছনে পড়ে গেছি।ফিকরে আরজমান্দ পুরো জিন্দেগীর বিষয়। জিন্দেগীর সকল শাখায় এটা কার্যকর। এটা আমাদের আকাবিরের শিআর। তালিবে ইলমের মাঝে এই সিফাত আস্তে আস্তে বাড়তে হবে।

এই হল ফিকরে আরজমান্দ। আর দিলে দরদমান্দ সম্পর্কে বলা আসলে আমার যবানে সাজে না। ওগুলোও সাজে না, তারপরও একটা...। কিন্তু দিলে দরদমান্দ সম্পর্কে বাহার হাল এখানকার দিলওয়ালা হুজুর যারা আছেন, তাঁরাই বলবেন, বলে থাকেন এবং আরো বলবেন। এটা তালিবে ইলমের আরেকটা সিফাত।

কয়টা সিফাাত বললাম? হিফয, ফাহম, ফিকরে আরজমান্দ এবং দিলে দরদমান্দ। তালিবে ইলমকে এসব সিফাত হাসিল করতে হবে।

যাইনুদ্দীন ইরাকী রাহ. (৭২৫ হি.-৮০৬ হি.) সম্পর্কে তাঁর উসতায জামালুদ্দীন ইসনাবী  (الإسنوي) রাহ. (৭০৪ হি.-৭৭২ হি.) বলেছেন-

إن ذهنه صحيح، لا يقبل الخطأ.

অর্থাৎ তার যেহেন সাফ-সালীম। সে গলত কথা গিলতে পারে না। সুতরাং একজন গলত কথা বলবে আর তালিবে ইলম সেটা গিলে ফেলবে, একটু তাওয়াক্কুফও হবে না- এটা কেমন কথা। একটা গলত কথা, গলত চিন্তা, গলত দাওয়াত আসলে তালিবে ইলমের মধ্যে এই ভাবটা আসতে হবে যে, এটা কেমন কথা হল? আচ্ছা আমি হুজুরদেরকে জিজ্ঞেস করব। হুজুরদের সামনে পেশ করব। অথচ অনেকের এই অনুভূতিটাই নেই; বরং হুজুরদের থেকে দূরে রাখবে। বলবে, হুজুররা এসব বুঝবেন না। তারা পুরনো মানুষ। বেখবর মানুষ। তারা এসব বুঝবেন না। যারা একথা বলে, ওদেরকেই কিছুদিন পর তাদের ছাত্ররা একথা বলবে। তারা পুরনো হওয়ার কারণে বেখবর হয়ে গেছেন, বুঝবেন না; তুমিও তো একদিন পুরনো হবে। তুমি কয়দিন আর জোয়ান থাকবে। কয়েকদিন পর তোমারও তো বয়স হবে। তখন তোমার শাগরিদরাও এই কথা বলবে। এগুলো হল আমারাতুল ফিতান। গলত দাওয়াতের আলামত। খাসিয়াত বলিনি। কোনো সহীহ কথাও কখনো কেউ এই শিরোনামে পেশ করে। করা উচিত নয়। কিন্তু এটা যে গলত দাওয়াতের একটা আলামত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। আকাবিরের ব্যাপারে বদগুমানি পয়দা করা ও বদ যবানি করা এটা ফেতনার আলামত। ওই দাওয়াতকে যদি তুমি শরীয়তের আদিল্লা ও কাওয়ায়েদে শরীয়তের আলোকে বিশ্লেষণ কর, দেখবে ওটা গলত। সহীহ দাওয়াতওয়ালা সাধারণত এরকম শিরোনাম গ্রহণ করে না। কখনো জযবা এসে গেলে কেউ করে, কিন্তু সেটা মুকতাদা হয় না। গলত দাওয়াতই সাধারণত এই পোষাকে আসে।

চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগের কট্টর সালাফী ও সাহাবা বিদ্বেষীদের কিছু নযরিয়া, সাধারণ সালাফীরা যেটাকে গ্রহণ করে না, সেগুলোকে কওমী মাদরাসায় ঢুকাচ্ছে কিছু লোক; তাহকীকের নামে, ইলমের নামে। এগুলো এদের আবিষ্কার নয়। নেটে ঢুকে মাওয়াদ-তোহফা এনে সেগুলো বিতরণ করে।

ليس من كدِّه ولا من كدِّ أبيه.

এগুলো তাদের মেহনত নয়। এগুলো আল্লাহর রহমতে আমরা অনেক আগে দেখেছি এবং দেখে রেখে দিয়েছি। এগুলো প্রচারযোগ্য নয়। এই আফকার ইশাআতযোগ্য নয়। সেই আফকার এখন তারা মুজাদ্দিদ সেজে, মুজতাহিদ সেজে প্রচার করছে। তালিবে ইলমের ফাহম যদি সালীম হয় তাহলে সে এই দাওয়াত কবুল করতে পারে না।

যাইহোক, তালিবে ইলমের অনেক সিফাত। আজকে এই চারটাই থাকল। ফাহম, হিফয, ফিকরে আরজমান্দ এবং দিলে দরদমান্দ। আল্লাহ তাআলা এই চারটা সিফাত এবং তালিবে ইলমের অন্যান্য সিফাত আমাদেরকে নসীব করুন- আমীন।

আলহামদুলিল্লাহ অবশেষে ৭ পর্বে আমাদের এই আলোচনা শেষ হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এই আলোচনা থেকে ইস্তিফাদা নেওয়ার তৌফিক দান করুন আমীন।




Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি