তাকওয়া: আত্মার পবিত্রতা ও আল্লাহভীতির দীপ্তিময় পথ
তাকওয়া: আত্মার পবিত্রতা ও আল্লাহভীতির দীপ্তিময় পথ
লেখক: মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা, দ্বীনের দীপ্তি
ভুমিকা:
ইসলামী জীবনের পরিশুদ্ধতা, সফলতা ও আত্মার পূর্ণতা নির্ভর করে যে গুণটির ওপর, তার নাম হলো তাকওয়া। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় পরিভাষা নয়; বরং তাকওয়া হল এক অন্তর্জাগতিক আলোকবর্তিকা, যা মুমিনের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণে সজীব রাখে, গুনাহ থেকে বাঁচায় এবং সৎ আমলের পথে পরিচালিত করে।
তাকওয়ার সংজ্ঞা:
আভিধানিক অর্থ: ‘تَقْوَى’ শব্দটি এসেছে আরবি ‘وَقَى’ ধাতু থেকে, যার অর্থ হলো রক্ষা করা, বাঁচানো।
ইসলামী পরিভাষায়: তাকওয়া বলতে বোঝানো হয়—আল্লাহর ভয়, ভালোবাসা ও সম্মানের ভিত্তিতে তাঁর আদেশ পালনে সচেষ্ট থাকা এবং নিষেধ থেকে বেঁচে থাকা।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: “তাকওয়া হল আল্লাহর ভয়ে নিষিদ্ধ কাজ পরিহার করা।”
ইবনু রজব (রহ.) বলেন: “তাকওয়া মানে, আল্লাহ যেসব কাজ হারাম করেছেন, তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা।”
কুরআন ও হাদীসের আলোকে তাকওয়া:
কুরআনের আলোকে:
- সূরা বাকারা – ২:২
“এই কিতাব সন্দেহাতীত; মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” - সূরা হুজরাত – ৪৯:১৩
“আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি।” - সূরা আলে ইমরান – ৩:১০২
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো।”
হাদীসের আলোকে:
- তিরমিজি শরীফ: “তুমি যেখানেই থাকো, আল্লাহকে ভয় করো।” (তিরমিজি: ১৯৮৭)
- সহীহ মুসলিম: “আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক রূপ নয়, বরং তোমাদের অন্তর ও আমল দেখে বিচার করেন।”
তাকওয়ার প্রকারভেদ:
- সাধারণ তাকওয়া (عام التقوى): শিরক, কুফর, ও প্রকাশ্য গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা।
- বিশেষ তাকওয়া (خاص التقوى): সন্দেহযুক্ত ও মাকরূহ কাজ থেকেও বিরত থাকা।
- উচ্চ স্তরের তাকওয়া (أخص التقوى): অন্তরের লালসা, অহংকার, আত্মপ্রশংসা প্রভৃতি আত্মিক ব্যাধি থেকে পবিত্র থাকা এবং কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবন পরিচালনা করা।
তাকওয়া ও চার মাযহাব:
- হানাফী মাযহাব: ইমাম আবু হানীফা (রহ.) তাকওয়াকে এমন আত্মিক অবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা মানুষকে ফরজ আদায় ও হারাম পরিহারে দৃঢ় করে তোলে।
- মালিকী মাযহাব: তাকওয়া হল অন্তরের সেই শক্তি, যা মানুষকে আল্লাহর ভয়ে পাপকর্ম থেকে বিরত রাখে।
- শাফেয়ী মাযহাব: ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর নাফরমানি বর্জন করে ও সুন্নাহ অনুসরণ করে, সে-ই প্রকৃত মুত্তাকি।”
- হাম্বলী মাযহাব: ইমাম আহমাদ (রহ.) তাকওয়াকে আল্লাহর নির্দেশ পালনের পূর্ণতা এবং নিষেধ বর্জনের পবিত্রতা হিসেবে তুলে ধরেন।
পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের আলোকে:
তাফসীর ইবনু কাসীর, কুরতুবী ও জালালাইন-এ তাকওয়ার গুরুত্ব ব্যাপকভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
তাফসীর কুরতুবী (সূরা বাকারা ২:২): “তাকওয়া হল এমন নূর, যা অন্তরকে আল্লাহর ভয়ে উদ্বুদ্ধ করে।”
পরবর্তী ওলামায়ে কেরামের বিশ্লেষণ:
- ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.): “তাকওয়া শুধু বাহ্যিক আচরণ নয়, বরং অন্তরের একটি দীপ্তি—যা গুনাহের আকর্ষণকেও দুর্বল করে।”
- ইবনু তাইমিয়্যাহ (রহ.): “তাকওয়া হল এমন এক আত্মিক অবস্থা, যা মুমিনকে সব কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যায়।”
রাজেহ (প্রধান) মত:
চার মাযহাব, পূর্ববর্তী ও পরবর্তী উলামায়ে কেরামের আলোকে রাজেহ মত হলো:
“তাকওয়া হচ্ছে এমন এক আত্মিক ও বাহ্যিক প্রস্তুতি, যা মানুষকে আল্লাহর আদেশ পালন এবং নিষেধ থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে প্রেরণা দেয়। এর মাধ্যমেই মুমিন প্রকৃত সফলতা অর্জন করে।”
উপসংহার:
তাকওয়া একটি পরিপূর্ণ জীবনদর্শন, যা শুধু নামাজ-রোজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রতিটি পদক্ষেপে আল্লাহর স্মরণে সচেতন থাকার শিক্ষা দেয়। তাকওয়া অর্জন মানে আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা, অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফেরানো, আর জীবনকে বানানো জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচার সেতু।
লেখক:
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা
বাংলাদেশ
Comments
Post a Comment