ইমরানের দীপ্তিময় যাত্রা

ইমরানের দীপ্তিময় যাত্রা

লিখেছেন:
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

স্মৃতির পাতায় যদি ফিরে যাই—

তবে মনে পড়ে সেই পবিত্র রমজানের কথা। প্রথম যখন আমি সাতখামার মসজিদে তারাবি পড়াতে যাই। সাতখামার—আমার মামার বাড়ি। আমি তখন সদ্য কায়দা শেষ করেছি, এবং পরের বছর ভর্তি হয়েছি মিজান জামাতে।

সেই বছর থেকেই শুরু হয় আমার এক অনন্য সফর। আর সেই সফরের প্রিয় সহযাত্রী ছিল—ইমরান

তখন ইমরান ক্লাস ফাইভে পড়ে। একেবারে ছোট্ট, মায়াবী চেহারা, কিন্তু চোখেমুখে ছিল গভীরতা, মনোযোগ আর বুদ্ধিমত্তার জ্যোতি। পরিচয় হওয়ার কিছুদিন পর থেকেই বুঝে নিই—এই ছেলেটি আলাদা। আল্লাহ যদি চায়, একদিন সে অনেক বড় কিছু হবে। যদিও তার পরিবার চেয়েছিল সে হোক একজন ডাক্তার; আমি চেয়েছিলাম, সে হোক আলোকিত এক আলেম, এক কুরআনের সৈনিক।

*** কায়দা থেকে কুরআনের রাজপথে

আমি তাকে শেখানো শুরু করি—আমার পড়া সেই পুরনো মক্তবের কায়দা থেকে। আলিফ, বা, তা—এই পরিচিত অক্ষরগুলোর মধ্য দিয়েই তার যাত্রা শুরু।

তারপর একে একে মাখরাজ, হরফে লীন, হরকত, যযম, তাশদীদ, মাদ্দ, গুন্নাহ, নূন সাকিন, মীম সাকিন, কলকলা, ইমালা—এমনকি ‘নূনে কুতনি’র মতন জটিল অধ্যায়গুলোও।

দুই সপ্তাহের মধ্যেই সে আমাকে পুরো কায়দা মুখস্থ শোনায়—যেটা আমি নিজে এক বছর ধরে শিখেছিলাম! আমি অভিভূত হই তার মেধা দেখে। সে শুধু শিখেনি, উদাহরণসহ এমনভাবে বলেছে, যেন কায়দা তার আত্মায় গেঁথে গেছে।

*** মাসআলা ও আখলাক—তার দীপ্ত জীবনচর্চা

তারপর আমি তাকে মাসআলা শেখাই—ইস্তেঞ্জার আদব, ওযু, তায়াম্মুম, নামাজের ওয়াজিব, নামাজ ভঙ্গের কারণ, হাদীস, জরুরি দোয়া। সে চমৎকারভাবে সব আত্মস্থ করে। পুরো রমজানজুড়ে চলে এই অফুরান তালিম।

শেষে আমি তাকে কুরআন ধরিয়ে দিই। আর সেখান থেকে কায়দার নিয়ম জিজ্ঞেস করি। সে আয়াত থেকে সরাসরি উত্তর দেয়—এ যেন শিক্ষার এক মিরাকল!

*** নাজারা, তিলাওয়াত ও প্রতিভার বিস্ফোরণ

তাকে আমি তিলাওয়াত শেখাতে থাকি। ৩০ পারা থেকে শুরু করে একে একে আয়াত—তার কণ্ঠে যেন নতুন জীবন পায়।

সে আমার মোবাইলে নাজমুল সাকিবের সুর শুনে কপি করে পড়তো। অবাক করেই সে নিজের স্টাইল তৈরি করে ফেলে।

ছিফাতের জটিলতা সে এমনভাবে আত্মস্থ করে—যেন সে একজন অভিজ্ঞ হাফেজ। অথচ সে হাফেজ নয়! এত দ্রুত রিডিং—দুই মিনিটে এক পৃষ্ঠা! আমি তাকে নিয়ম দিই প্রতিদিন আধা পৃষ্ঠা পড়ার—সে পালন করে দৃঢ়ভাবে।

আজ তার কাছে পুরো কুরআন সহজতর, অনায়াস। বহুবার সে খতম দিয়েছে। তার মেধার কোনো তুলনা হয় না।

*** স্কুল, মঞ্চ, পুরস্কার আর গৌরব

ইমরান সাধারণ স্কুলের ছাত্র। কিন্তু সেখানে কুরআনের পারদর্শিতায় সে অনন্য। স্কুলে অনুষ্ঠান হলেই কেরাত তার দায়িত্ব। এবং প্রতিবারই সে বিজয়ী।

ইমাম বুখারী একাডেমির প্রতিযোগিতা—প্রথম স্থান না হলে দ্বিতীয়! কখনো ক্রেস্ট, কখনো ১০ হাজার টাকার পুরস্কার। আল্লাহ তার মেধাকে দিয়েছেন আলো।

*** তার ভবিষ্যৎ স্বপ্ন ও অনন্য দৃষ্টিভঙ্গি

ইমরান আজ কলেজে পড়ে। এসএসসি-তে GPA-5। সে পড়ায় ছয় থেকে দশম শ্রেণির ছাত্রদের। অংক, বীজগণিত—তার কাছে পানির মতো। ইংরেজিতেও দারুণ দক্ষতা অর্জন করেছে।

তবে তার সবচেয়ে চমৎকার দৃষ্টিভঙ্গি হলো—ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হয়ে গরিবদের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা করবে। সে গ্রামে গ্রামে বিনামূল্যে হাসপাতাল তৈরি করবে—এটাই তার স্বপ্ন।

** আমার গর্ব, আমার প্রেরণা

আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ, তিনি আমাকে এমন একজন ছাত্র দিয়েছেন, যার হাত ধরে আমি ভবিষ্যতের দীপ্ত আলো দেখতে পাই। ইমরান শুধু একজন ছাত্র নয়—সে আমার আত্মার আত্মীয়, আমার স্বপ্নের প্রতিচ্ছবি। আমি গর্বিত যে আমি তাকে শিখাতে পেরেছি।

আসলে, আমি না—আল্লাহই চেয়েছেন, তাই সে শিখেছে। সেই মহামহিমেরই কৃপা ও রহমতে আজ সে এতদূর।

** শেষ কথায় দোয়া

আল্লাহ তাআলা তার প্রতিটি গুণকে কবুল করুন। সে যেন তার লক্ষ্য পূরণ করে, দীনের ও দুনিয়ার দুই অঙ্গনে হয়ে উঠুক এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আমি তার জন্য নিরন্তর দোয়া করি—সে হোক আমার আমলের উছিলা, আমার মুক্তির বাহন।

ইমরান, তুমি আমার গর্ব!

লিখেছেন:
মুহাম্মদ মুনীরুজ্জামান ত্বলহা

(তোমার ভাই, দোয়ার প্রত্যাশী)

Comments

Popular posts from this blog

“দ্বীনের দীপ্তি: ইসলামের মূল শিক্ষা”

স্মৃতির প্রাঙ্গণ ও মাধুর্যের ঋণ

📘 প্রথম সাময়িক পরীক্ষার প্রস্তুতি